২৪ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিপর্যস্ত নেপালের অর্থনীতি


এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র দেশ নেপাল। গত পঁচিশ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে দেশটির অবকাঠামো, কৃষি, পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত আশি বছরে এ সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এর ফলে দেশটির অর্থনীতির ক্ষতি দশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেশটির এক দশকেরও বেশি সময় লাগবে বলে তারা মনে করছেন। ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রলয়ঙ্করী এ ভূমিকম্পে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা দশ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, এ ভূমিকম্পে দেশটির আশি লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়েছে পঁচিশ হাজার পরিবার। যা দেশটির অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি।

কৃষি ও পর্যটন নির্ভর দেশ নেপালের মানুষের বার্ষিক গড় আয় এক হাজার মার্কিন ডলার। মোট জিডিপির আশি শতাংশ আসে কৃষি থেকে। এছাড়া পর্যটন দেশটির অর্থনীতির বড় একটি খাত। নেপালের কৃষি নিয়ে কাজ করছেন অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্স। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ডিকসন বলেন, নেপালে এক কোটি দশ লাখেরও বেশি মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য পাহাড়ী উপত্যকায় এক থেকে দুই হেক্টর জমি নিয়ে ছোট ছোট খামার তৈরি করে। খামারগুলোর দেখাশোনাসহ বেশিরভাগ কাজ করেন মহিলারা। কিন্তু ভূমিকম্পে পাহাড়ী উপত্যকার বেশিরভাগ খামার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নেপালের খাদ্য উৎপাদন বড় রকমের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

নেপালের পর্যটন শিল্প অনেকাংশে নির্ভর করে দেশটির অবকাঠামোর ওপর। ভূমিকম্পে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাতটি। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখের মতো পর্যটক নেপালে ঘুরতে আসে। এ সব পর্যটককে কেন্দ্র করে নেপালে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এছাড়াও এ খাতে প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ থাকায় হাজার হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশটিতে শুধুমাত্র ব্রিটিশ পর্যটক আসে চল্লিশ হাজার। স্কেটিংসহ নেপালের নিম্নভূমির বন্যপ্রাণী তাদের আকর্ষণ করে। কোন পর্যটকই যে জায়গাটি বেড়ানো বাদ দেন না, তাহলো ইতিহাসের উজ্জ্বল নির্দশন ভরা প্রাণবন্ত রাজধানী কাঠমান্ডু। এখন ইতিহাস সমৃদ্ধ নগরের প্রায় সবটাই বিপর্যস্ত। যে সব পর্যটক এখনও নেপালে অবস্থান করছেন, তাঁরা ফিরে যাবেন তাঁদের নিজ নিজ দেশে। আর নিয়ে যাবেন ভয়াল এই ভূমিকম্পের স্মৃতি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলো পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বিশেষ করে যেসব মানুষ পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, তাদের পরিস্থিতি সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়বে। এবারের ভূমিকম্পের বড় আঘাত এভারেস্ট পবর্তারোহীদের তুষার ধসে মৃত্যুর ঘটনা। তবে দেশী বিদেশী পর্বতারোহীরা এভারেস্টের টানে এখানে ছুটে আসবেনই। আগামী বছর নেপালের অর্থনীতিতে হাজার হাজার ডলার ঢালবেন তারা। তাই নেপালের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে দেশটিতে পর্যটকদের আকর্ষণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

ভুমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালকে প্রাথমিক পুনর্বাসনের জন্য ২০ কোটি মার্কিট ডলার দেবে এডিবি। তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ লাখ মার্কিন ডলার দেবে তারা। এছাড়াও সহায়তা ফান্ড তৈরি করবে বলেও জানায়। ১২০টন মানবিক সাহায্য জামা, কাপড় দেবে ইউনিসেফ। যুক্তরাষ্ট্র দেবে উদ্ধারকর্মী ও ৪৫ টন খাবার। নরওয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ কোরিয়া দেবে যথাক্রমে ৩.৯ মিলিয়ন, ৩.৩ মিলিয়ন ও ৩.১ মিলিয়ন ডলার। অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড দিচ্ছে ৪.৫ মিলিয়ন ডলার। নেপালকে সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে চীন, জাপান, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। সাহায্যের জন্য ৪৪.৫ কোটি ডলারের তহবিল গঠন করবে জাতিসংঘ। এই অনুদান নেপালের মানুষের সাময়িক সমস্যা কাটাতে হয়ত সাহায্য করবে। কিন্তু যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করা সত্যিই কঠিন। নেপালে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে ২০টি পারমাণবিক বোমার আঘাতের সমান বলে উল্লেখ করেছেন একজন ভূমিকম্প বিশেষক্ষ। তিনি বলেন, এর প্রতিটি আঘাত ছিল জাপানের হিরোশিমায় আঘাত হানা পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী। জার্মানের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ জেমস্ ডেনিল বলেন, নেপালে অর্থনৈতিক অবকাঠামো আরও বড় হলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি হতো। যা অপরিকল্পিত শহরগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। নেপালের বাতাসে এখন লাশের গন্ধ। যতই দিন যাচ্ছে লাশের সংখ্যা ততই বাড়ছে। একদিকে প্রিয়জন হারানোর আর্তনাদ, অন্যদিকে খাবারের সঙ্কট।এমন বাস্তবতায় ক্রমেই ভারি হয়ে উঠছে নেপালের বাতাস।