ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৯ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

টেকসই উন্নয়নের জন্য ‘সার্কুলার ইকোনমি’

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: ০০:৫০, ২৬ মার্চ ২০২৩

টেকসই উন্নয়নের জন্য ‘সার্কুলার ইকোনমি’

প্রণোদনার ভিত্তিতে ও দক্ষতার সঙ্গে কাঁচামালের যথাযথ ব্যবহার

প্রণোদনার ভিত্তিতে ও দক্ষতার সঙ্গে কাঁচামালের যথাযথ ব্যবহার এবং সেই সঙ্গে বর্জ্য-উচ্ছিষ্ট, স্ক্র্যাপ, ঝুট, ফেলনা ইলেক্ট্রনিকস ইত্যাদি থেকে আবার নতুন পণ্য তৈরি করাকেই বলা হয় ‘সার্কুলার ইকোনমি’। এতে পরিবেশ সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া হয়। পণ্যের একবার ব্যবহার যেমন পরিবেশ উপযোগী নয়, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও তা কার্যকর নয়। সেজন্য উন্নত বিশ্ব সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পণ্য পুনর্ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যা ‘সার্কুলার ইকোনমি’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য অর্জনে সার্কুলার ইকোনমিতে জোর দিতে হবে। শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত ব্যবসা সম্মেলনে বক্তারা এমন অভিমত দিয়েছেন। দেশের অর্থনীতি প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। এর আকার এখন ট্রিলিয়ন তথা এক লাখ কোটি ডলার হওয়ার পথে রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে ‘সার্কুলার ইকোনমি’ দেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটি অর্থনৈতিকভাবে যেমন লাভজনক খাত, তেমনি পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও কার্যকর উপায় হতে পারে।

সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা-দুটিই রয়েছে। উদ্যোক্তারা কাজের নিশ্চয়তা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও নীতির ধারাবাহিকতা চান। এসবই আমাদের আছে। সার্কুলার ইকোনমির জন্য সরকারের পূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতিগত সহায়তা রয়েছে। 
সার্কুলার ইকোনমির বাজারের জন্য আমাদের দেশের বাইরে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। আমাদের শুধু বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। দেশে সার্কুলার ইকোনমির ধারণা নতুন কিছু নয়। আমাদের সাধারণ অভ্যাস ও সংস্কৃতির মধ্যেই এটি রয়েছে। পোশাক, বই, মোড়ক থেকে শুরু করে কৃষিজাত উচ্ছিষ্ট, খাদ্যবর্জ্য, প্লাস্টিক, কাচ, গার্মেন্টস ঝুটসহ বিভিন্ন পণ্য এই সার্কুলার অর্থনীতির অংশ হতে পারে। সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। এটি নিয়ে বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে আন্ত-সমন্বয় নেই। বিনিয়োগও অপর্যাপ্ত।

এ ছাড়া ভোক্তাদেরও সচেতনতার অভাব রয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে নীতি-সমর্থন ও অর্থসহায়তা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্ব সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সার্কুলার ইকোনমির মাধ্যমে পণ্য পুনর্ব্যবহারের কাজটি করছে। বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক সভা-সেমিনার হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। 
অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহার বাড়ছে। পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু, বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। শঙ্কা তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের। আগামী প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বর্জ্য ও দূষণ রোধ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতির বিকাশ অত্যন্ত জরুরি।

ক্রম পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে শিল্পের ভূমিকার বিষয়টিকেও নজরে রাখতে হচ্ছে। পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এর ফলে কার্বন নিঃসরণ কমে, দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায় পরিবেশ। বৃত্তাকার অর্থনৈতিক মডেলে উৎপাদন ও ভোগের মধ্য সমন্বয় সাধন হয়।

পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এর ফলে কার্বন নিঃসরণ কমে, দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায় পরিবেশ। তাই টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের কার্যকর হাতিয়ার হচ্ছে সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি। বিশ্বে এখন কেউ বর্জ্যকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে না। এক শিল্পের বর্জ্য অন্য শিল্পের জন্য উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০৩০ সালে এসডিজি অর্জন, ২০৩১ সাল নাগাদ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এ পরিণত হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে আমাদের। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আর সেজন্য সার্কুলার ইকোনমির বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। যে হারে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার হচ্ছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে মূল্যবান বিভিন্ন খনিজের মজুত শেষ হয়ে যাবে। তবে পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।

ওই বিবেচনা থেকেই এখন সার্কুলার ইকোনমির দিকে এগোনো দরকার। দেশে নির্মাণ শিল্প, টেক্সটাইল, মোটর গাড়ি, লজিস্টিকস, কৃষি, আসবাব, তেল ও গ্যাস, নবায়ণযোগ্য জ্বালানি খাতকে সার্কুলার ইকোনমিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার মাত্র ৭ থেকে ৮ কেজি। যুক্তরাষ্ট্রে এ পরিমাণ ১৩০ কেজি। পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্যকে পুনরায় সম্পদে রূপান্তর করছে দেশটি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রয়োগের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। ইউরোপীয় কমিশন এরই মধ্যে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে। এছাড়াও চীন, ব্রাজিল, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও জাপান তাদের অর্থনীতিকে সার্কুলার ইকোনমিতে রূপান্তরের জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশেরও একই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে সে জন্য উৎসে বর্জ্যরে ধরন অনুযায়ী আলাদা করে সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে আলাদা কোনো ডাম্পিং জোন নেই, যেখানে  বর্জ্যকে আলাদা করা সম্ভব। এ জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি।

সার্কুলার ইকোনমি নিয়ে কাজ করতে মন্ত্রণালয়ে একটি আলাদা সেল গঠন করতে হবে। এই সেল সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংগঠনের সঙ্গে একত্রে কাজ করবে। সার্কুলার ইকোনমি বিকাশের জন্য অপরিহার্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। এই খাতের আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পের মর্যাদা পাওয়া উচিত। বর্তমানে ৪০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। বাকি ৬০ শতাংশকেও এর আওতায় আনতে হবে।

এজন্য প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ওয়ার্কিং পেপার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। সার্কুলার ইকোনমির কার্যক্রমকে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ ক্ষেত্রে চমৎকার গতির সঞ্চার হবে আশা করা যায়। কেননা টেকসই অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশকেও বৃত্তাকার অর্থনীতির পথে যেতে হবে। 

×