১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

দই ॥ পর্তুগীজরা আদি কারিগর


বাঙালীর প্রবাদে আছে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে না।’ দইয়ের আদি উৎপত্তি এই ঘোল থেকে। পাতলা করে দই বানিয়ে তা মাটির ছোট্ট খুঁটিতে ভরে ডালার মতো ভাড়ে খড় বিছিয়ে রেখে বিক্রি হতো। এই দই পানির সঙ্গে মিশিয়ে সামান্য লবণ দিয়ে পান করা হতো। এই হলো ঘোল। গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রাণ যখন হাঁসফাঁস তখন গ্রামীণ জনপদে এই ঘোল এনে দিত স্বস্তি। এক পর্যায়ে ঘোল থেকে দই বানানোর কারিগররা আবিষ্কার করে বসে দুধকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় গরম করার পর বাতাসে রেখে শীতলিকরণে দই তৈরি করা সম্ভব। বড় হাঁড়িতে ভরা সাদা চুনের মতো দেখতে এই দইয়ের স্বাদ ছিল টক। একটা সময় মজলিসে ও বড় অনুষ্ঠানে খাওয়ার পর এই দইয়ের সঙ্গে সামান্য গুড় সরবরাহ করা হতো। ভূরিভোজনের পর এই দই ছিল রসনা তৃপ্তির অন্যতম উপাদান। ত্রিশের দশকের ঘোষদের বানানো দই এতটাই জনপ্রিয় হয় যে মজলিস বিয়ের অনুষ্ঠান গ্রামের প্রভাবশালীদের কোন অনুষ্ঠানে সাদা দই না হলেই নয়। দইয়ের পরিচিতি ছিল টক জাতীয় খাবার। অর্থাৎ দই মানেই টক কিছু। চিকিৎসা বিজ্ঞানে রিচফুডের পর টক স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম। সেই হিসেবে দই স্বাস্থ্য সম্মত খাবার। গত শতকে চল্লিশের দশকের পর থেকে দইয়ের রকমফের ঘটতে থাকে। এর আগে উপমহাদেশের ভারতীয় ময়রারা (মিষ্টি বানানোর কারিগর) রসগোল্লা, সন্দেশ, চমচম, পানতুয়া, কালোজাম ও লাড্ডু ইত্যাদির সঙ্গে নতুন আরও কিছু বানানো যায় কি না এ নিয়ে এক ধরনের গবেষণা করে। এই বিষয়টি আসে তৎকালিন গ্রেট ব্রিটেন থেকে। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডন ছিল এই উপমহাদেশে বাণিজ্যের সূতিকাগার। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ব্রিটেন ওই সময়ে বাঙালী ময়রাদের নিয়ে গিয়ে মিষ্টির জাত নির্ণয়ে কাজে লাগায়। এক সময় দুধকে তাপমাত্রা কমবেশি করায় এক ধরনের ঘন তরল মিষ্টি বের হয়ে আসে। যা কয়েক পর্যায়ে দইয়ের ফর্মে চলে আসে। তারওপর বাঙালীরা এই দইকে একের পর এক রিফাইন প্রক্রিয়ায় এনে মিষ্টির সারিতে এনে বসায়। তারপর দইকে আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। বাঙালীর মিষ্টিপ্রীতির সঙ্গে যোগ হয় দই। আর চল্লিশের দশকেই বিশেষ ধরনের সরার দইয়ের প্রধান ভূমি হয়ে পড়ে বগুড়া। সেই থেকে বগুড়া দইয়ের রাজধানী হয়ে আছে। বগুড়ার সরার দইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকে দই বানাতে চেষ্টা করে। কিন্তু বগুড়ার দইয়ের ধারে কাছে কেউ আসতে পারেনি। বাঙালীর জীবনে যে কোনভাবে ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠতেই মিষ্টির আগমনী বার্তা সঙ্কেত দেয়। ঐতিহ্যের এমন মিষ্টি সংস্কৃতি অন্য কোথাও নেই। রসগোল্লা, চমটম ও সন্দেশের কথাই আলাদা। উনবিংশ শতকে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দই। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো সন্দেশের আভিধানিক অর্থ ‘সংবাদ’ (নিউজ, ইনফরমেশন, মেসেজ, রিপোর্ট)। ‘ডিলিশিয়াস সুইটমিট মেড বাই পোসেট’ এই অর্থটি এসেছে অনেক পরে। হিন্দী ভাষাতেও সংবাদকে বলা হয় সন্দেশ। সেই সন্দেশ কি করে জিভেয় জল আসা মিষ্টান্ন হয়ে গেল এর ব্যাখ্যা পাওয়া বেশ কঠিন। পৌরাণিক কাহিনীতে আছে কয়েক হাজার বছর আগে গোয়ালারা গাভীর দুধ দুইয়ে সংরক্ষণ করার পর খার হয়ে গেলে তা দিয়ে খারখন্দ বানাতো। সেই খারখন্দই সন্দেশে পরিণত হয়। বাঙালীর মিষ্টি প্রীতির ধারায় একটা সময় সন্দেশ থেকেই তৈরি হতে থাকে নানা জাতের মিষ্টি। এরই ধারাবাহিকতায় ঘন তরল এক ধরনের মিষ্টি দই হয়ে আসে। যে দই ও মিষ্টি নিয়ে এত মাতামাতি তার প্রকৃত উপাদান উপমহাদেশে তৈরি করা শিখিয়েছে পর্তুগীজরা। বৈদিক যুগে দুধ থেকে তৈরি খাবার ছিল পৌরাণিক ধারার অংশ। পর্তুগীজদের পর বাঙালীরাই ছানা থেকে একের পর এক দুগ্ধজাতীয় খাবার বানাতে থাকে। শুরুতে এদের বলা হতো হালুইকর। পরে ময়রা। আজও এই নামেই তারা পরিচিতি। বগুড়ার সরার দই আভিজাত্য ধরে রেখেছে। প্রাচীন নগরী বগুড়ার মহাস্থানগড়ে পর্যটকরা এসে ফিরে যাওয়ার সময়ও নিয়ে যান দই। আবার বগুড়া থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সময় দই নিতেই হবে। বগুড়ার দইয়ের মূল ঠিকানা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলায়। সুখ্যাতি এনে দিয়েছেন গৌর গোপাল চন্দ্র ঘোষ (প্রয়াত)। সরার দইয়ের উৎপত্তি সরভাজা থেকে। অর্থাৎ দুধ ঘন করে জাল দিয়ে যে সর হয় তা শুকিয়ে ভেজে সুস্বাদু করা হয়। গেল শতকের ৪০’র দশকের মধ্যভাগে গৌর গোপাল এই সরভাজা বানিয়ে হেঁটে শহরতলির বনানী এলাকায় বিক্রি করতেন। ওই সময়ে বগুড়ার নওয়াব সরভাজা খেয়ে খুশি হয়ে শহরের নবাববাড়ির উত্তর দিকে আম বাগানের মধ্যে জায়গা দেন। সরভাজা থেকে মাটির সরায় দই ভরানো শুরু হয়। সেই থেকে সরার দই। দই এমনই ঘন ছিল যে সরা উল্টে ধরলেও পড়ত না। বগুড়ার সামজিক অনুষ্ঠান ও আতিথেয়তায় দই না থাকলে অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। হালে সরার দইয়ের পাশাপাশি খুঁটি ও বাড়কিতেও দই ভরা হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিনি ছাড়া দই বানানো হচ্ছে। বগুড়ার দইয়ের অনেক কারিগর অন্য এলাকায় বিশেষ করে ঢাকায় গিয়েও সরার দই বানিয়েছেন তবে তা বগুড়ার মতো সুস্বাদু হয়নি। প্রবীণ কারিগর আলতাফ হোসেন জানালেন, প্রকৃতিই একেক এলাকার বৈশিষ্ট্য আলাদা করেছে। বগুড়া অঞ্চলের গরু এই প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে উঠে ঘাস লতাপাতা খেয়ে যে দুধ দেয় তা দিয়ে যে দই হয় অন্য এলাকার দুধ দিয়ে তা হয় না। আবার বগুড়া থেকে দুধ কিনে নিয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে জাল দিলে তা ফেটে যায়। তার কথায় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ নেই তবে প্রকৃতির প্রমাণও ফেলে দেয়া যায় না। বগুড়ার মাটিই দইকে খ্যাতির তুঙ্গে নিয়ে মিষ্টি বন্ধুত্বের দুয়ার খুলে দিয়েছে। বগুড়ার সরার দই বছর কয়েক হয় ভারতে রফতানি হচ্ছে। প্রথম রফতানি হয় শিলিগুড়ির বাণিজ্য মেলায়। ষাটের দশকে তৎকালিন সরকার বগুড়ার দই ব্রিটেন ও আমেরিকাতেও নিয়ে গেছে। বর্তমানে দেশজুড়ে দইয়ের কথা উঠলেই প্রথমে বলাবলি হয় বগুড়ার দই। এই দই বগুড়াকে দইয়ের রাজধানীতে পরিণত করেছে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে