২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

হারানোর পথে ঘেটু গান পুঁথি পাঠ


লোক সাহিত্যের স্বর্ণ ভা-ার বলে পরিচিত ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের ময়মনসিংহ গীতিকা তার উজ্জ্বল প্রমাণ। লোক জীবনের নানা জিজ্ঞাসা, আনন্দ বেদনা, বিশ্বাস, কর্ম, আচার প্রেম ভালবাসা ময়মনসিংহ গীতিকায় হয়ে উঠেছে ছন্দ ও সুরময়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোক জীবনচর্চায় নানা শ্রেণী পেশার মানুষের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হাসিকান্না, প্রেম ভালবাসার কাহিনী জীবন্ত হয়ে উঠেছে লোকজ সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনায়। পুঁথি পাঠের আসর থেকে শুরু করে পালাগান, কবি গান, ঘেটু গান, বাউল গান, বাইদ্যানীর গান, যাত্রাপালা, জারি সারি, বর্ষবরণ উৎসব, লাঠি খেলা, নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াইÑ লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য মেলে ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে গাঁথা রয়েছে বলেই এখনও হারিয়ে যায়নি এই সংস্কৃতি। বরং হারানো ঐতিহ্যের অনেক লোকসংস্কৃতি আবার ফিরতে শুরু করেছে। কদরও বাড়ছে। শহরের নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও যখন টাউনহল কিংবা উন্মুক্ত কোন মঞ্চে যাত্রাপালা রূপবান কিংবা পালাগান মঞ্চস্থ হয় সেখানে হাজারো মানুষের জমজমাট ভিড়ই বলে দেয় এর আবেদন কতখানি।

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাপ্তাহিক প্রিয় প্রসঙ্গ সম্পাদক সালিম হাসানের মতে, লোকসাহিত্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং লোকসাহিত্য ও লোকজ সংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা। লোকজীবনের চর্চার নানা অনুষঙ্গই লোকজ সংস্কৃতি হিসেবে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এর মধ্যে হারানো সংস্কৃতি সরাসরি লোকজ সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। একসময় ময়মনসিংহ অঞ্চলে পুঁথি পাঠের আসর বসত। সপ্তদশ শতকে ছন্দ ও সুরময় এই পুঁথিপাঠ ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যের কাহিনীকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই পুঁথির ভেতর। মোহাম্মদ আজিম উদ্দিন রচিত ময়মনসিংহের পুঁথি সাহিত্য থেকে জানা যায়, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুসলমান কবিদের সৃষ্টি পুঁথি। গাজী কালু চম্পাবতী, ছহী শেখ ফরিদের পুঁথি, ইমাম সাগরের পুঁথি, অতুলা সুন্দরী, বাহাদুর খাঁ ইত্যাদি পুঁথি জনপ্রিয় ছিল। প্রতিটি পুঁথির ভাষায় বাংলার সঙ্গে আরবী ফার্সীর সংমিশ্রণ ছিল। সকল পুঁথিই হামদ ও না’ত রীতিতে আল্লাহ ও রাসুলের (দঃ) গুণগান দিয়ে শুরু। এখন কদর না থাকায় হারিয়ে গেছে পুঁথি পাঠ। কবি ও পালাগানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কোন কল্পকাহিনী অথবা বিয়োগান্তক কোন রোমান্টিক প্রেম কাহিনীকে। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত জমজমাট ছিল কবি গানের আসর। অধ্যাপক যতীন সরকারের ময়মনসিংহের কবি গান ও কবিয়াল প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, হালখাতা, পুণ্যাহ কিংবা অন্যান্য উৎসব ছাড়াও দুর্গাপূজা, কালীপূজায় গ্রামের তালুকদার, জোতদার, মহাজন শ্রেণীর অবস্থাসম্পন্ন লোকেরাই কবিয়ালদের বায়না করে বাড়িতে এনে কবি গানের আসর বসাত। রামু, রামগতি, রামকানাই ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল ছিলেন। পুঁথি পাঠের আসর ও কবিগান হারিয়ে গেলেও ফিরে এসেছে পালাগান। মহুয়া-মলুয়া, দেওয়ানা-মদিনা, কাজল রেখা, কমলা, কেনারাম, চন্দ্রাবতী, কংকন ও লীলা, রূপবতীসহ ২১টি পালাগান ঠাঁই পেয়েছে ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের ময়মনসিংহ গীতিকায়। এসবের পাশাপাশি ময়মনসিংহ অঞ্চলে গারো আদিবাসীদের বৃহত্তম সামাজিক উৎসব-নবান্ন উৎসব ‘ওয়ানগাললা’-এখনও টিকে আছে। ঝুম ক্ষেতের ফসল তোলা শেষ হয়ে গেলে এই উৎসবের শুরু। বাংলা কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে এই উৎসব উপলক্ষে বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি চলে। বাড়িঘর উঠান পথঘাট পরিষ্কার করা ও সাজানো হয়। কেনা হয় নতুন পোশাক।

এ উপলক্ষে প্রচুর চোলাই মদ ‘চু’ তৈরি করা হয়। নকমা ও খামাল পুরহিত গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে সাতদিন আগে তারিখ ঘোষণা করেন। তিন দিনব্যাপী উৎসবের প্রথম দিন ভোরে প্রত্যেক বাড়ির কর্তা ব্যক্তি নিজ আঙ্গিনায় জুম চাষের কিছু ফসল, পিঠা-পিটালী, হাঁসমুরগির রক্ত মাংস-নাড়িভুঁড়ি ও মদ সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করে।

Ñবাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে