২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

যিশুর পুনরুত্থান


আজ ২৭ মার্চ, রবিবার। সারা পৃথিবীতে খ্রিস্টবিশ্বাসীরা আজ মহাসমারোহে পালন করছে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রভু যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান মহোৎসব পাস্কা বা ইস্টার। সবাই উচ্চকণ্ঠে গেয়ে উঠছে : আল্লেলুইয়া অর্থাৎ জয় জয় প্রভুর জয়! গত ২৫ মার্চ ছিল গুড্্ ফ্রাইডে বা পুণ্য শুক্রবার; স্মরণ করা হয়েছে যিশুর পরিত্রাণদায়ী মৃত্যু। মানুষ কৃচ্ছ্রসাধন করে, উপবাস করে নিজ পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়েছে; নিজ পাপ স্বীকার করে, ঈশ্বর ও মানুষের সঙ্গে হয়েছে পুনর্মিলিত। আজ আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে, পালন করা হচ্ছে প্রভু যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান মহোৎসব পাস্কা। আমরা পাস্কা রহস্যটি যতই অনুধ্যানে অনুধাবন করতে পারব, ততই এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে যিশুর সঙ্গে নতুন হয়ে উঠতে পারব।

আলোর মহোৎসব পাস্কা বা ইস্টার : পুনরুত্থান মোমবাতি ও নিস্তার বন্দনা : বস্তুত শনিবার রাত থেকেই এই নবজীবনের মহোৎসব পাস্কা শুরু হয়। অন্ধকার। এরই মাঝে আগুন আশীর্বাদ; প্রার্থনায় যাচ্ঞা করা হয় খ্রিস্টের পুনরুত্থানেও আলো যেন মানুষের মনের সকল অন্ধকার দূরীভূত করে। আশীর্বাদিত আগুন থেকে জ্বালানো হয় পুনরুত্থান প্রদীপ, চলতি সালসমেত পঞ্চক্ষতের পাঁচটি ধূপকাঠি লাগানো এক বিরাট আকারের মোমবাতি যা ঘোষণা করে : আদি ও অন্ত যিনি সেই যিশুর পুনরুত্থান মানুষের জীবনে এনেছে নতুন আলো, নতুন জীবন; যিশুর পুনরুত্থান দূরীভূত করেছে পাপের অন্ধকার; মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী যিশু খ্রিস্টের সঙ্গে হয়েছে নবীভূত। আজকের এই মহোৎসব আলোর মহোৎসব।

আহ্বান : এই উৎসব আমাদের সবাইকে আলোকিত ও নবায়িত মানুষ হয়ে যিশুর সঙ্গে পুনরুত্থিত হয়ে তাঁর আলোতে উদ্ভাসিত হতে আহ্বান জানায়। আর তাই ভক্তসমাজ তার দীক্ষার প্রতিজ্ঞা নবায়ন করে এবং আশীর্বাদিত দীক্ষাজল দ্বারা নিজেকে সিঞ্চিত করে। আর এভাবেই ভক্ত পাপ পরিত্যাগ করার সঙ্কল্প করে আর বিশ্বাস নবায়ন করে পুনরুত্থিত খ্রিস্টে নতুন অস্থিতে পরিণত হয়।

আসুন সাধু পলের মতো আমরাও বলি : আমার পুরাতন ‘আমি’ যিশুর সঙ্গে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছে; যিশুর সঙ্গে আমার নতুন ‘আমি’টি জেগে উঠেছে। (গালাতীয় ২ : ২০-২১)।

পুনরুত্থান বা পাস্কা রবিবার, ইস্টার সানডে : এদিনে নতুন সাজে ছোটবড় সবাই পুনরুত্থানের খ্রিস্টযাগে তথা উপাসনায় অংশগ্রহণ করে। গির্জাঘর থাকে খ্রিস্টভক্ত দিয়ে পূর্ণ। খ্রিস্টযাগে পুরোহিত যিশুর পুনরুত্থানে আমাদের নতুন জীবন; আমার জীবনে পুনরুত্থিত যিশুর উপস্থিতি ও বাস্তব প্রকাশ, এমন সব দিক অনুধ্যানে নিয়ে আসে। উপাসনা বা নামাজের পরেই চলে আপন আপন কৃষ্টিতে ইস্টারের শুভেচ্ছা বিনিময়। ঘরে ঘরে আজ আয়োজন করা হয় দৈ চিড়া-মুড়ি-মুড়কির মতো হরেকরকম মুখরোচক আহার সামগ্রী। এতে অংশগ্রহণ করবে ঘরের সবাই ও পাড়া-প্রতিবেশী। এই আসরে অনেক সময়ই নিমন্ত্রিত হয় হিন্দু-মুসলিম ভাই-বোনেরাও।

পাস্কা পর্ব ও বাস্তবতা : অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে মানুষ ভীষণভাবে নৈতিকতার দিক থেকে অসুস্থ। অনেক মানুষই আজ মিথ্যা, চুরি, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস, হত্যাযজ্ঞ, হানাহানি, পরনিন্দা, প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি পাপের তিমিরে পড়ে আছে। আজকের এই ইস্টার বা পুনরুত্থান পর্ব এমন অন্ধকারের জীবন থেকে বের হয়ে আলোর রাজ্যে আসার আহ্বান জানানো হয়।

পুনরুত্থিত বা আলোকিত জীবনের দৃশ্যনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো কি কি হতে পারে?

যেখানে বৈষম্য ও দলাদলি থেকে আসে মিলন ও ভ্রাতৃত্ব, যেখানে অশান্তি থেকে আসে শান্তি, যেখানে ঝগড়া-বিবাদ থেকে আসে ক্ষমা, যেখানে জটিলতা ও অস্বাস্থ্যকর জটিলতা-কুটিলতা থেকে আসে সরলতা ও স্বচ্ছতা, যেখানে নেই ধর্ষণ বা মানব-নিধন, যেখানে নেই কোন ধর্মীয় গোঁড়ামি, যেখানে নেই মিথ্যার ছড়াছড়ি সেখানেই তো নবজীবন, পুনরুত্থিত জীবন।

আসুন আমরা পাপপঙ্কিলতা ত্যাগ করে স্বচ্ছ-সুন্দর পবিত্র জীবন নিয়ে পুনরুত্থিত মানুষে পরিণত হই। আর এ প্রসঙ্গেই দেখা যাবে যে, এই পাস্কা পর্ব শুধু খ্রিস্টবিশ্বাসীদেরই নয়, এই মহোৎসবের আবেদন, তাগিদ ও এর আহ্বান সর্বজনীন।

ইস্টার এবং স্বাধীনতা দিবস ও বাংলা নববর্ষ : অত্যন্ত মজার দিকটা হলো এ বছর স্বাধীনতা দিবস ইস্টার সান ডের একদিন আগে। স্বাধীনতা হলো বন্দীদশা থেকে মুক্তি। কত ভাইবোন এই মুক্তির জন্য প্রাণ দিয়েছেন। জীবনের বিনিময়ে মুক্তি এনে দিয়েছেন।

পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ এই পাস্কা বা ইস্টার সানডে’র দুই সপ্তাহ পরেই নববর্ষ তো নতুন জীবনই ঘোষণা করে। নতুনকে স্বাগতম জানিয়ে সেদিন গেয়ে উঠব : এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। একইভাবে আমরা এই পুনরুত্থান উৎসবে নতুন জীবনকে স্বাগতম জানাই। আমাদের জীবন ঘোষণা করুক যে আমরা কথায়, কাজে, আচরণে, সম্পর্কে, ধর্মীয়, সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা হয়েছি নতুন।

আমাদের স্বাধীন ও আধ্যাত্মিক স্বাধীন ও নতুন জীবনে প্রকাশ পাবে :

Ñসকল প্রকার মিথ্যার অবসান এবং সত্য থাকবে জীবনে প্রবহমান

Ñশান্তি ও সম্প্রীতি পরিবারে সবার মাঝে; সকল ঝগড়া-বিবাদ, সকল কুটনামি, হিংসা ও মাতলামির হবে অবসান; কেননা আমাদের জীবনে ঘটেছে যিশুর পুনরুত্থান।

Ñআজ উঠেছে গড়ে এক নতুন সমাজ, মিলন শান্তি ও প্রেমের সমাজ; শেষ হলো যত সামাজিক

কোন্দল; গ্রাম্য রাজনীতি-কূটনীতি; কেননা আমাদের সমাজে আছে যিশুর পুনরুত্থান।

Ñযুব সমাজের আর নয় নৈতিকতার অবক্ষয়; আর নয় ধূমপান, মদ্যপান, নেশা পান; কেননা তারা যিশুর পুনরুত্থানে করেছে আত্মিক স্নান।

Ñহিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আজ একই সুরে গায় মিলনের গান; শান্তি-সম্প্রীতি সংলাপ মহীয়ান; একসঙ্গে গায় তারা পুনরুত্থিত যিশুর জয় গান।

এই আনন্দের দিনেও একটি আক্ষেপ! ইস্টার তথা যিশুর পুনরুত্থান রহস্য খ্রিস্টধর্মের একটি প্রধান ধর্মীয় বিষয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান। খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের ভিত্তিই হলো যিশুর এই পুনরুত্থান। অন্যান্য ধর্মের যেমন প্রধান প্রধান ধর্মীয় পূজা বা ঈদ রয়েছে, ইস্টার তেমনিই একটি মুখ্য খ্রিস্টীয় ধর্মীয় মহোৎসব। দিনটি ছুটির দিন হলেও এই দিনটিতেই ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার তারিখও পড়ে যায়। দেশের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বিষয়টি বিবেচনায় আনবেন, এটি আমাদের প্রত্যাশা। এই ইস্টারে খ্রিস্টবিশ্বাসী আমাদের সবার বিনম্র অনুরোধ যে, এই দিনটিকে ঐচ্ছিক নয় বরং সাধারণ ছুটি বা চঁনষরপ ঐড়ষরফধু হিসেবে অনুমোদন দিলে খ্রীস্টান ছাত্রছাত্রী, চাকরিজীবী এবং সকল পর্যায়ের খ্রীস্টান নারী-পুরুষ গির্জায় যেতে পারবে এবং পারিবারিক, সামাজিক, কৃষ্টিগত ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে পারবে; সর্বোপরি সর্বজনীনভাবে খ্রিস্টবিশ্বাসের কেন্দ্রীয় রহস্যভিত্তিক এই মহোৎসবটি সবার কাছেই সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে, পরিচিত হবে।

হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রীস্টান সবার প্রতি রইল শুভ পাস্কা পর্বের প্রীতিপূর্ণ শুভেচ্ছা। পুনরুত্থিত যিশুর শান্তি ও আনন্দ সবার ঘরে ঘরে বিরাজ করুক। শুভ পাস্কা, শুভ পুনরুত্থান, হ্যাপী ইস্টার!

লেখক : ক্যাথলিক ধর্মযাজক, মু-ুমালা মিশন

রাজশাহী ক্যাথলিক ডায়োসিস