জনসেবা করাই যাদের কাজ, তারাই যদি হয়ে ওঠে গণদুর্ভোগের কারণ এবং তা বিবদমান গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জোরে, তবে তো মহাবিপত্তি ঘটবেই। ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ মন্ত্রজপে দু’পক্ষই নামে রণক্ষেত্রে। হাতাহাতি, লাঠালাঠি, পিটাপিটি থেকে সংঘর্ষের মাত্রা ক্রমইে বাড়ে। যাদের প্রভাব যেখানে, সেখানেই তারা যানবাহনের সারি ফেলে সড়ক প্রতিবন্ধকতার মহড়া দিয়ে প্রমাণ করেছে তাদের রুখবে সাধ্য কার। কী ফুরফুরে স্বাধীনতা তাদের। ইচ্ছে হয় পরিবহন চলাচল বন্ধ করে, যানবাহন ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে নিজস্ব শক্তিমত্তা প্রদর্শন করছেন। আর হাজার হাজার দূর পাল্লারসহ রাজধানীর যাত্রীরা দুর্ভোগ কাকে বলে টের পেয়েছে হাড়ে মজ্জায়। বিশেষ করে এই পবিত্র রমজান মাসে রোজাদার যাত্রীরা গরমে কাহিল প্রায়। শিশুদের কান্না অপেক্ষার ১১ ঘণ্টাও কেটেছে। কিন্তু শক্তিধররা গো ধরে বসে আছে। তাদের ইউনিয়নের কার্যালয়টির মালিকানা কার, তা নির্ধারণে। রণ মূর্তিতে হামলা চালিয়ে বীরত্ব জাহিরের প্রচেষ্টা; এমনকি যাত্রীদের দুর্ভোগ দেখেও নির্বিকার, নিস্পৃহ ও নিরুত্তাপ। নির্লজ্জ ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল দু’পক্ষ।
আপাত রণবিরতি। কিন্তু আবার যে কোন সময় কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে পরস্পরের প্রতি আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাশাপাশি পরিবহন চলাচল রুখে দিতে পারে। রুখবে তাদের কে? এই যে দিন কয়েক আগে বলা নাই কওয়া নেই, পূর্ব ঘোষণা নেই, সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের দুটি সংগঠন, যাদের প্ষ্ঠৃপোষকরা এবং দুই দলের পক্ষের লোকেরাই দাবি করে আসছে কার্যালয়টি তাদের। স্বপক্ষে কাগজপত্রও হাজির করছে। এমপির নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন দাবি করছে দীর্ঘদিন থেকে খাদ্য ভবনের পূর্বকোণে টয়েনবি সার্কুলার রোডে জনতা ভবনের নিচতলাটি সংগঠনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি তার তত্ত্বাবধানে ঢাকা জেলা শ্রমিক ইউনিয়ন নামে নবগঠিত সংগঠন ওই কার্যালয় দখল করে, ভাংচুর চালায়। এই দখল নিয়ে দুটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা যুদ্ধংদেহী হয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়াও চালায়। ফ্লাইওভারে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। আরও দুটি রাস্তাও যানবাহন দিয়ে অবরোধ করে রাখে। ফলে যানচলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে। এ ভবনটি সামরিক জান্তা শাসক ১৯৭৮ সালে জাতীয় জনতা পার্টির নামে দলের সভাপতি কর্নেল (অব) ওসমানীকে বরাদ্দ দিয়েছিল। ওসমানীর মৃত্যুর পর তার দল না থাকলেও ভবনটি সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে বাড়িটি দখল রেখেছে। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং নবগঠিত ঢাকা শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে সমঝোতার পথ খুঁজছেন পুলিশ। অথচ এই পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রীদের এই রমজান মাসেও জিম্মি করে নিজেদের অনৈতিক স্বার্থ হাসিলের যে পন্থা বেছে নিয়েছে তা দুঃখজনক।
এই আধিপত্যের লড়াইয়ের নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি। একই কারণে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল দখলকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের দুটি অংশ সংঘর্ষ ও অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ আপাতত শান্ত করেছে। কিন্তু কার্যালয়টি যাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে, তাতে পরিস্থিতি অপর পক্ষ নির্বিকার থাকবে, তা নয়। বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী অবস্থা হবে। পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্য তথা চাঁদাবাজি, জনগণকে জিম্মি করা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। জনসেবার কাজটি সুষ্ঠুভাবে করতে হবে এটিই প্রত্যাশা।

