ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

ডিজেল পেতে কৃষকের নাভিশ্বাস

রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় ঝুঁকিতে বোরো আবাদ

তাহমিন হক ববী, নীলফামারী

প্রকাশিত: ২২:১৬, ১১ মার্চ ২০২৬

রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় ঝুঁকিতে বোরো আবাদ

রংপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও ডিজেল চালিত নলকূপ দিয়ে বোরো আবাদ

সেচ নির্ভর বোরো ধান আবাদে উত্তরাঞ্চলের রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলায় ডিজেল সংকটে পড়েছে কৃষকরা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে সরকার জ্বালানি সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় ডিজেল  পেতে কৃষকদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ধানসহ অন্যান্য ফসলে সেচ দিতে না পারলে ফসল চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগ বিষয়টি জরুরিভাবে নজরদারি করছেন। বলা হচ্ছে বোরো চাষিদের ডিজেল সহজে পেতে মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে। তবে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বিঘিœত হলে দীর্ঘমেয়াদে তা কৃষিতে প্রভাব ফেলবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের তেল কম দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বোধগম্য। তবে কৃষিকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের বোরো আবাদের ৬০ শতাংশের বেশি ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো কৃষির ডিজেলেও ভর্তুকি দেওয়া জরুরি। কারণ প্রতিকেজি বোরো ধান উৎপাদনে পানির প্রয়োজন ৫৫০-৬৫০ লিটার। যা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। 
মঙ্গলবার রংপুর কৃষি অঞ্চলের পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম গাইবান্ধায়  ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৪ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা  হয়েছে। কিন্তু ওই সকল ৫ জেলায় সোমবার (৯ মার্চ) পর্যন্ত বোরো চারা  রোপণ অর্জিত হয়েছে  ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো ১৪ হাজার ১৭৬ হেক্টর জমি বাকি রয়েছে। এ ছাড়া যে সকল জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে সেই সকল জমিতে নিয়মিত সেচ দিতে হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রংপুর কৃষি অঞ্চলে বোরো আবাদে  ২৩ লাখ ৮ হাজার ৭১৫ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন ধরা হয়েছে। 
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক এলাকায় স্থানীয় খুচরা বাজার থেকে ডিজেল রীতিমতো উধাও। ফিলিং স্টেশন থেকে চাহিদামতো জ্বালানি মিলছে না, কারণ পা¤পগুলো থেকে ডিজেল বিক্রির পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিধিনিষেধের কারণে একজন ক্রেতা মাত্র দুই লিটার জ্বালানি কিনতে পারছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি লিটারে বাড়তি ১০ থেকে ১৫ টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। সাধারণত জানুয়ারি  থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বোরো মৌসুম চলে। এখনো কৃষকরা চারা রোপণ করছেন। এ সময় বিশেষ করে রংপুর কৃষি অঞ্চলে সেচ কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ডিজেলচালিত নলকূপ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বোরো আবাদের জন্য রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলায় ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপ রয়েছে ৯৫ হাজার ৮৫৪ ও ডিজেল চালিত ললিত পাম্প (এলএলপি) রয়েছে ৬৬৫টি। এ ছাড়া রয়েছে বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপ ৩ হাজার ১৬৩টি, সোলার চালিত গভীর নলকূপ ৬০টি, বিদ্যুৎ চালিত অগভীর নলকূপ ৮৯ হাজার ৮৩টি, অগভীর সোলার নলকূপ ১২০টি,   বিদ্যুৎ চালিত ললিত পাম্প (এলএলপি) ৬৬৫টি ও ভ্রাম্যমাণ সোলার অগভীর নলকূপ ৯৩টি। এ ছাড়া দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করছে। 
এদিকে বিদ্যুৎহীন প্রত্যন্ত এলাকা, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীর চরাঞ্চলের কৃষকরা জানিয়েছেন, পানির অভাবে খেত শুকিয়ে যাচ্ছে। আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি গ্রামের কৃষক মোস্তাক আলী জানান, ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি মাত্র দুই লিটার ডিজেল পেয়েছেন। অথচ তার ৩৩ বিঘা জমিতে প্রতিদিন অন্তত ১৩ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। গ্রামের হাটবাজারের দোকানগুলোতে তেল নেই, আর পা¤েপ পাওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় নামমাত্র। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত সেচ নিশ্চিত করা না গেলে ফসল মাঠেই মারা পড়বে। চর জোরগাছ এলাকার কৃষক সেকেন্দার আলী জানান, স্থানীয় দোকানগুলোতে ডিজেল শেষ হওয়ায় তাকে সাত কিলোমিটার দূরে একটি ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়েছে। সেখান থেকে তিনি তার ৩৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সামান্য অংশ মাত্র পেয়েছেন। 
এ অঞ্চলের  ফিলিং স্টেশনের মালিকরা জানান, সরকারের বিধিনিষেধের কারণে তারা কম বিক্রি করছেন। এ ছাড়া চাহিদা মোতাবেক ডিপো থেকে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। 
এদিকে রংপুর বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অপর্যাপ্ত সেচ বোরো উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে হুমকিতে ফেলতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যেসব এলাকায় সেচ ডিজেলচালিত অগভীর মেশিনের ওপর নির্ভরশীল,  সেখানে পর্যায়ক্রমে সব জমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পা¤পগুলোকে প্রতিদিন অন্তত ১২ ঘণ্টা চালাতে হয়। তিনি বলেন, কৃষকরা যাতে প্রয়োজনীয় ডিজেল পান সেজন্য আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ  করছি।

প্যানেল হু

×