মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বইছে বইয়ের সুবাতাস

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

ড. মধুশ্রী ভদ্র

জ্ঞানের রাজ্য অসীম। এই রাজ্যে বিচরণ করতে হলে বইকে নিত্যসঙ্গী হিসেবে নিতে হবে। মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম ভাষা আর ভাষার সেরা আশ্রয় ‘বই’। বই থেকে আমরা জ্ঞান আহরণ করি; বই আমাদের দান করে আনন্দ ও বিনোদন। উন্নমানের ও রুচিশীল বই পাঠের সুঅভ্যাস আমাদের মনের দিগন্ত প্রসারিত করে; খুলে যায় মনের বদ্ধ জানালা ও অর্গলগুলো। বই মানুষের মনকে সুন্দর করে, হৃদয়কে স্পর্শ করে, মনন ও জীবনকে ঋদ্ধ করে; সমৃদ্ধ করে। আজ এত বছর পরেও টলস্টয়ের কথা প্রতিধ্বনি করে বলতে হয়Ñ ‘মানুষের জীবনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, তা হচ্ছে- বই, বই আর বই।’

পৃথিবীতে বইয়ের আবিষ্কার কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর পূর্বে জোহান্স গুটেনবার্গ (জার্মানি) যখন ‘টাইপ’-এর প্রচলন শুরু করলেন, তখনই পৃথিবীর জ্ঞানভা-ারে যুগান্তকারী সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হলো। শুরু হলো বইয়ের অস্তিত্ব! মুদ্রিত বইয়ের বিকাশে জ্ঞানপিপাসুদের জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস শতগুণ বৃদ্ধি পেল। তার আগে জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ ভূর্জপত্র, তালপাতা ও প্যাপিরাস গাছের পাতায় নথি, পুঁথি ও পা-ুলিপি সুন্দর হস্তাক্ষরে লিপিবদ্ধ করতেন।

কিন্তু সময় বদলেছে। বাংলা টাইপ উদ্ভাবনের পর বাংলা বইয়ের এবং বাংলা ভাষার প্রকাশনা জগত এখন সহজলভ্য। সেই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্পৃক্ততায় উৎকর্ষও বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ!

এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এই বিশ্বায়নের কালে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে সর্বত্র। ই-বইয়ের চমকপ্রদ ব্যাপারটিও অনেক মানুষকে প্রলুব্ধ ও আকৃষ্ট করছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে। এটি সত্য যে, এখন ইন্টারনেটে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ডিজিটাল বই ডাউনলোড করে পাঠ করা যায়। এমনকি সাম্প্রতিক জার্নাল ও গবেষণালব্ধ বই-পুস্তক এবং তথ্যাদি ইন্টারনেটে পেয়ে আমরা উপকৃত হই; আমাদের জ্ঞান হয় সমৃদ্ধ, ত্বরান্বিত হয় গবেষণার কাজ। এটা লক্ষণীয় যে, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, অর্কুট, ইয়াহু মেইল, সেলফোন ইত্যাদি আসার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বের মানুষ বই পড়বে অনলাইনে। কিন্তু না, মানুষের এই ভাবনা সত্য হয়নি। কারণ ইন্টারনেট কখনও বইয়ের বিকল্প হতে পারে না। এর বড় প্রমাণ বাংলা একাডেমির ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।

ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী প্রাণের বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হবে শত-সহস্রাধিক পুস্তক আর বিক্রি হবে কোটি কোটি টাকার বই-পুস্তক। মেলাতে নামবে লাখো মানুষের ঢল। ছুটির দিনগুলোতে মেলা পরিণত হবে জনসমুদ্রে। এসব বিবেচনা করে এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার এই মহাযজ্ঞের পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে তিনগুণ। বই পড়া ও কেনার প্রতি বাঙালীর আগ্রহ বেড়েছে; তাই নিরাপত্তার আর্চওয়ের গেট পার হতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ভেতরে প্রবেশ করে। বইয়ের প্রতি আকর্ষণ না থাকলে এটি কিভাবে সম্ভব? মহান একুশ সবার জন্য খুলে দিয়েছে চেতনার দরজা, একুশ যোগায় মনোবল ও শক্তি।

বই পুরাতনও ভাল, নতুন ভাল। কিন্তু একটি নতুন কাগজের গন্ধভরা বই হাতে নিয়ে বা কোলের কাছে রেখে কিংবা বিছানায় শুয়ে দু’হাত দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টে উল্টে পড়া কি যে আনন্দের! কাগজের সৌরভ ও চকচকে বর্ণিল বাহারি প্রচ্ছদের স্পর্শে কি এক মাদকতা, কি এক অনির্বচনীয় সুখ অনুভূত হয় বইপ্রেমীদের মনে; যা প্রকাশ করা যায় না।

এমন সুখানুভূতি, এমন আনন্দ ই-বুক বা ই-বই পড়লে হবে কি? আমি তো ই-বই পড়াতে তেমন আরামবোধ করি না, সে রকম স্বস্তিও পাই না; মনে হয়, কি যেন নেই, কি যেন নেই; নেই কি প্রাণের পরশ ও স্নিগ্ধতার ছোঁয়া?

তাই বলছিলাম, বইমেলার জনসমুদ্র দেখে মনে হয়, এ দেশে বইপ্রেমীর সংখ্যা তো নেহায়েত কম নয়। আমি আবেগাপ্লুত হই। সুন্দর সুন্দর ভেজা মলাটে মোড়া নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে, কিনতে, নাড়াচাড়া করতে এসেছে লাখো মানুষ!

ই-বুক, বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রবাহের যুগেও বাংলা একাডেমির স্বল্প পরিসরে বইমেলার স্থান সঙ্কুলান হয়নি; পাঠক-লেখক-প্রকাশক ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে সরগরম বইমেলার পরিসর বিস্তৃত করতে হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত! এতেই প্রমাণিত হয়, বইয়ের প্রতি মানুষ আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেনি।

পরিশেষে ছোটবেলা থেকে জ্ঞান হওয়া অবধি দেখে আসা একটি পবিত্র দৃশ্যের বর্ণনা করছি। বই পড়ার সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যটি এ রকমÑ আমার বাবা-মায়ের বিবাহকালীন সুন্দর নক্সা করা উঁচু সাবেকী পালঙ্কজুড়ে শুধু বই আর বই। ইট দিয়ে যেমন করে মানুষ দালান গাঁথে, তেমনি বিছানাজুড়ে তিন পাশে শুধু বইয়ের সারি আর এই বইয়ের দেয়ালের মাঝখানে বসে বা আধশোয়া হয়ে আমার জ্ঞানতাপসী মা বই পাঠে ও সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মগ্ন, যা আমার আনন্দময়ী মায়ের সারাজীবন অব্যাহত ছিল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মায়ের এই জ্ঞানপিপাসা থেমে থাকেনি।

আমরা আমাদের সন্তানদের জন্মদিনে, নববর্ষে, পরীক্ষায় ভাল ফলাফলে দামী খেলনা নয়, মানসম্মত বই উপহার দিতে পারি। নতুন ও বর্ণিল প্রচ্ছদে মোড়া সুন্দর বই হাতে পেলে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে নতুন প্রজন্ম।

মীরপুর, ঢাকা থেকে

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

০৪/০২/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: