মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৮ আগস্ট ২০১৭, ৩ ভাদ্র ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জার্মানি কি উদ্বাস্তুদের জন্য দরজা বন্ধ করবে?

প্রকাশিত : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৬
  • এনামুল হক

এবারের নববর্ষের প্রাক্কালে জার্মানির কোলন এবং ইউরোপের অন্যান্য শহরে রীতিমতো নারকীয় তা-ব সৃষ্টি হয়। পুরুষদের এক একটি গ্যাং হামলে পড়ে শত শত মহিলার ওপর। তারা তাদের কাছ থেকে টাকা পয়সাসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই করে এবং যৌন নিগ্রহ চালায়। পুরুষদের অনেকেই ছিল মাতাল এবং তাদের প্রায় সবাই ছিল উত্তর আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের। এ জাতীয় ঘটনা কখনও ঘটতে পারে ইউরোপীয়রা ধারণাও করতে পারেনি। এর পেছনে কোন সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ছিল না। সন্ত্রাস সৃষ্টি করা এর উদ্দেশ্য ছিল না। তথাপি ঘটনাগুলো সবাইকে সন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত করে তোলে। ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই ঘটেছিল কোলনে।

বলাবাহুল্য মাতাল হয়ে এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ যারা করেছিল তাদের সিংহভাগেই আশ্রয়প্রার্থী উদ্বাস্তু। উদ্বাস্তুদের ঠিক এমন না হলেও এ জাতীয় উচ্ছৃঙ্খলতা অনেকেই আশঙ্কা করছিল। তারা ভেবেছিল উদ্বাস্তুর এই ঢলের কারণে সংস্কৃতির সংঘাত ঘটবে। ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি হবে তা কেউ ধারণা করেনি।

জার্মান কর্তৃপক্ষ ঘটনার সঙ্গে জড়িত শত শত পুরুষের মধ্যে সন্দেহক্রমে ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছেÑ যাদের ২২ জনই আশ্রয়প্রার্থী। এদের সিংহভাগই মরক্কো ও আলজিরিয়ার। কোলনের ঘটনা চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মেরকেলকে অতি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। নববর্ষের প্রাক্কালে যখন তিনি টেলিভিশনে ভাষণ দিচ্ছিলেন এবং তাতে আশ্রয়প্রার্থী উদ্বাস্তুদের জার্মান মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য গ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহূর্তে এই হামলার ঘটনার শুরু হয়। কোলনের প্রধান ক্যাথেড্রালের সামনে তরুণের দল একে অপরের দিকে এবং তারপর জনতার মধ্যে আতশবাজি ছুড়ে মারে যা আতঙ্ক ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। তারপর রেলস্টেশনে ও অন্যান্য জায়গায় শুরু হয় উন্মাদনা। মহিলাদের জন্য ব্যাপারটা ছিল কল্পনাতীত রকমের খারাপ। সেরাতে কোলনে সাড়ে ছয় শ’রও বেশি মহিলা লাঞ্ছিত ও ছিনতাইয়ের শিকার হয়। এদের প্রায় অর্ধেক ছিল যৌন নিগ্রহের শিকার। অনেকের অন্তর্বাস টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে হাত দিয়ে যা খুশি করা হয়।

২০১৫ সালে জার্মানিতে যে সব নতুন শরণার্থী এসেছে তাদের ২১ শতাংশকে গ্রহণ করা হয় উত্তর-বাইন ওয়েস্টফালিয়ায়। এত বেশি আর কোথাও গ্রহণ করা হয়নি। কোলন হলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নগরী। পুলিশের কাছে রক্ষিত হিসাব থেকে জানা যায় যে, উত্তর আফ্রিকার অভিবাসীদের ৪০ শতাংশ জার্মানিতে আসার এক বছরের মধ্যে চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়েছে।

কোলনের ঘটনায় শরণার্থীদের প্রতি জার্মানদের মনোভাব উল্লেখযোগ্যরূপে বদলে গেছে। এক জরিপে ৬০ শতাংশ জার্মান মত প্রকাশ করেছে যে, উদ্বাস্তু পরিস্থিতির মোকাবেলা করা এদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। মনোভাবের এই পরিবর্তনের ফলে মাত্র কয়েকমাস আগেও যে সিংহভাগ জার্মানের মান্য উদ্বাস্তুদের সাদরে বরণ করার কালচার গড়ে উঠেছিল তার অবসান হতে পারে। গত শরতে সারা দেশের আশ্রয় কেন্দ্রগুলো জার্মানদের দেয়া দান-সাহায্যে এত সয়লাব হয়ে উঠেছিল যে, আয়োজকদের অনেক সময় মানুষকে বলতে হয়েছিল ‘এসব বন্ধ করুন’ কোলনের ঘটনার পর আজ তাদের বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘এদের জন্যই কি আমি আমার বস্ত্র দান করেছিলাম!’

গত বছর জার্মানিতে যত উদ্বাস্তু ও অভিবাসী এসেছে মোটামুটিভাবে সেটা দেশের চতুর্থ বৃহত্তম নগরী কোলনের জনসংখ্যার সমান। এবার শীতের মাসগুলোতেও এদের আগমন অব্যাহত থেকেছে। প্রতিদিন ৩ হাজারেরও বেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে এবং তাদের সিংহভাগের গন্তব্য জার্মানি। ফলে ইউরোপে আশ্রয় সন্ধানীদের সিংহভাগের দায়িত্ব এসে পড়েছে জার্মানি এবং কিছুটা কম হলেও সুইডেনের ওপর। ইউরোপের যে কোন দেশের তুলনায় সুইডেন মাথাপিছু বেশি উদ্বাস্তু গ্রহণ করেছে। ইউরোপের বাকি বেশিরভাগ দেশ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কোলনের ঘটনার পর জার্মানিতে উদ্বাস্তুদের প্রতি আগের সহমর্মিতাবোধের স্থলে এখন বৈরী মনোভাবের জন্ম হয়েছে। জার্মানির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। সেøাগান উঠেছে এবং প্লেকার্ড উৎকীর্ণ হয়েছে। ‘বিফিউজিস নট ওয়েলকাম।’ কেউ কেউ আবার কোলন ঘটনার দায়-দায়িত্ব এককভাবে মুসলমানদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

বলছে যে, নববর্ষের প্রাক্কালে মুসলিম শরণার্থীরা জার্মান মহিলাদের ওপর সর্বাত্মক সন্ত্রাসী আক্রমণ শুরু করেছে। আবার নব্য নাৎসিবাদীরাও কোলন ঘটনার সুযোগ নিয়ে উদ্বাস্তুবিরোধী এবং বিশেষ করে সেমিটিক কিশোরী অপপ্রচারে নেমে পড়েছে। কোথাও কোথাও এশীয়দের ওপর হামলাও হয়েছে। মেরকেল সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ আসছে উদ্বাস্তুদের জার্মানিতে প্রবেশের দরজা বন্ধ করে দেয়ার জন্য।

কিন্তু মেরকেল সরকার শেষ পর্যন্ত কি সে পথে যাবে? সম্ভবত না। শরণার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি করতে পারে কিন্তু দরজা একেবারে বন্ধ করবে না। কারণ জার্মান শিল্পের জন্য সস্তা শ্রম দরকার যা যোগাতে পারে এই উদ্বাস্তুরা। এ মুহূর্তে জার্মানিতে ৬ লাখ শ্রমিকের পদ খালি আছে। শ্রমিক মিলছে না। উদ্বাস্তুদের দিয়ে সেই শূন্যপদ পূরণ করার এত বড় সুযোগ কি জার্মানি হারাতে চাইবে?

সূত্র : টাইম

প্রকাশিত : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

০৩/০২/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: