২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নারী উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি


মেধা ও প্রজ্ঞায় বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের সরণী নিঃসন্দেহে উর্ধমুখী। পরিবার, সমাজ, শহর, নগর, গ্রামের প্রতিটি নারী যে যার অবস্থানে থেকেই বর্তমানে এখন অত্যন্ত সচেতন। তাঁরা নিজেদের কেবল নারী হিসেবে নয়, আপনজনসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের অস্তিত্বের সরব উপস্থিতিতে আলোকিত মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পেরেছেন। এমন নয় যে নারীদের এই আলোকিত কর্মময় অবস্থান তৈরির পথ খুব মসৃণ ফুল বিছানো ছিল বা আছে। রাষ্ট্রের অর্ধেক জনগণ নারী। তাদের সার্বিক উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে দেশের সচেতন জনসমাজ প্রয়োজনীয় একাত্মতা ও সহযোগিতা অনুভব করেছে বলেই আজ বাংলাদেশে নারীরা স্বকীয় শক্তিতে শক্তিশালী। নারী উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল ১৯৭২ সালে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের ধ্বংসস্তূপকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সংবিধানে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো, পবিত্র সংবিধানের ২৭ ধারায় উল্লেখ আছে যে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ ২৮(ক) ধারায় রয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রবৈষম্য প্রদর্শন করবে না’। অর্থাৎ স্বাধীনতা অর্জনের প্রথমেই দেশের নারীদের যোগ্য মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রের যোগ্য জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে কোনপ্রকার বৈষম্যের নীতি গ্রহণ করা হয়নি। সংবিধানের ২৮(৩)-এ আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী-পুরুষভেদ বা বিশ্রামের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাবে না’। ২৮(৪)-এ উল্লেখ আছে যে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না’। ২৯(১) এ রয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে’ সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে’। ২৯(২) এ আছে ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মের নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না’। সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কর্ম এবং পদের ক্ষেত্রে কোন প্রকার অপ্রয়োজনীয় বাধাকে রাষ্ট্র অহেতুক গ্রহণ করবে না। এছাড়াও ক্ষমতায়নের রাজনীতিতে নারীর অধিকারকে প্রলম্বিত করতে ৬৫(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত হয়েছে এবং ধারার অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।’ ১৯৭৫ সালকে যখন ‘নারীবর্ষ’ হিসাবে ঘোষণা দেয় জাতিসংঘ সেই তখন-ই সরকারের সদিচ্ছার কারণে মেক্সিকতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এই প্রথম বাংলাদেশী নারীরা যোগ দেয়। প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয় ১৯৭৬-১৯৮৫ সালকে নারী দশক হিসেবে ঘোষণা করার। নারীর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালকে ‘নারীবর্ষ হিসাবে ঘোষণা করে। ১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে সমতা, উন্নয়ন ও শান্তিকে মূল বিষয় করে ১৯৭৬-১৯৮৫ সালকে নারী দশক হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নারী সম্মেলনে গৃহীত নারী দশকের ১৯৭৬-৮৫ পর্বের প্রথম পাঁচ বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এতে যথেষ্ট সাফল্য অর্জিত হওয়ায় নারীর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাঁচ বছর পরে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলনে পূর্বের লক্ষ্যগুলোর এক সমন্বিত অগ্রমুখী কৌশল গ্রহণ করা হয়। ১৯৯৪ সালের জাকার্তা ঘোষণায় ক্ষমতাবণ্টন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী পুরুষের মধ্যকার অসাম্য এবং সীমাবদ্ধতা দূর করার ক্ষেত্রে সরকারসমূহের উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করার তাগিদ দেয়া হয়। ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে চতুর্থ নারী সম্মেলনে জেন্ডার ও উনয়ন কর্মপরিকল্পনাসহ নারী উন্নয়নে ১২টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রতি যাবতীয় বৈষম্য নির্মূলের উদ্দেশ্যে সিডও গৃহীত হয় এবং ১৯৮১ সালে তা কার্যকরী করা হয়। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ এই সনদ অনুস্বাক্ষর করে। সকল নারীর জন্য এটি আন্তর্জাতিক বিল অব রাইটস বা নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ বলে চিহ্নিত। নারী অধিকার সংরক্ষণের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদ- বলে বিবেচনা করা হয় এই দলিলকে। ১৯৭৩- ৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাধীনতাযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত, ছিন্নমূল নারীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কর্মসূচী গৃহীত হয়। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে কাজ করে চলে। নারী পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চাকরি প্রদান থেকে নারীদের উন্নয়নে ১৯৭৪ সালে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করা হয়। প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন নারী উন্নয়নে কতগুলো কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল। সেগুলো হলোÑ ১. নারী উন্নয়নে দেশের সকল জেলা ও মহকুমায় ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা; ২. কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা; ৩. নারীকে উৎপাদনমুখী কর্মকা-ে নিয়োজিত করে প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা; ৪. উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত নারীর জন্য সার্বক্ষণিক সুবিধা প্রদান করা; ৫. যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিৎসা প্রদান করা; এবং ৬. মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালু করা যা বর্তমানে মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের আওতায় দুস্থ মহিলা এবং শিশুকল্যাণ তহবিল নামে পরিচালিত হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের এই কর্মসূচীর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীদের উন্নয়নের স্বার্থে যুগান্তকারী কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয়। যেমন নারীদের অর্থকরী কাজে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ, নারীদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী গ্রহণ করা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গণশিক্ষা কার্যক্রম যা কিনা বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নারী সমবায় কর্মসূচী গঠন করা, ‘গ্রামীণ মহিলাদের জন্য কৃষিভিত্তিক কর্মসূচী’, নারী কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, সেবা ও অন্যান্য খাতে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য দূর করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, স্ব-কর্মসংস্থান এবং ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ করা, জেন্ডার সম্পর্কীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং নারীর জন্য সহায়ক সুবিধা সম্প্রসারণ যথাÑ হোস্টেল, শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র, আইন সহায়তা প্রদান উল্লেখযোগ্য।

এমন নয় যে, এসব কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশের নারীরা কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। বরং ক্রমবর্ধমান নারী উন্নয়নে সরকার প্রাচীন আইনের পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন আইন তৈরি করেছে। পণপ্রথা বন্ধ, মুসলিম পারিবারিক আইনের পরিবর্তন, বাল্যবিবাহ রোধ আইন, নারী ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধ আইন, নির্যাতিতার জন্য বিনা পারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা প্রদানসহ পুুনর্বাসন ব্যবস্থা করেছে। প্রশাসন ব্যবস্থায় নারীর অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। বাংলাদেশের নারীরা দারিদ্র্য জয়ে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা বিদেশে গিয়েও বিভিন্ন কাজকর্ম করে অর্থ উপার্জন করছেন। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে নারীদের পক্ষে দারিদ্র্য জিতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ নারীকর্মী তৈরির নানা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান সরকার নারীর উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে। নারী উন্নয়নে প্রতিশ্রুত লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়ন করে চলেছে বর্তমান সরকার। জাতীয় নারী উনয়ন নীতির লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে নারীদের আরও বেশি স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা। এক সময় পুরুষের কাঁধে ভর করেই নারীর সমগ্র জীবন কেটে যেত। বর্তমানে এই ধারণাকে বহুলাংশে মিথ্যে প্রমাণ করে বাংলাদেশের নারীরা দেশে এবং বিদেশে স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে সকলের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। এখন কেবল প্রয়োজন বাংলাদেশের নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার বাস্তবায়ন করা। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করে নতুন আইন প্রণয়ন করে নারী অগ্রগতির পথকে আরও সুগম এবং সুতুঙ্গ করে তোলা।