তিস্তপাড়ের বুকে অবৈধ ভাবে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন এবং নদীর বুকে সড়ক বানিয়ে পাথর পরিবহন এবং নদীর প্রবাহ থামিয়ে দেয়ার এমন বাস্তব ছবি দেখলে রিতিমত আতকে উঠবেন যে কেউ। সমচেতন মহল বলছেন তিস্তা নদী জুড়ে পাথর লুটের এক নতুন সামাজ্যবাদ গড়ে উঠেছে। যা প্রভাবশালীদের একচেটিয়া স্তরে পরিনত হয়েছে। বর্তমান এই সময়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছ, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জাল ছড়িয়েছে তিস্তাপাড়ে। যাকে এলাকাবাসী আধিপত্য বিস্তারের রাতারাতি ধনী ও ক্ষমতাবান শোষণ করা হচ্ছে বলে এলাকার অসহায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষজন মন্তব্য করেছেন। এলাকার কৃষকদের অভিযোগ ইরাকের যুদ্ধে জ্বালানি তেলের সংকট কমাতে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছেন। সেখানে একজন কৃষক বোরো ও ভুট্টা ক্ষেতে সেচ দিতে প্রতিদিন পাচ্ছেন মাত্র দুই লিটার ডিজেল। অথচ অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীরা বোমা মেশিন চালাতে ড্রামে ড্রামে শতশত লিটার ডিজেল পাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে তারা এতো ডিজেল পাচ্ছে কই থেকে। ডিজেল নিয়েও প্রশাসনের অভিযানের দাবি করেছে এলাকা কৃষকরা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা ও লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলা জুড়ে তিস্তা নদীতে অবৈধ পাথর উত্তোলন কোনোভাবেই থামছে না। মাঝে মাঝে প্রশাসনের অভিযানে পাথর জব্দ, গ্রেফতার করা সহ পাথর উত্তোলনে সিক্স সিলিন্ডারের বোমা মেশিন বিনস্ট করা হলেও অভিযানের পর উল্টো বাড়ছে পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত বোমা মেশিনের সংখ্যা। যা দিয়ে বর্তমানে তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে নদীর গভীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায় তিস্তা নদীর উজানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকেও থামিয়ে দিয়েছে পাথর লুটকারীরা। নদীর বুকে রাস্তা বানিয়ে সেখানে ট্রলি চালিয়ে পাথর পরিবহন করা হচ্ছে। নদীর বুক পেরিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করে তিস্তার ডানতীর বাঁধ দিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে শতশত ট্রলি। এতে গ্রামীন রাস্তাগুলো পর্যন্ত তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এতে চলাচলে এলাকারবাসী চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীর অভ্যন্তরে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করে আসছে। জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্নজনকে ম্যানেজ করেই এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এমন দাবিও করছেন পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন। ফলে এই অবৈধ বাণিজ্য থামছেনা। আর তিস্তা নদীকে খন্ড খন্ড করে রিতিমত হত্যা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলির বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি ও দোহলপাড়া এলাকা সহ বিভিন্ন পয়েন্টে গভীর খাদ তৈরি করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে ১৫ থেকে ২০টি বোমা মেশিন সক্রিয় ছিল, সেখানে এখন অর্ধশতাধিক সিক্স সিলিন্ডারের বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের অভিযান শুরু হওয়ার আগেই পাথর উত্তোলনকারী চক্র খবর পেয়ে যায়। ফলে তারা মেশিন, পাইপসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখে। এতে অভিযান শেষ হওয়ার কিছুণের মধ্যেই আবার শুরু হয় নদীর তলদেশে গভীর খাদ থেকে পাথর উত্তোলনের মহোৎসব।
নাম প্রকাশ না করার সর্তে তিস্তাপাড়ের বেশ কয়েকজন জানান, প্রশাসন,পুলিশ. সাংবাদিক সহ বিভিন্নজনকে ম্যানেজের নাম করে ওই চক্রটি প্রতিদিন বোমা মেশিনের প্রত্যেক মালিকদের নিকট হতে ৫ হাজার করে টাকা তুলেন।
তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, পাথর লুটের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। পানদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো তিস্তা পাড়ের মানুষগুলো আবারও সরকারের সর্বোচ্চ মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তবে তিস্তাপাড়ের একটি মহল দাবি করে বলছেন তিস্তাপাড়ে শ্রম সংকটে অনেক পরিবার অভাবে পড়েছেন। পাথর উত্তোলনে শত শত পরিবার দিন মজুরি হিসাবে প্রতিদিন হাজার টাকা করে পেয়ে থাকেন। সামনে ঈদ। এতে পরিবার গুলো উপকৃত হচ্ছে।
তবে অপর পক্ষ বলছেন, এই অভাব অনটনের কথা বলে তারা নিজেদের ফায়দা লুটছেন।
নীলফামারী ১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য নীলফামারী জেলা জামায়াতের আমির আব্দুস সাত্তার বলেছেন গত ৮ মার্চ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন ও বোমা মেশিন জব্দ করা ও জড়িতেদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসন ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে বেশ কিছু বোমা মেশিন বিনস্ট করা হয় এবং ৫জনকে গ্রেফতার করেছে। মামলা হয়েছে। তিনি বলেন তিস্তা নদীতে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। তা না হলে বর্ষা মৌসুমে নদীর ভাঙ্গন ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
অপর দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিবিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন আমাদের দপ্তরের পক্ষে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে এবং স্থানীয়ভাবে প্রশাসনকে অবগত করে তিস্তা নদী থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য বলা হয়েছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কয়েক দফা অভিযান পরিচালনা করেছি। এখন নতুন করে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। তিস্তা নদী হতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে অচিরেই বড় অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজু








