জঙ্গীবাদী সন্ত্রাস নিয়ে সারা বিশ্বই আতঙ্কিত। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে জঙ্গী তৎপরতা ও সন্ত্রাস দমনে সাফল্য দেখিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনাগুলোও জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। কয়েকদিন আগে পাবনার অনুকূলচন্দ্র সেবাশ্রমের সেবায়েত, ঝিনাইদহের পুরোহিত, চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতুকে হত্যা করা হয়। এর কয়েকদিন আগে নাটোরে খুন হয়েছেন খ্রীস্টান মুদি দোকানদার সুনীল গোমেজ, টাঙ্গাইলে নিখিল দর্জি, রাঙ্গামাটিতে বৌদ্ধ যাজক, পঞ্চগড়ে জগেশ্বর রায় নামে এক পুরোহিত। টার্গেট কিলিংয়ের শিকার প্রায় সবাই নিরীহ সাধারণ নাগরিক। এক সময় মুক্তচিন্তার লেখক-বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মীদের নাম হিটলিস্ট আকারে প্রকাশ করে তাদের হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে, তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সাধারণত এ ঘটনাগুলো ঘটার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করেছে। এমনিতেই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা ধরনের অপতৎপরতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, অপরাধী গ্রেফতার, বন্দুকযুদ্ধ, সর্বশেষ উত্তরায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্যই বলা চলে। কিন্তু এই বাহিনীর সাফল্য নিয়ে সমালোচনায় নেমেছে একটি মহল। তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতো সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। পরিকল্পিত কোন সন্ত্রাস ও জঙ্গী তৎপরতা দমনে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায় না। সেই ক্ষেত্রে খ-িত অংশের সমালোচনা হতে পারে কিন্তু ঢালাওভাবে সাফল্য অস্বীকার করা, সমালোচনা করা প্রত্যাশিত নয়।
একথা ভুললে চলবে না সাঁড়াশি অভিযান চালু হলে জঙ্গীবাদের সমর্থক, সন্ত্রাসের মদদদাতা রাজনৈতিক দল ও তাদের অনুসারীরা জঙ্গীদের রক্ষার জন্য কণ্ঠস্বর চড়া করেছে। বিএনপি-জামায়াত তাদের অনুগামী জঙ্গীদের গ্রেফতারে ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্র মনোভাব প্রকাশ করেছে। তাদের সঙ্গে জঙ্গীমনা কতিপয় এনজিও বিরূপ মন্তব্য করে বেশ হৈচৈ তুলেছে। অথচ জঙ্গীরা যখন নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে কিংবা পেট্রোলবোমায় মানুষ মারা হচ্ছে, তখন নীরবতা পালন করে জঙ্গীদের কর্মকা-কেই সমর্থন করে আসছে। জঙ্গীদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের উদ্দেশ্যের মিল যখন পাওয়া যায় তখন জঙ্গী নির্মূলে তাদের চেঁচামেচি স্বাভাবিক। অভিযানে সাধারণ মানুষ গ্রেফতার হওয়ার খবর না পাওয়া গেলেও জঙ্গী সমর্থকরা এ নিয়ে যেসব ভাষ্য দিচ্ছে তা অগ্রহণযোগ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানকে বিতর্কিত করার জন্য বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের অনুসারী গণমাধ্যমগুলো যে মাতম তুলছে তা জঙ্গীদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে বলে অনেকেই ভাবছেন। জঙ্গীদের ডালপালা ছেঁটে দেয়ার কাজটি যখন চলছে, তখন এর বিরোধিতার নামে মিথ্যাচার চালিয়ে যে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা দ্রুত মিলিয়ে যাবেই। আমরা চাই, অভিযান অব্যাহত থাক, উপড়ে ফেলা হোক জঙ্গী ও তাদের গডফাদারদের ঘাঁটি। জনগণ এক্ষেত্রে পুলিশের সহায়ক অবশ্য। এখন দরকার সমন্বিত কর্মসূচী।
একথা সত্য যে, মানুষের মধ্য থেকে ভয়ের সংস্কৃতি সরে গিয়ে সাহসের বাতাবরণ জুড়ছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সবাই সন্ত্রাসী, তা নয়। অন্যান্য অপরাধের অপরাধীও রয়েছে। ষোলো কোটি মানুষের দেশে কয়েক হাজার গ্রেফতার হওয়া নেহায়ত বেশি, এটা বলা যায় না। বিভিন্ন মামলার আসামি, অবৈধ অস্ত্রধারী, ছিনতাইকারী, মাদকাসক্তরাও গ্রেফতার হয়েছে এই সময়ে। সন্দেহভাজন জঙ্গীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি এই অভিযানে জঙ্গীদের নানাবিধ তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এটাও অভিযানের বড় সাফল্য। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িত ও পলাতকদের আটক করাও অভিযানের অন্যতম সাফল্য বলা যায়। জঙ্গী নির্মূলের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পারা কৃতিত্বের বৈকি। সন্দেহভাজন অপরাধী যারা, তাদের ধরার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রটিও প্রসারিত হয়েছে। তাই ঢালাওভাবে এই সাফল্যকে অস্বীকার করা মানে জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বন করা। এটা কোন সচেতন নাগরিকের কাছে প্রত্যাশিত হতে পারে না।

