সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির তেমন উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা এখন প্রতিদিনের দুঃসংবাদ। কোথাও মুখোমুখি দুটি গাড়ির মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। কোথাও ব্রিজ ভেঙ্গে বাস খালে বা নদীতে পড়ছে। কোথাও বা ওভারটেক করতে গিয়ে কিংবা প্রতিযোগিতা করতে করতে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফল অভিন্নÑ মানুষের আহত কিংবা নিহত হওয়া। ‘বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি : বাস্তবতা ও প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছিল তার ভেতর রয়েছে : দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ৫ হাজার ১৬২ জনের মৃত্যু ঘটছে। এর মধ্যে ঘটনাস্থলেই মারা যাচ্ছেন ৩ হাজার ১৬৭ জন। দেশের নয়টি জাতীয় মহাসড়কের ৫৭ কিলোমিটারের মধ্যেই ৯৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। এসব মহাসড়কে ব্ল্যাক-স্পট রয়েছে ২০৮টি। এসব স্পটে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে এর ৩৮ শতাংশই বাসের কারণে। ৬৪ জেলার মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনার মূল কারণ বেপরোয়া গাড়ি চালানো।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে গবেষণাপত্রে যেসব তথ্য উঠে আসে এর কোনটিকেই উপেক্ষা করা যায় না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সড়কের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নেয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা। এই যে সেদিন মাদারীপুর সদরের সমাদ্দার এলাকায় সেতুর রেলিং ভেঙ্গে খালে বাস পড়ে এত মূল্যবান প্রাণ ঝরে গেল, তার দায়ভার কে নেবে? এ দুর্ঘটনায় সবার আগে সম্ভবত চালকেরই মৃত্যু হয়েছে। কোন চালকই চান না তার ভুলে বা গাফিলতিতে কোন দুর্ঘটনা ঘটুক, একটাও প্রাণ যাক। কিন্তু চালক কতটা যোগ্য, তাকে নিয়মনীতি মেনে চালকের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে কিনা সেটাও অনেক বড় ব্যাপার। একই সঙ্গে গাড়ির ফিটনেসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে খাল-নদী-নালার অভাব নেই। তার ওপর দিয়ে পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ব্রিজ-কালভার্ট করতে হয়েছে। এসব ব্রিজ ও কালভার্ট কি নিয়মিতভাবে তদারকি করা হয়? মনিটরিং ছাড়া আমরা এক্ষেত্রে ভাল কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না। মনিটরিংয়েই ধরা পড়বে কোন্ সেতু কতটা বিপন্ন, সেখানে কী মেরামত করতে হবে, তার রেলিং যথেষ্ট ঝুঁকিমুক্তভাবে নির্মিত কিনা। আমাদের যানবাহনের সংখ্যার তুলনায় রাস্তাঘাট অপ্রতুল। তাই নতুন নতুন সড়ক-মহাসড়ক তৈরি জরুরী। যানবাহনে অডিও-সিডি বা গান চালানো ও চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা দরকার হয়ে পড়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য রাস্তার গতিরোধকও কম দায়ী নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে গতিরোধক স্থাপনই যুক্তিযুক্ত। কারও ব্যক্তিগত ক্ষমতা জাহির করতে অযথা যেন গতিরোধক দেয়া না হয়। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গতিরোধকের গুরুত্ব কমে যাবে। দুর্ঘটনারোধে সড়ক-মহাসড়কের পাশে স্থাপিত হাটবাজার উচ্ছেদ করাও জরুরী।
অনেক পরিবহন শ্রমিককেই অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাতে হয়, যা তার ধৈর্য ও সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাদের স্বাস্থ্য গাড়ি চালানোর উপযোগী থাকে না। শ্রমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াও শ্রমিকদের চিন্তাগ্রস্ত করে। চালকদের ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিকল্প নেই। মোড়গুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করা চাই। সড়কে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন।

