ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

বিদায় শংকর

সৌরভ দুর্জয়

প্রকাশিত: ১৯:২৬, ৫ মার্চ ২০২৬

বিদায় শংকর

‘কত অজানারে’ কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অজানার এক অসীম পরিধি। তা যদি হয় আইন আদালত সম্পর্কে। বিশেষ করে কোলকাতা হাইকোর্ট সম্পর্কে তাহলে তো কোন কথাই নাই। যে অজানার নেই কোন সীমা পরিসীমা। এই অধরা উপাখ্যানের হৃদয়গ্রাহী এক সাহিত্য রূপ দিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত কথা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র শংকর তাঁর কত অজানা রে বইতে। ১৯৫৪ সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় কত অজানারে। ১৯৫৫ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। যখন চলে গেছে ইংরেজ। বিদায় নিয়েছে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ। অবসান হয়েছে কোম্পানির শাসন। গত হয়েছে ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। থেমে গেছে টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ। বদলে গেছে দিন। পাল্টে গেছে সমাজ। তবে রয়ে গেছে ইংরেজদের তৈরি আইন : পেনালকোড, ক্রিমিনাল প্রসিডিওর, সিভিল প্রসিডিওর, এভিডেন্স অ্যাক্টসহ অসংখ্য আইন। আরো রয়ে গেছে তাঁদের তৈরি কোলকাতা, বোম্বে, এলাহাবাদ, মাদ্রাজ হাইকোর্ট। এই হাইকোর্টের লাল দালানের ইটের সাথে, এজলাসের টেবিলে, চেম্বারের কক্ষে, টাইপ রাইটারের খট খট শব্দের সাথে কিংবা আদালতের করিডোরে মিশে ছিল কত বিচারক, কত ব্যারিস্টার, কত আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী, স্টেনোগ্রাফার, বাদী- বিবাদী, ফরিয়াদি আসামির দুঃখ-কষ্ট, হাসি কান্না, জয় পরাজয়ের কাহিনি। তার অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে। তবুও কিছু রয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়। যার কিছু পৌরাণিক অক্ষরে রয়ে গেছে সাহিত্যের উদ্যানে। যেখানে পুষ্পিত হয়েছে স্মৃতির গোলাপ রূপে। গন্ধ ছড়াচ্ছে সুগন্ধি আগর হয়ে। কোলকাতা হাইকোর্টের স্মৃতির উদ্যানে তেমনি ‘কত অজানারে’ নামে একটি সুগন্ধি গোলাপ বৃক্ষ রোপণ করে গেছেন কোলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল সাহেবের স্টেনোগ্রাফার কালজয়ী কথা সাহিত্যিক শংকর। বাস্তব ঘটনার সাহিত্যমাখা স্মৃতি কথা। ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বার ওয়েল সাহেবের পেশার প্রতি আন্তরিকতা, কাজের দক্ষতা, ক্লায়েন্টের প্রতি মমতা, পেশাগত লেখাপড়াসহ এক মানবিক ব্যারিস্টারের কালো গাউনের নীচে কোমল পাঁপড়ির সমন্বয়ে প্রস্ফুটিত গোলাপটাই হলো কতো অজানারে। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা পেলাল কোড, এভিডেন্স অ্যাক্ট পড়াতে গেলে শংকরের কত অজানারে বইয়ের রেফারেন্স দেন। ছাত্র ছাত্রীদের বইটা পড়তে বলেন। আইনের ছাত্র হিসেবে আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গাজী আব্দুল বারী স্যারের নির্দেশনায় খুব মন দিয়ে পড়েছি ‘কত অজানারে’। এখন প্র্যাকটিসে সহযোগিতা নেই কত অজানারে বইয়ের। ভেসে ওঠে ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল সাহেবর মুখ। কানে আসে শংকরের টাইপ রাইটারের কর্কশ অথচ ছান্দসিক খট খট শব্দ। শুনানি, সাক্ষী, জেরা, আর্গুমেন্ট, রায়, রিভিউ, আপিল, রিভিশনের প্রতিচ্ছবি। কারাগারের কষ্ট। যাবজ্জীবন সাজা। ফাঁসির আসামির কান্না, জল্লাদের দৃঢ়তাসহ কত অজানা উপাখ্যান। বিশেষ করে এক হত্যা মামলার শুনানির তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল ঘটনাস্থল বাকের গঞ্জে গিয়েছিলেন স্টিমারযোগে এবং সেখান থেকে পাল্কিতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার স্থানে। এবং এক খৃষ্টান পরিবারকে নিশ্চিত ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। যা আইনের ছাত্র ছাত্রীদের বইটি পড়তে বেশি আগ্রহী করে তোলে। একাডেমিক নাম মণি শংকর মুখোপাধ্যায়।লেখক নাম শংকর। জন্ম ৭ ডিসেম্বর ১৯৩৩ সালে যশোর জেলার বনগাঁয়। বাবা হরিনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। বনগাঁ থেকে কোলকাতা, পরে হাওড়ায় থিতু হন। বাবার মৃত্যুতে শংকর ভিষণ রকম ধাক্কা খান। শুরু করেন ফেরিওয়ালার কাজ। কখনো টাইপ রাইটার ক্লিনার। জুট ব্রোকারের কেরানি। সাথে সাথে চলতে থাকে লেখাপড়া। ডিস্টিংশনসহ বি,এ পাশ করে, শুরু করেন শিক্ষকতা। শিক্ষকতা নিয়ে কত অজানারে বইতে তিনি লিখেছেন : এর আগে তো রাস্তায় ছোট খাটো জিনিস ফেরি করেছি। কিন্তু ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ মন্ত্র মনে প্রাণে জপ করেও জীবন ধারণ যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল তখন বাণিজ্য দেবীর ভাগিনী দেবী সরস্বতী অপ্রত্যাশিত ভাবে কৃপা বর্ষণ করলেন। অবশ্য আমার পক্ষে খুরেট রোডের বিবেকানন্দ স্কুলে মাস্টারী লাভ করা কোন দিনই সম্ভব হতো না, যদি না ঐ স্কুলের শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক আমার ‘বাজেট সংকট’ সম্বন্ধে কিছুটা ওয়াকিবহাল হতেন। মাস্টার মানে অংক ইংরেজি। মাস্টার সমাজে অংক ইংরেজির শিক্ষকরা কুলিন। বাকী সবাই ইতরজনা সর্ব শাস্ত্রবিদ। আমি শেষোক্ত দলে। সুতরাং ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, বাংলা, সংস্কৃতি কোনটা পড়াতে বাকি রাখিনি। সেখান থেকে সোজা চলে এসেছি রাম কৃষ্ণপুর ঘাট এবং হোরমিলার কোম্পানির ‘অম্বা’ ষ্টীমারে নদী পেরিয়ে হাইকোর্টে। ‘লেখক হিসেবে শংকর কালজয়ী। তাঁর চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধতা, জনঅরণ্য পেয়েছে পাঠক প্রিয়তা। যা নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। তাঁর অনেক বইয়ের শতাধিক সংস্করণ বের হয়েছে। তাঁর বই রুশ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো : স্থানীয় সময়, সুবর্ণ সময়, চরণ ছুঁয়ে যাই (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), বাংলার মেয়ে, ঘারের মধ্যে ঘর, এপার বাংলা ওপার বাংলা, এক দুই তিন ইত্যাদি। ২০১৬ সালে তিনি উত্তর বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট সম্মানে ভূষিত হন। ২০২০ সালে একা একা একাশি বইয়ের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।
শংকরের প্রথম বই কত অজানারে উৎসর্গ করেছিলেন শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলকে। এই ব্যারিস্টারের উৎসে শংকর লেখক হয়ে ওঠেন। শংকরের লেখক জীবনে কোলকাতা হাইকোর্ট এক অন্য রকম প্ররণা দিয়েছিল। তাই বুঝি কোলকাতা হাই কোর্ট সম্পর্কে শংকর লিখেছেন : ‘হাইকোর্টের চুড়োটার দিকে তাকালাম। বর্শার ফলকের মতো তীক্ষè যেন মেঘের আবরণ ভেদ করে আকাশের সঙ্গে মিলিয়ে যেতে চাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে বিভূতিদা হেসে বলেছিলেন : বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখানো একেই বলে ; রোজ এখানে আসতে হবে, চুড়ো কেন ওই বাড়িটার ভিতরের অনেক কিছুই ক্রমশঃ দেখতে ও জানতে পারবে। এখন চেম্বারে চলো।’ শংকর নামের যে মানুষটা সংগ্রাম করেছেন দারিদ্র্যের সাথে। করেছেন পণ্য ফেরি। হয়েছেন ব্রোকার হাউসের কেরানি। স্কুলের শিক্ষক। ডিগ্রি পরীক্ষায় পেয়েছেন ডিস্টিংকশন নম্বর । হয়েছেন বড় লেখক। এই লেখকের মূলভিত্তি ছিলো কোলকাতা হাইকোর্ট। উৎসাহদাতা ছিলেন ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। তাঁর প্রথম বই ছিল ‘কত অজানারে’। সেই মানুষটি গত ২০ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আপন ঠিকানায়। রেখে গেছেন তাঁর কালজয়ী লেখা। শ্রদ্ধা হে! শংকর। বিদায়! শংকর। অমর! অজানারে! 

প্যানেল/মো.

×