ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

নিষ্ঠুরতার সীমা!

প্রকাশিত: ০৪:১৬, ৩০ মে ২০১৬

নিষ্ঠুরতার সীমা!

মানুষের পাশবিক মনোবৃত্তি ও নিষ্ঠুরতার বুঝি কোন সীমা-পরিসীমা নেই। অন্তত রাজধানীর খিলক্ষেতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাইনউদ্দিন শেখ সেটাই প্রমাণ করে ছাড়লেন। দুই সন্তানের জননী স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মোবাইল ফোনে ভায়রাকে ফোন করে জানান, ‘তোর শালীকে মেরে ফেলেছি, এসে লাশ নিয়ে যা।’ শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়নি সে, পরে যোগ করেছে, ‘না হলে লাশে পচন ধরবে।’ এরপর দুই ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে যায়। ভাবা যায় মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে ঠা-া মাথায় খুন করে তার নিকটাত্মীয়কে টেলিফোনে এমন কথা বলতে পারে! ভায়রা জামাল শিকদার ও নিহতের বড় বোন শিলা খাতুন রাতের বেলা ফোন পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলেন রসিকতা। পরে মাইনউদ্দিনের হুঙ্কারে টনক নড়ে তাদের। তড়িঘড়ি স্বামী-স্ত্রী রাত দুটো নাগাদ নারায়ণগঞ্জ থেকে খিলক্ষেতে এসে দেখেন বিছানায় পড়ে আছে শিউলি বেগমের লাশ। দুই সন্তানকে নিয়ে পালিয়েছে স্বামী। অথচ কয়েক বছর আগে সে ভালবেসে বিয়ে করেছিল শিউলিকে। সম্মতি ব্যতিরেকে বিয়ে করায় মত ছিল না নিহতের পরিবারের। যোগাযোগও ছিল না। মাত্র কয়েকদিন আগে বড় বোনের কাছ থেকে শিউলিকে ২০ হাজার টাকা এনে দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল সে। টাকা এনে দিতে না পারাই কাল হলো শিউলির। খাটের সঙ্গে দুই হাত-পা বেঁধে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শিউলিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে পাষ- স্বামী। মানুষ মানুষকে কেন খুন করে সে ব্যাপারে কোন সহজ উত্তর অথবা মীমাংসা নেই। বোধ করি বাঘা বাঘা মনোবিজ্ঞানীও এ সম্পর্কে চূড়ান্ত কোন রায় দিতে পারবেন না। তদুপরি কেতাবে যাই লেখা থাকুক না কেন, বাস্তবে দেখা যায় মানুষ নিতান্তই তুচ্ছ কারণেও খুন করে থাকে মানুষকে। এমনটাও দেখা যাওয়া বিচিত্র নয় যে, কোন কোন খুনের পেছনে আদৌ কোন কারণই খুঁজে পাওয়া যায় না। তার মানে কী এই যে, মানুষের মধ্যে পশু মনোবৃত্তি, পাশবিকতা ও জিঘাংসা লুক্কায়িত আছে সেই আদিকাল থেকেই। বনচারী কিংবা গুহাবাসী মানুষকে তার থেকেই বেঁচে থাকার অনিবার্য প্রয়োজনে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে। একদিকে আহার্যবস্তু আহরণ তথা শিকার করতেও তাকে অমানুষিক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, অন্যদিকে অন্যের শিকারে ভাগ বসাতে গিয়েও তাকে করতে হয়েছে নিরন্তর সংগ্রাম। অর্থাৎ সহজে কোন কিছুই মিলত না। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগেও মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রামের এই প্রতিযোগিতার মাত্রা বেড়েছে বহুগুণ। এর পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যোগ হয়েছে আরও জট ও জটিলতা। বহু কথিত মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ ও উন্নতি, সামাজিক আইন ও নিয়ম-কানুন, থানা-পুলিশ, সর্বোপরি আদালতের বিচার সত্ত্বেও মানুষকে ঠিক বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। ক্ষণে ক্ষণেই কারণে-অকারণে মানুষের মধ্যে পশু প্রবৃত্তি ও অমানবিকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। সামাজিক অবক্ষয়, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ক্রমাবনতি, আর্থিক টানাপোড়েন, বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সন্দেহসহ নানা কারণে মানুষ তার ভেতরে লুক্কায়িত পশু প্রবৃত্তিকে সংযত করতে পারছে না, দমন করা তো দূরের কথা! আর সে কারণেই বুঝি নিত্যনতুন আইন-কানুন, আদালতের বিচার, এমনকি যাবজ্জীবন কারাদ- ও মৃত্যুদ-ের বিধানও নিরস্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে মানুষকে। অতঃপর সে নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে আইন। ঠা-া মাথায়ও খুন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে না। অবলীলায় খুন করছে নিজের স্ত্রীকে, প্রেমিকাকে, সন্তান মাকে এবং মা সন্তানকে। যেমনটা সামান্য ২০ হাজার টাকা না পাওয়ায় মাইনউদ্দিন শ্বাসরোধে হত্যা করলো স্ত্রীকে। এই হত্যার ঘটনাটি সভ্য শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিচলিত করেছে, ব্যথিত করেছে। ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দায়ী খুনীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবেÑ এটাই মানুষ প্রত্যাশা করে।