ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

বছরের পর বছর মৃত ছিল খাল, হঠাৎ ফিরল প্রাণ!

নিজস্ব সংবাদদাতা, তালতলী, বরগুনা

প্রকাশিত: ১৯:৫১, ১৪ মার্চ ২০২৬

বছরের পর বছর মৃত ছিল খাল, হঠাৎ ফিরল প্রাণ!

ছবি: জনকণ্ঠ

খালটা একসময় ছিল মরা। পানির বদলে জমে থাকত কচুরিপানা, আবর্জনা আর তাতেই ছড়াত পচা গন্ধ। গ্রামের মানুষ নাক চেপে পাশ কাটিয়ে যেত। এখন সেই খালেই দুপুরের রোদে ভেসে চলেছে কাগজের ছোট ছোট নৌকা। আর তীরের ধারে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে গ্রামের শিশুরা। যেন তারা নিজেরাই ঘোষণা করছে, খাল আবার নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের চিলু মাঝি খালে এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস উপলক্ষে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ এর আয়োজনে খননকৃত খালে কাগজের নৌকা ভাসানোর কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুরা। এর আগে সকাল ১০টার দিকে উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের ছোট ভাইজোড়া গ্রামের কালাবির খাল খননের দাবিতে মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আয়োজকদের ভাষ্যমতে, অনেক আন্দোলন আর কর্মসূচির পর খাল খননের উদ্যোগ নেয় সরকার। সরকারের প্রচেষ্টায় খালটিকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন সেই জীবন যেন আবার নষ্ট না হয়, এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছে আগামী প্রজন্ম।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, পায়রা নদীর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য খাল একসময় এই অঞ্চলের কৃষির প্রাণ ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর দখল ও দূষণে অনেক খালই এখন মৃতপ্রায়। কালাবির খালও সেই তালিকায় পড়েছে। একসময় প্রবহমান এই খালটি এখন প্রায় মরে গেছে। ফলে মিঠা পানির অভাবে দুই পাড়ের কয়েক হাজার কৃষক রবিশস্য, আমন-বোরো ধান, তরমুজ কিংবা সূর্যমুখী ফুলের চাষ করতে পারছেন না। তাই দ্রুত খালটি পুনঃখননের দাবি জানান তারা।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তালতলী উপজেলা সহ-সভাপতি শাহাদাত হোসেন মাতুব্বর, ছোট ভাইজোড়া মিঠাপানি সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক খালিদ মাসুদ, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের তালতলী-আমতলী সমন্বয়ক আরিফ রহমান, উন্নয়নকর্মী এম মিলন ও পরিবেশকর্মী মোস্তাফিজসহ স্থানীয়রা।

এদিকে নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের মানুষ এখন আশার গল্পও বলতে শুরু করেছেন। এই ইউনিয়নের নলবুনিয়া, চিলু মাঝি, সুন্দরিয়া, তাতীপাড়া ও পাওয়াপাড়া-মোয়াপাড়াসহ মোট ৯টি খাল একসময় পলি জমে প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি থাকত না, আবার বর্ষায় পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় ডুবে যেত ফসলি জমি।

পরিবেশবাদী সংগঠনের ধারাবাহিক আন্দোলনের পর এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারই অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে ‘জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর আওতায় নলবুনিয়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির মাধ্যমে ১৯ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে।

প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এই খালগুলো পুনঃখননের ফলে বদলাতে শুরু করেছে গ্রামের চিত্র। কৃষকের জমিতে আবার পানি পৌঁছাচ্ছে, তৈরি হয়েছে নতুন রাস্তা, আর ফিরে আসছে মাছ-পাখির আনাগোনা।

নলবুনিয়া এলাকার কৃষক জালাল মিয়া তালতলীর সাংবাদিকদের বলেন, কিছুদিন আগেও খালগুলো ডোবা-নালার মতো ছিল। মানুষ ময়লা ফেলত। মশা-মাছি জন্মাত, নানা রোগ ছড়াত। দুর্গন্ধে পাশ দিয়ে হাঁটা যেত না। এখন খাল খনন হওয়ায় সবাই উপকার পাচ্ছে।

তাতীপাড়া গ্রামের কৃষক জুয়েল জমাদ্দার স্বস্তির কণ্ঠে বলেন, আগে শুধু বর্ষায় একবার ধান চাষ করতে পারতাম। এখন সেচের পানি থাকলে বছরে কয়েকবার ফসল ফলানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে।

নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চু মনে করেন, এই খাল খনন কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনবে। তার ভাষায়, এক ফসলি জমি এখন দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত হতে পারবে। এতে কৃষকের জীবনযাত্রা বদলে যাবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ইলিয়াস বলেন, গ্রীষ্মে পানির অভাব ও বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে এতদিন কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। এখন খালগুলো সচল হওয়ায় সেচ সুবিধা বাড়বে এবং এক ফসলি জমিতে একাধিকবার ফসল ফলানো সম্ভব হবে।

এলজিইডির তালতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রকল্প অনুযায়ী খালগুলো পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শহীদ

×