ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

লোকশিল্পের ধারা বেয়ে আসে গীত

প্রকাশিত: ০৭:০০, ২৪ জুন ২০১৭

লোকশিল্পের ধারা বেয়ে আসে গীত

কালের আবর্তে প্রতিটি পরতে সৃষ্টি হয় লোকায়তকাল বা লোককাল। বাঙালীর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের ধারা তিনটি। আদিমকাল, মধ্যকাল ও আধুনিককাল। প্রতিটি কালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে লোককাল। লোককথা। লোকজ ধারা বা লোকজ সংস্কৃতি বলা যায়। এই লোকজ ধারা বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসের গভীর থেকে উৎসারিত। লোকায়তকালের লোকসাহিত্য বাঙালীর গর্ব। যার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বলা হয় লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি। বাঙালীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভা-ার সমৃদ্ধ। লোকায়তকালের একের সৃষ্টি অন্যের বা গোষ্ঠীর কাছে অনুকরণীয় হওয়ার নাম সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষ হয়ে ওঠার ইতিহাস। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের সংগৃহীত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ প্রকাশিত হলে সুদূর পশ্চিমের সাহিত্য রসিক রোমাঁরোলাঁ পর্যন্ত ময়মনসিংহের মদীনা বিবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় বাংলার প্রতিটি পল্লীর মাঠে ঘাটে, পল্লীর আলো বাতাসে পল্লীর প্রত্যেক পরতে পরতে সাহিত্য ছড়িয়ে আছে। দূর অতীতের পল্লীর এই সাহিত্যের নাম লোকসাহিত্য। লোকসংস্কৃতি লোকসমাজ সর্বকালের কৃষি সমাজের সৃষ্টি। ড. তুষার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় : অনগ্রসর কৃষি সমাজ বা পল্লী জীবন হচ্ছে লোকসংস্কৃতি বিকাশের প্রকৃতি ক্ষেত্র। দিনে দিনে এই ধারা নানা বর্ণে নানা রূপে লোকজ রসসুধা তৈরি করে সম্মুখ পানে অগ্রসর হয়। সমাজের গভীর থেকে উঠে আসা এই লোকজ লালিত হয় চিরন্তন হয়ে। লোকসংস্কৃতির ইংরেজী আধুনিক নাম ‘ফোকলোর’। এর সৃষ্টি ১৮৪৬ সালে। এর আগে লোকসংস্কৃতিকে বলা হতো ‘পপুলর এ্যান্টিকুইটিজ’। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘জনপ্রিয় পুরাতনী’। ফোকলোর বলতে শুধু লোকসাহিত্য বোঝায় না। ড. আশরাফ সিদ্দীকীর মতে ফোকলোরের দুই ভাগ। এক. ম্যাটিরিয়াল ফোকলোর বা লোকশিল্প। দুই. ফরমালাইজড ফোকলোর বা লোকসাহিত্য। লোকশিল্পের মধ্যে আছে- লোক প্রথা, লোক ভাস্কর্য, লোক বাদ্যযন্ত্র। লোকসাহিত্যের মধ্যে আছে- লোককথা, রূপকথা, ধাঁধা, মন্ত্র, ছড়া, খেলার ছড়া, জায়গার নাম, লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার, গীতিকা, গীতি, কিংবদন্তি, পুরাণ কাহিনী ইত্যাদি। লোকসাহিত্যের সমৃদ্ধ শাখা লোকগীতি। যা সাহিত্যের আদি সৃষ্টি। লোকগীতিরই একটি শাখা গীত। পরবর্তী সময়ে এই গীত নারীর কণ্ঠেই অলঙ্কৃত হয়েছে। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সুখ দুঃখ, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বেদনার ভাষা হৃদয়ে লালিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনেক জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, মারফতি, বাউল, বিরুয়া, হেরায়া ইত্যাদি। এগুলোতে আবেগ উচ্ছ্বাস দুঃখ বেদনার চিত্রগুলোই সাহিত্য গুণে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। তবে ভাষার ক্ষেত্রে এগুলো ধারণ করেছে আঞ্চলিক স্বকীয়তা। এদিকে গীত ও গীতি শব্দের আভিধানিক অর্থ এক হলেও গীত বলতে সাধারণত মেয়েদের কণ্ঠের গীত বোঝায়। গীত মেয়ে পুরুষ উভয়ের কণ্ঠে গাওয়া গান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েরা গীত গেয়ে অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করে তোলে। বিয়ের প্রতিটি ধাপেই গীত আছে। আবেগ, উচ্ছ্বাস, আনন্দ, বেদনা বর ও কনেপক্ষের পরস্পরের প্রতি বিদ্রƒপাত্মক কৌতুক, নক্সা কথার মাধুর্যে ও সুরে গীত হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। গীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো: এলাকা ও অঞ্চলভেদে ভাষার ভিন্নতা। তবে কথা, অর্থ ও সুর কাছাকাছি। গীত শুনে মনে হবে বর ও কনে পক্ষের মধ্যে রীতিমতো বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। নানি দাদির গীত এক রকম, খালা ফুপুর গীত আরেক রকম। শ্যালিকাদের গীত শুনে মনে হবে যত দাবি দাওয়া আছে, তা পেশ করা হচ্ছে বরের কাছে। বিয়ে অনুষ্ঠানে কনের বাড়ির শেষ পর্যায়ের গীত অনেকটা বেদনার। কনে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে স্বামীর ঘরে। যে ঘর তার কাছে নতুন। স্বামীর ঘরের ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয় গীত। বরের বাড়িতে আরেক ধরনের গীত। কনে বরণ করে নেয়ার আনন্দের গীত। বিয়ের গীতের পাশাপাশি বাঙালীর নানা আনুষ্ঠিকতায় পার্বণেও গীত গাওয়া হয়। আবার ঋতু ভিত্তিক গীত আছে। বর্ষায় বৃষ্টি না হলে খরা দেখা দিলে বৃষ্টির জন্য গীত তৈরি হয়। যা প্রমাণ করে বাঙালীর সংস্কৃতির শিকড় কতটা গভীরে। লোকজ বাঙালীর চিরন্তন গর্ব। -সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে