১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

মধ্য আফ্রিকার গৃহযুদ্ধে জাদুটোনা!


মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র রক্তস্নাত। সেখানে মুসলমান ও খ্রীস্টান এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই চলছে। সেই লড়াই থেকে ব্যাপক হত্যাকা- হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তা গণহত্যায় রূপ লাভ করছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই গণহত্যায় জাদুটোনারও একটা ভূমিকা বা অবদান আছে।

গত বছর এলাকার নিয়ন্ত্রণ দখলের জন্য খ্রীস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে দারুণ লড়াই হয়। এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার জন্য হন্যে হয়ে ওঠে। ফলে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। উত্তরে রয়েছে মুসলমানরা এবং দক্ষিণে খ্রীস্টান। রাজধানী ব্যাঙ্গুইর অধিকাংশ এলাকা ইতোমধ্যে মুসলমানশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ বা পার্থক্য এই গৃহযুদ্ধের কারণ নয়। এর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা। এক সময় শাদ ও ফ্রান্সের সমর্থনপুষ্ট জেনারেল ফ্রাঁসোয়া বোজিজে সরকার কর্তৃক মুসলমান আধ্যুষিত এলাকাগুলোর প্রতি সুপরিকল্পিত অবহেলা থেকেই এই বঞ্চনার উৎপত্তি। ধর্মীয় বিভাজন দীর্ঘদিনের এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবিচারবোধকে বাড়িয়ে তুলেছে। তারপরও বলতে হয়, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের এই সংঘাতের গায়ে ধর্মীয় লেবাস চাপানো হলে সেটাকে ঠিকমতো বুঝতে পারা যাবে না।

অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই যে গত কয়েক মাসে দেশটিতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছানোর জন্য মধ্য আফ্রিকানদের মধ্যে ব্যাপক পরিসরে বিরাজমান জাদুটোনায় বিশ্বাসেরও একটা আংশিক ভূমিকা আছে। এই বিশ্বাস খ্রীস্টান-মুসলমান বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

দেশের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন সাম্বা-পাঞ্জা সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘জাদুটোনার ব্যাপারটা বাস্তব।’ মিজ সাম্বা-পাঞ্জা নিজে আইনজীবী। তিনি জানেন যে এই জাদুটোনা আইনবিরুদ্ধ। এর জন্য আদালতে বিচার আচার হয়। দেশের আইনজীবীদের কাছ থেকে জানতে পারা যায় যে যুদ্ধের আগে দেশের কোর্ট কাচারিগুলোয়া জাদুটোনা ও তুকতাকবিরোধী মামলার পাহাড় জমে উঠেছিল। দেশে যেসব অপরাধ অতি মাত্রায় সংঘটিত হয় তার মধ্যে জাদুটোনার স্থান সর্বশীর্ষে। দেশের নারী কয়েদীদের মধ্যে শতকরা ৬০ জনকে জাদুটোনার অপরাধের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মধ্য আফ্রিকার মানুষ ছাদ ধসে পড়া, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা প্রভৃতির মতো স্বাভাবিক অথচ বিরূপ, ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা পাওয়ার জন্য অন্যদের দিয়ে জাদুটোনা করিয়ে নেয়। যারা তা করে তারা মন্ত্রপাঠ করেও নানা ধরনের ভেলকির আশ্রয় নিয়ে সেসব ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়। যুদ্ধের সময় এই জাদুটোনার কদর বেড়ে যায়। এটা তখন আত্মরক্ষার শক্তি হিসেবে কাজে লাগে কিংবা লড়াইয়ে অধিকতর বল পাওয়া যায়।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমাঞ্চলে কেউ বিত্তবান হয়ে উঠলে অন্যদের মনে সুগভীর সন্দেহ জাগ্রত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ধনীদের সম্পর্কে এই ধারণা করা হয় যে, তারা অন্যদের আত্মাকে দাসত্ববন্ধনে আবদ্ধ করে এবং ওরা ঘুমিয়ে থাকলে তাদের শ্রম আত্মসাৎ করে মুনাফা করে। যারা এদের শিকার হয় তারা অসম্ভব ক্লান্তিবোধ করে বলে অভিযোগ করে থাকে। মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মেরুদ- এবং এই কারণে বিত্তবানও বটে। এদের বিরুদ্ধে মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চোরাকারবারসহ জাদুটোনার অভিযোগ আনা হয়ে থাকে।

এখন এই জাদুটোনা খ্রীস্টান মিলিশিয়াদের লড়াইয়ে প্রভাব ফেলেছে। এই মিলিশিয়ারা বালাকাবিরোধী নামে পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় বালাকা মানে ছুরি এবং ফরাসী ভাষায় একে-৪৭ রাইফেলের গুলি। এই দুই অস্ত্র তাদের যাতে কোন ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য মিলিশিয়ারা নানা আচার অনুষ্ঠান করছে, মন্ত্রের ‘ব্যবহার’সহ কবচ ধারণ করছে। শিকড়-বাকর, কাগজের টুকরো বা সুতোয় ভরা চামড়া বা কাপড়ের থলের এসব কবচ তারা গলায় ঝুলিয়ে রাখছে। গ্রিস-গ্রিস নামে কথিত এ কবচ ধারণ করলে লড়াইয়ে কোন ক্ষতি হবে না বলে তাদের বিশ্বাস। অবশ্য কারোর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে, কী চুরি লুটপাট করলে কিংবা অবৈধ যৌনকর্ম করলে মন্ত্রের ‘ক্ষমতা’ ও কবচের জাদুকরি ক্ষমতা নাকি হারিয়ে যায়।

চলমান ডেস্ক

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস