ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

শিক্ষক শূন্যতায় নড়বড়ে নাটোরের প্রাথমিক শিক্ষা

কাজী মাহমুদুল হাসান, নাটোর

প্রকাশিত: ১৬:১০, ১৩ মার্চ ২০২৬

শিক্ষক শূন্যতায় নড়বড়ে নাটোরের প্রাথমিক শিক্ষা

ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।

নাটোর জেলায় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকটে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। জেলার বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এক শিক্ষকের ওপর একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব পড়ায় শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। অন্যদিকে বিষয়টি স্বীকার করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, নাটোর জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৩৮টি। এছাড়া রয়েছে ২টি শিশু কল্যাণ বিদ্যালয়। মোট ২৪০টি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ৪ হাজার ১২২ জন সহকারী শিক্ষক। এর মধ্যে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ২৯২টি পদ।

এছাড়া জেলায় সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) পদ রয়েছে ৩৩টি। এর মধ্যে ১১টি পদ এখনও শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে জেলার কোথাও রাজস্ব খাতের পিয়ন নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে পিয়নের কাজ চালানো হচ্ছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিদ্যালয়েই শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দাপ্তরিক কাজে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন উপস্থিত শিক্ষকদের একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির পাঠদান করাতে হয়। কখনও একই কক্ষে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থী বসিয়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, আবার কখনও পাশের দুটি কক্ষে একই শিক্ষককে পাঠদান করতে দেখা যায়। এতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয় এবং পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক সময় নির্ধারিত পাঠ শেষ না করেই ছুটি দিতে হয়।

বাগাতিপাড়া উপজেলার মালঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। সদর উপজেলার বড়হরিশপুর ইউনিয়নের রহিমকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জুনাইদ জানায়, শিক্ষক কম থাকায় অনেক সময় একসঙ্গে চারটি ক্লাস নিতে হয়। আবার বেঞ্চ ও ভবনের সংকটের কারণে গাদাগাদি করে বসতে হয়। এতে ঠিকমতো পড়াশোনা করা যায় না।

জুনাইদের বাবা জাকির হোসেন বলেন, “আমি নিজেও এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। আগে পড়ালেখার মান অনেক ভালো ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষক স্বল্পতার কারণে সেই মান আর নেই।”

বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ইউনুস আলী বলেন, “আমাদের সময় স্কুলের শিক্ষার মান ভালো ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার পরিবেশ খারাপ হচ্ছে। দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

স্কুলের দাতা সদস্য বাবলুর রহমান জানান, শিক্ষক সংকট দূর করতে প্রধান শিক্ষক বারবার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। এতে অভিভাবকদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরা বলেন, এই বিদ্যালয়ে ৪০০-এর বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করছেন মাত্র সাতজন শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকলে অন্য শিক্ষকদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আগে শিক্ষক সংখ্যা ঠিক থাকলেও ডেপুটেশনে দুইজন শিক্ষক অন্যত্র চলে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহা. আব্দুল হান্নান বলেন, জেলায় ২৯২ জন শিক্ষক সংকট পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০৬ জন শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই তাদের পদায়ন হলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি ১১ জন এটিও নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে এবং রাজস্ব খাত থেকে পিয়ন নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

এম.কে

×