১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

নৌকা জীবন ॥ আজ এ ঘাটে তো কাল ও ঘাটে


‘ঘাটে বাইন্ধাছি নাও,

বন্ধু-পান খাইয়া যাও,

বন্ধু-কথা কইয়া যাও।’

ভালবাসার আবেগ হৃদয়ের আকুলতায় এভাবেই প্রকাশ করে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ। হোক তিনি পুরুষ কিংবা নারী। শেষ বিকেলের নরম আলোয় ঘাটে বাঁধা নৌকার সারি থেকে ভেসে আসা এমন সুরে একটু থমকে দাঁড়াতেই হয়। প্রেমের মানুষকে কাছে পাওয়ার এ আকাক্সক্ষা নদীর ঢেউ ভেঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে সবার হৃদয়ে।

ভাসমান জীবন। পেটে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। পরনে শতছিন্ন মলিন পোশাক। তার মাঝেও আছে জীবন। আছে বেঁচে থাকার অদম্য স্বপ্ন। আর তাই শত বছরের জীবনাচার থেকে আজও হারিয়ে যায়নি বাংলার মাটি-জলের লোকজ সংস্কৃতি। অর্থনীতি, খেলাধুলা, ভাষা, ধর্ম, পেশাসহ জীবনধারণের সবকিছুতেই সম্প্রদায়টির আদি সংস্কৃতির দেখা মেলে। এমনকি নারী-পুরুষের চিরন্তন সম্পর্ক প্রকাশেও আছে তাদের নিজস্ব গান। যা শুধু দেখারই নয়, উপলদ্ধিরও বিষয়।

‘মানতা’ মানে বাংলাদেশের ভিন্নধারার এক জনগোষ্ঠী। আরবের বেদুইন কিংবা দেশের বেদে সম্প্রদায়ের মতো। বহর নিয়ে চলা। সরদার প্রথা। গোত্র। সংস্কৃতি। জীবনের প্রায় অনেক কিছুতে বেদেদের জীবনযাত্রার ছাপ। তাই বলে তারা নিজেদের বেদে বলতে নারাজ। বরং অনেকে নিজেদের ‘জেলে’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। পটুয়াখালী-বরিশাল-বরগুনা-ভোলাসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় সম্প্রদায়টির লোকসংখ্যা আনুমানিক ১৫/১৬ হাজারের মতো। মূল ভূমিতে তাদের বেশিরভাগের কোন ঠিকানা নেই। কয়েক শ’ বছর ধরে নৌকা নিয়ে বেঁচে আছে। দিন মাস বছর কাটে নৌকায়। নৌকার ছইয়ের নিচে কাটে জীবন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আবর্তিত হয় নৌকাকে ঘিরে। আজ এ ঘাটে। কাল অন্য ঘাটে। এবেলা এ নদী তো কাল অন্য কোন নদী। জোয়ার-ভাটায় চলে নৌকা। ছোট্ট সে নৌকা। তার ভেতরেই সন্তানাদি থেকে শুরু করে সকলকে নিয়ে জীবনযাপন। নৌকা চলে বহর বেঁধে। ১০/১৫টি নৌকা নিয়ে বহর হয়। কোন কোন বহরে কমবেশি নৌকা থাকে। পেশা তাদের মাছ ধরা। বড়শি দিয়ে তারা নিজস্ব কায়দায় মাছ ধরে। একেকটি নৌকায় এক/দেড় হাজার বড়শি থাকে। পোয়া, পাঙ্গাস, কাহন, গুলশাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বড়শিতে বেশি ধরা পড়ে। মাছ ধরায় নারীরা বেশি দক্ষ। মাছ শিকারে তাদের নিপুণতা মনোযোগীদের আকৃষ্ট করবেই। ইদানীং অবশ্য অনেকে জাল দিয়েও মাছ ধরছে।

মূল ভূমির মানুষের সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের লোকজনের খুব একটা যোগাযোগ নেই। বরং মূল ভূমির মানুষের কাছে সম্প্রদায়টি বরাবরই উপেক্ষিত। মূল ভূমির মানুষ সম্প্রদায়টিকে ‘বইড়াল’, ‘ব্যবাইজ্জা’ প্রভৃতি নামে সম্বোধন করে, যা তাদের কাছে গালির মতো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোগল আমলেও এ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এ অঞ্চলে ছিল। সে সময়েও তারা বড়শি দিয়েই মাছ ধরত। ব্রিটিশ আমলে একবার তাদের ওপর কর আরোপ করা হয়। এর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রদায়টি উপকূল অঞ্চলে কয়েক শ’ বছর ধরে বাস করছে। আরও ধারণা করা হচ্ছে, মানতা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি মূলত বেদে সম্প্রদায় থেকেই। উপকূল অঞ্চলের খাল-নদী-সাগরে মাছ সহজলোভ্য হওয়ায় এটিকেই তারা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বেদেদের মধ্যেও ‘মানতা’ নামে একটি গোত্র রয়েছে। বেদেদের অনেক প্রথাই এখনও তাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। যেমন বেদেদের মতো আছে সরদার প্রথা। বংশ পরম্পরায় এ প্রথা চলে আসছে। বাবার পরে ছেলে হয় সরদার, এ অলিখিত নিয়ম আচারে পরিণত হয়েছে। বিচার-সালিশ সব করে সরদার। নৌকার বহর কোথায় নোঙর হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব সরদারের।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে