ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

শিশুখাদ্য সেরেলাক-নিডোতে ক্ষতিকর মাত্রায় চিনি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২২:৪৮, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

শিশুখাদ্য সেরেলাক-নিডোতে ক্ষতিকর মাত্রায় চিনি

শিশুখাদ্য সেরেলাক-নিডোতে ক্ষতিকর মাত্রায় চিনি

বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকারী সুইস কোম্পানি নেসলের বাংলাদেশে শিশুখাদ্য হিসেবে সর্বাধিক বিক্রিত দুটি পণ্য সেরেলাক এবং নিডোতে উচ্চ-মাত্রার চিনির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যদিও যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড এবং অন্যান্য উন্নত দেশে নেসলের বিক্রি করা একই শিশুখাদ্যে কোনও ধরনের বাড়তি চিনি যুক্ত করা হয় না। শিশুদের খাবারে চিনি যুক্ত না করার বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ রয়েছে।

কারণ শিশুখাদ্যে চিনি যুক্ত করা হলে তা স্থূলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী কয়েকটি রোগের কারণ হতে পারে। সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা পাবলিক আই ও ইন্টারন্যাশনাল বেবি ফুড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের নেসলের শিশুখাদ্য সেরেলাক ও নিডো নিয়ে করা গবেষণায় মিলেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাদের যৌথ গবেষণায় বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিক্রি করা নেসলের এই দুই শিশুখাদ্যে উচ্চ-মাত্রায় চিনি যুক্ত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পাবলিক আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্য কোম্পানি নেসলে বেশ কয়েকটি দেশে শিশুদের জন্য তৈরি করা দুধ ও সিরিয়াল পণ্যগুলোতে বাড়তি চিনি ও মধু যুক্ত করে। যা স্থূলতা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক নীতিমালার লঙ্ঘন।
নেসলের শিশুখাদ্যে বাড়তি চিনি যুক্ত করার আইন লঙ্ঘনের এই ঘটনা কেবল এশিয়ান, আফ্রিকান এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে পাওয়া গেছে। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। নেসলের শিশুখাদ্য পণ্যের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। পাবলিক আই বলছে, নেসলে সুইজারল্যান্ডে বাজারজাত করা তাদের পণ্য সেরেলাকে বাড়তি কোনও চিনি ব্যবহার করে না।

কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোতে সেরেলাকে বাড়তি চিনি যুক্ত করে তারা। মধ্য-আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে নিডোর আক্রমণাত্মক প্রচার চালায় নেসলে। ওই অঞ্চলে এক বছর বা তার বেশি বয়সী বাচ্চাদের জন্য বাজারজাত করা ফর্মুলায় একটি শিশুকে সাধারণভাবে একবার যে পরিমাণ খাবার দেওয়া হয় তাতে চিনির পরিমাণ অনেক বেশি।
বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, সেনেগাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকাতেও নিডো ব্যাপক জনপ্রিয়। এসব দেশেও এক থেকে তিন বছর বয়সী ছোট বাচ্চাদের জন্য তৈরি করা নেসলের সব পণ্যে বাড়তি চিনি রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে নেসলের ৯টি খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হয়। আর এসব পণ্যের প্রত্যেকটিতেই বাড়তি চিনি রয়েছে। নেসলের এসব পণ্য থেকে একজন শিশুকে একবার যে পরিমাণ খাবার পরিবেশন করা হয়, তাতে প্রায় ৩ দশমিক ৩ গ্রাম বাড়তি চিনি থাকে। এ বিষয়ে নেসলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এক প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক, কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে আমাদের শিশু খাদ্যশস্য পণ্যগুলি প্রাথমিক শৈশবকালের জন্য প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, আয়রন ইত্যাদি পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাগুলির যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়।

আমরা কখনই আমাদের পণ্যের পুষ্টির মানের সাথে আপস করি না এবং কখনই আপস করব না। আমরা ক্রমাগত আমাদের বিস্তৃত গ্লোবাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ককে আমাদের পণ্যের পুষ্টির প্রোফাইল বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করি। কমপ্লায়েন্স হল নেসলে বাংলাদেশের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য এবং আমরা এর সাথে কখনই আপস করব না। আমরা এটাও নিশ্চিত করি যে বাংলাদেশে উৎপাদিত আমাদের পণ্যগুলি ঈঙউঊঢ মান (ডঐঙ এবং ঋঅঙ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি কমিশন) এবং যুক্ত শর্করাসহ সমস্ত পুষ্টির প্রয়োজনীয়তার সাথে সম্পর্কিত স্থানীয় স্পেসিফিকেশন (প্রয়োজন অনুসারে) সম্পূর্ণ এবং কঠোরভাবে মেনে চলছে।

যোগ করা শর্করা হ্রাস নেসলে বাংলাদেশের জন্য একটি অগ্রাধিকার। গত ৫ বছরে, আমরা বৈকল্পিকের উপর নির্ভর করে ইতিমধ্যেই ৪০% পর্যন্ত যোগ করা শর্করা কমিয়েছি। আমরা নিয়মিত আমাদের পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করি এবং পুষ্টি, গুণমান, নিরাপত্তা এবং স্বাদের সাথে আপস না করে যোগ করা শর্করার মাত্রা আরও কমাতে আমাদের পণ্যগুলিকে উদ্ভাবন এবং সংস্কার করা চালিয়ে যাচ্ছি। নেসলে বাংলাদেশ আমাদের ভোক্তাদের সর্বোত্তম পুষ্টি সরবরাহ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা আমরা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে করে আসছি এবং সবসময় আমাদের পণ্যগুলিতে পুষ্টি, গুণমান এবং নিরাপত্তার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখব।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশের পণ্যের মান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক রিয়াজুল হক বলেন, অন্য দেশের পণ্যের মানের সঙ্গে আমাদের স্ট্যান্ডার্ড এক নাও হতে পারে। তিনি বলেন, সেরেলাক ও নিডো যদি দেশের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী মান ঠিক রেখে পণ্য তৈরি করে তাহলে ঠিক আছে। এটা নিয়ে বিএসটিআইয়ের কিছু করার নেই। তবে যেহেতু একটি প্রতিবেদনে ক্ষতির বিষয়টি এসেছে তাই আমরা দেখব। যদি কোনো ক্ষতিকারক কিছু থাকে, তাহলে আমরা এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।

×