ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

কল-কারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত

রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সঙ্কট রান্নাবান্নায় দুর্ভোগ

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ২৩:৩১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২; আপডেট: ২৩:৩৮, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সঙ্কট রান্নাবান্নায় দুর্ভোগ

গ্যাস সঙ্কট

বিশ্বজুড়ে মহামারী করোনার প্রকোপ কমতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এতে ধেয়ে আসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট। এ সঙ্কট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে জ্বালানি ও খাদ্য খাতে। সারা বিশ্বে হু হু করে বাড়তে থাকে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের দাম। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। উর্ধমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনা বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে চাহিদার তুলনায় পাওয়া যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। এতে করে রাজধানীসহ সারাদেশে তৈরি হয়েছে তীব্র গ্যাস সঙ্কট।

আবাসিক খাতসহ পেট্রোলপাম্প, শিল্প-কারখানাগুলোতে মিলছে না কাক্সিক্ষত গ্যাসের চাপ। ফলে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন এমনকি বাসা-বাড়িতে রান্নাবান্নার কাজেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এর সমাধান হিসেবে কাতার থেকে আরও অধিক পরিমাণে এলএনজি আমদানির ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দেশটি কোনভাবেই ২০২৫ সালের আগে তা দিতে পারবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। ফলে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা, প্রাইভেটকারগুলোর গ্যাস নিতে দীর্ঘ লাইন। রাজধানীর মগবাজারে আনুদীপ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে প্রায় দেড় ঘণ্টা যাবত অপেক্ষা করে থাকা ব্যবসায়ী জাফর মিয়া বলেন, হলি ফ্যামিলির সামনে থেকে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে শেষ পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনের গেটে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু এখন শুনতে পাচ্ছি গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ নেই। কি আর করা। অন্য জায়গায় যেতে হবে। একই অবস্থা রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার প্রায় সব ফিলিং স্টেশনেরও।

সিএনজি অটোরিক্সা চালক রহিম উদ্দিন ক্ষোভ নিয়ে বলেন, আগে দিনে একবার গ্যাস নিলে সারা দিন চলে যেত। এখন দিনে দুই বার গ্যাস নিয়েও সিলিন্ডার ভরছে না। ঢাকা শহরে সিএনজি চালিয়ে প্রতিদিন দুই বার লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিলে তো আমাদের চলবে না। এখন তো সারা দিন চলে যায় গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে, গাড়িতে যাত্রী কখন ওঠাব। একই অভিযোগ করেন রাজধানীর পরিবাগের মেঘনা পেট্রোলিয়ামের আওতাধীন ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা অটোরিক্সা চালক আকবার আলী।

তিনি বলেন, সিএনজি অটোরিক্সার সিলিন্ডারগুলো ৩০০ সাড়ে ৩০০ টাকার গ্যাসেই ভরে যায়। কিন্তু গত কয়েকদিন যাবত ১২০-১৫০ টাকার বেশি গ্যাস নেয়া যাচ্ছে না। এখানকার কর্মীরা আমাদের বলে গ্যাসের চাপ কম। আগে যেখানে একবার গ্যাস নিলে সারাদিন চলে যেত। এখন সেখানে দিনে দু-তিনবার নিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, রাজধানীর প্রগতি সরণি এলাকার চারটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে গ্যাসের ন্যূনতম চাপ রয়েছে এসটি পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে। বাকিগুলোতে গ্যাস বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
এসটি পাওয়ারের ঠিক উল্টো পাশে অবস্থিত মক্কা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনটিতে গ্যাসের চাপ নেই। তাই গ্যাস নিতে আসা গাড়ির চালকরা ফিরে যাচ্ছেন।
শুধু চালকরাই নয়, গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিড়ম্বনায় আছেন রিফুয়েলিং কর্তৃপক্ষও। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যাস না থাকার কারণে একদিকে যেমন তাদের বিক্রি কমেছে, তেমনি স্টেশনে প্রতিদিন সৃষ্টি হতে থাকা লম্বা লাইন নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জরুরী গ্যাস নিয়ন্ত্রণ শাখার (দক্ষিণ) ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোঃ শবিউল আওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয়ভাবে আমাদের গ্যাস সরবরাহ কম, এটা এখন জাতীয় সমস্যা। এ সমস্যা কবে নাগাদ সমাধান হবে আমরা জানি না। সমস্যার সমাধান উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, আমাদের সরবরাহের বিষয়টি নির্ভর করে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির ওপর। কিন্তু গত আড়াই মাস ধরে দেশে এলএনজি আমদানি বন্ধ রয়েছে। যার ফলে এই সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।
একই অবস্থা শিল্প-কারখানাগুলোতেও। গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। নিজের কারখানায় গ্যাসের প্রেসার প্রায়দিনই জিরো থাকে জানিয়ে বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান জনকণ্ঠকে বলেন, আমার কারখানাটা পুরনো হওয়ায় মেশিনগুলোতে ফার্নিশ অয়েলের ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। জরুরী কাজ করি ফার্নিশ অয়েল কিনে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে? ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ৬৪টি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ ও পোশাক উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে একটি জরিপ করেছে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। এ তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, জরিপে উঠে এসেছে, গত দুই মাসে কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। গড়ে ১ দশমিক ৮ পিএসআই করে গ্যাস পেয়েছে তারা। এতে কারখানার উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় গ্যাস সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, আশুলিয়ার কারখানাগুলোতেও। এসব এলাকার কোন কোন কারখানায় উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়েছে জানিয়ে বিজিএমইএএর সাবেক সভাপতি মোঃ সিদ্দিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। এর প্রভাবে আমাদের কাছে প্রায় সব এলাকা থেকেই প্রতিদিন খবর আসে গ্যাসের চাপ নেই। কেউ কেউ তো মেশিনই চালু করতে পারে না। এ রকম চলতে থাকলে কারখানার কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি সরকার এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজছে। যদি পাওয়া যায় তা হলে আশা করছি খুব শীঘ্রই এ সঙ্কট কেটে যাবে।
কিন্তু খুব শীঘ্রই সঙ্কট কাটার কোন আদালমত পাওয়া যায়নি জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সঙ্কটকালীন সময়ের আগে সরবরাহ করা হতো ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৭৫ থেকে ২৮০ মিলিয়ন গ্যাস। যার মধ্যে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছে দেশীয় উৎস থেকে আর আমদানি করা এলএনজি যোগ হচ্ছে ৪৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

যা কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ভিত্তিতে আসছে। চাহিদার ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আগে স্পট মার্কেট থেকে কেনা হলেও বর্তমানে উচ্চমূল্যের কারণে কেনা বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে চাহিদার চাইতে অন্তত ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সঙ্কট হচ্ছে প্রতিদিন। ২০২৫ সালের আগে এই সঙ্কট কাটার কোন সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
তবে সঙ্কট মোকাবেলার উপায় খুঁজতে সম্প্রতি বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কাতার সফর করে এসেছেন। একই কারণে গত বুধবার পেট্রোবাংলাসহ জ্বালানি বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তারা যান কাতারে। বর্তমানে কাতার থেকে বার্ষিক ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। ২০১৭ সাল থেকে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করে আসছে বাংলাদেশ।

কাতারের রাশ লাফান লিক্যুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ওই চুক্তির আওতায় বার্ষিক ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। সাইড লেটার চুক্তির মাধ্যমে এর অতিরিক্ত হিসেবে বছরে আরও ১ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির জন্য বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এর আগে প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কাতার তাতে সাড়া দেয়নি। তা সত্ত্বেও সম্প্রতি কাতারের দোহায় দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠকে (এফওসি) বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কাতারকে আরও বেশি পরিমাণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু কাতার জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে না।
এর পর পরই জ্বালানি বিভাগের উর্ধতন পর্যায়ের একটি দল দুবাই সফর বলে জানা গেছে। ওই সফর থেকে কোন সুখবর আসতে পারে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও আপাতত সেপ্টেম্বরের বাকিটা এবং অক্টোবরের একটা বড় সময়ও সঙ্কট চলমান থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, বর্তমানে দেশটি থেকে মাসে ৫টি করে এলএনজি কার্গো আসছে। যার ইউনিট প্রতি গ্যাসের দাম পরছে ১৫ মার্কিন ডলার। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ১০ ডলারের কম। কিন্তু খোলা বাজারে এই দাম ৬০ ডলারের বেশি। তাই দাম না কমা পর্যন্ত খোলা বাজার থেকে কোন গ্যাস কেনা হচ্ছে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার বছরে আমাদের ৪০টি এলএনজিবাহী কার্গো দিচ্ছে।

ওমান দিচ্ছে ১৬টি এলএনজিবাহী কার্গো। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানির বাজারের যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তার ফল সব দেশকেই ভুগতে হচ্ছে। আমরাও ভুগছি। আশা করছি শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। তখন গ্যাস দিয়ে যে বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হতো সেখানে উৎপাদন কমিয়ে অন্যান্য খাতে ব্যবহার বাড়ানো যাবে।
কিন্তু ফার্নেস অয়েল এবং ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়া বিদ্যুত উৎপাদনে বা সার কারখানায় গ্যাসের যে ব্যবহার হতো তাও কমানো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে সারের দাম চড়া, আমদানিতে বাড়তি খরচ লাগছে। তাই দেশী সার কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে। জানা যায়, দেশের গ্যাসের মোট চাহিদার ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদনেই ব্যবহৃত হয় ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সার কারখানা লাগে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু এর বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে বিদ্যুতে মাত্র ১০৬ মিলিয়ন এবং সারে ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

আবাসিকে ঠিক কত পরিমাণ গ্যাসের সঙ্কট হচ্ছে এ বিষয়ে ঠিক করে বলতে না পারলেও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, চলমান সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত এলএনজির জন্য কাতারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে তাদের এলএনজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের অতিরিক্ত এলএনজি দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে কাতার। এর পরও আমরা কাতার থেকে অতিরিক্ত এলএনজি আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।