বুধবার ৬ মাঘ ১৪২৮, ১৯ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

চাঁদ নিয়ে সত্য বৈ মিথ্যা বলব না

  • রাহাত খান

আমার ষাট-একষট্টি বছরের জীবনে অনেকগুলো চাঁদ উঠেছে। অনেক চাঁদ অস্ত গিয়েছে। সব মিলিয়ে তারা কয়টি চাঁদ ছিল, কত অম্ল-মধুর মুহূর্তের চাঁদ ছিল, কি আমার পাওয়া হয়েছিল, কি কি সব খোয়া গেছে তা আমি জানি না। আমি বলতে পারব না। মনে রাখা দরকার চাঁদ ও চাঁদে পাওয়া মানুষ দুটি আলাদা কিংডম। সেখানে নানা জন্ম-মৃত্যুর মুহূর্তে আকাশের শূন্যতা ছাড়া কেউ সাক্ষী থাকে না।

আমি এক নয়, বহু চাঁদের জাতক। আমার চাঁদগুলো তাদের বর্ণ, শোভা, উচ্চতা, কৌণিক দূরত্ব ও হিতাহিত বিচারে একক সময় একেক রকম ছিল। প্রতিটি চাঁদ আলাদা। তারা নিজের নিজের মতো। একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো যায় না। দেখেশুনে বরাবর আমার সন্দেহ হয়েছে। পৃথিবীর নিজস্ব চাঁদ একটাই কিনা। অনেকগুলো কিনা। অনেক রকমের কিনা।

শিশু পাঠ্য বইতে যেমন আছে : এক চন্দ্র দুই নেত্র। নীল আর্মস্ট্রং তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে সেই একটা মাত্র চাঁদে দুনিয়ার সব দেশের নাম লেখা পতাকা পুঁতে এসেছিলেন। বেশি দিন আগে তো নয়। ষাট দশকের শেষের দিকে। এসব বিজ্ঞান ও ভূগোল আমি খুব পড়েছি। সম্মানও করি বটে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে আমার নিজের দেখাটাও তো অস্বীকার করতে পারি না। দুই নেত্র ঠিক আছে, এক চন্দ্র নয়। আমার দেখা বাস্তব ও কল্পনার সঙ্গে এই রাইম একদমই মেলে না। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কত চাঁদ টাচ্ করেছি। কত অমলিন চাঁদের সুধা পান করেছি।

আকাশের না হয় একটা চাঁদে কোন রকমে চলে যায়। মানুষের কি চলে? এক দমই নয়। নো, নেভার আমার স্থির ধারণা মানুষের কাজে অকাজে, স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে বহু চাঁদ আনাগোনা করে। তাদের স্বাদ ও গন্ধ আলাদা। হাসি ও দীর্ঘশ্বাস ভিন্ন। যা হোক, এ নিয়ে কোন বিতর্কে যেতে আমি নারাজ। চাঁদ হচ্ছে আকাশের এবং মানুষের নিতান্তই প্রাইভেট এ্যাফেয়ার। বাংলা করলে দাঁড়ায় : একান্ত বিষয়। চাঁদ নিয়ে বিতর্কে জড়ানো মোস্ট আনওয়ান্টেড। কদাপি কাম্য নয়।

আরও একবার বলি, ষাট-একষট্টির জীবনে বহু চাঁদের উদয় দেখেছি। বহু চাঁদ নিভতে দেখেছি। চাঁদ কতভাবে যে মানুষকে এটাক করে। আমি দু’-একটা দুষ্ট প্রকৃতির চাঁদ’কে নিজের হাতে গলাটিপে মেরেছি। বাধ্য হয়ে এ কাজ আমাকে করতে হয়েছিল। দুষ্ট ও বিপজ্জনক প্রকৃতির চাঁদগুলো মানুষের থেকে বিশেষ করে চাঁদে পাওয়া মানুষের থেকে বেশি বেশি রক্তমাংস চায়। ফলে নিজে বাঁচার জন্য অনেক সময় এদের গলা টিপে ধরতে হয়। চাঁদ সব সময় মধুর হয় না। আকাশের ফোর্টি টু ফোর্টি ফাইভ চাঁদ হয় বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক।

এসব কথা থাক। চাঁদ দেখার দু’-একটা গল্প বরং বলি। চাঁদগুলো এবং গল্পগুলো যোগ কিংবা বিয়োগ করলে ফলাফল শূন্য হয়। এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয়। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য। চাঁদ+চাঁদ+চাঁদ+ চাঁদ+চাঁদ+চাঁদ ইত্যাদি ক্রমাগত করতে থাকলেও কোন লাভ নেই, ফলাফল শূন্য হবে। বিগ্ জিরো। এ রকম ফলাফল কেন হয় তা আমি জানি না। এর কি রহস্য, কি ভেদাভেদ তাও জানি না। অবশ্য চাঁদের সঙ্গে চাঁদের যোগফল শূন্য হলে তাতে আমার কি আসে যায়। আমি যে পৃথিবীর চাঁদে পাওয়া বিরল জনগোষ্ঠীর একজন, তাতেই সন্তুষ্ট। যার পরনাই আনন্দ পাই আমি শূন্যতার গর্ভে বিলীন হওয়া কোন কোন চাঁদের কথা ভেবে।

বহু বছর আগের কথা। ১৯৫১ সাল চলছিল। এক রাতে গ্রামের মোহনডাঙা মাঠের ঠিক দুই হাত ওপরের আকাশে একটু খুব প্রকাশ্য, খুব বেপরোয়া, খুব রঙিন চাঁদকে ভেসে বেড়াতে দেখেছিলাম আমি। তখন চৌদ্দ বছর বয়স আমার, চাঁদের সঙ্গে তেমন চেনাজানা হয়নি। চাঁদটা ভেসে ভেসে কখনও আমার চোখের ভেতর, কখনও আমার বুকের ভেতর চলে যাচ্ছিল।

অবাক সুন্দর ছিল সেটা। নির্জন মাঠ এবং আকাশে ভাসমান ষোলো কলার চাঁদ নিয়ে হেমন্তের অল্প শিশিরে ভেজা সেই রাতটা গভীরে গোপনে যেতে তৈরি হচ্ছিল। চাঁদেরই অকৃত্রিম গল্প-কাহিনী সেটা। সেই রাতের ঘটনা চাঁদই ঘটিয়েছিল। কোন সন্দেহ নেই। তবে সেটা বলার আগে ইরাদি ও দয়ানাথের কথা একটু বলা দরকার। বলা দরকার নিজের কথাও। এ ছাড়া আমাদের গ্রাম, সেই সময়টা ইত্যাদির কথা খানিকটা না বললেই চলে না।

ভাটি এলাকায় আমাদের সোহাগপুর গ্রামটা যেন দুনিয়ার তাবত লোকালয় থেকে ছিন্ন হয়ে পড়া একটা গ্রাম ছিল। বিল-হাওড় ও মাঠের মাঝখানে একলা পড়ে থাকা। প্রচুর গাছপালা ছিল। এর মধ্যে আট শ’ নয় শ’ লোকের একটা বসতি। গ্রামের দু’দিকে মাঠ। একদিকে নদী পুব তল্লাটে মাইলের পর মাইল বিছানো বিল-হাওড়। এটা ছিল আরেক জগত। বিল-হাওড়জুড়ে ছিল নানা রকমের জলজগাছ, উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম। জলে ভেসে বেড়ায় হাঁস। আকাশে ওড়ে পাখির ঝাঁক। হঠাৎ হঠাৎ নলখাগ্ড়ার আড়াল থেকে ডেকে ওঠে চিকন মসৃণ শরীরের কুঁড়া পাখি। বিলের পাড়ে কালো ভেজা মাটিতে পড়ে থাকে ঢেউয়ে আছড়ে পড়া শামুক-ঝিনুক। এখানে সেখানে সাপের গর্ত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাপের খোলস। হাওড়ের জল যেখানে গভীর, সেখানে একেকবার ভোঁস করে ভেসে ওঠে শুশুক। মাঠ ও জলপথ পাড়ি দিয়ে অন্য লোকালয়ে, বাজারে, গঞ্জে এবং মহকুমা শহরে যাওয়া যেত। আমরা আমাদের গ্রামকে খুব ভালবাসতাম।

আমরা মানে এই মুহূর্তে আমি ও দয়ানাথ। দয়ানাথের বাবা তল্লাটের বড় কৈবর্ত। বিল ইজারা নিয়ে মাছের ব্যবসা করে। কালো মিশমিশে গায়ের রং লোকটার, লোকে বলে টাকার কুমির। আমার বাবার ক্ষেতজমি আছে, চাষবাস করে ভালই চলে যায়। আমি ও দয়ানাথ দু’জনই মহকুমা শহরের হোস্টেলে থাকি। একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ি। আমাদের দু’জনের স্বাস্থ্যই একহারা, তবে দয়ানাথের চেহারায় বুটপালিশের মতো একটা চিকচিকে আভা আছে। স্কুলে তার রেজাল্টও আমার চেয়ে ভাল। সেবার হেমন্তে শীত, তত জেঁকে বসার আগেই ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম। গ্রামে আমার ও দয়ানাথের সময় কাটানোর সেরা জায়গা ছিল ইরাদিদের বাড়ি।

ইরাদির জন্য শহর থেকে আমি লাল ও সবুজ, দুই রঙের রেশমী ফিতা নিয়ে এসেছিলাম। দয়ানাথ এনেছিল এক প্যাকেট ভবের মজা বিস্কুট। সেই সঙ্গে সুন্দরপল চন্দরপলের আলতা। দু’জনই আমরা ইরাদির জিসিনগুলো লুকিয়ে এনেছিলাম। লোকে জানতে পারলে কি বলবে। ইরাদিকে জিনিসগুলো আমরা দিলাম লুকিয়ে। তখন আমরা তিনজন ছাড়া আশপাশে আর কেউ ছিল না।

ফিতা, বিস্কুট এবং আলতা শিশি পেয়ে ইরাদি খুব খুশি। জিনিসগগুলো নিয়ে চকিতে দ্যাখে আশপাশে কেউ আছে কিনা। তারপর শাড়ির আঁচলের তলায় লুকিয়ে ফেলে। এই মুহূর্তে ইরাদি খুব হাসি-খুশি। মাঝে মাঝে সে খুব দুঃখী হয়ে পড়ে। বিয়ে হয় না বলে মন খারাপ করে ফেলে হঠাৎ হঠাৎ।

প্রাইমারী স্কুলে ইরাদি আমার ও দয়ানাথের দু’ক্লাস ওপরে পড়ত। তবে একই ক্লাসে পর পর দু’বছর ছিল বলে ক্লাস ফোরে আমরা তাকে ধরে ফেলেছিলাম। বেশ বন্ধুত্ব হয়ে যায় তখন। ইরাদি বেশ ফর্সা, পেছনের দিকে টেনে চুলবাঁধা হাসি-খুশী সুন্দর মেয়ে। কেন যে তার বিয়ে হচ্ছিল না। অতবড় মেয়েকে স্কুলে রাখতে শিক্ষকরাও শেষে আর রাজি ছিল না। ফেল করে নয়, এমনি এমনি আরও দু’এক বছর স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল ইরাদির। তার বাপেরও আপত্তি ছিল না। কিন্তু শিক্ষকরা বেঁকে বসায় শেষে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় ইরাদির।

ইরাদি স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমি ও দয়ানাথ আবিষ্কার করি যে স্কুল জায়গাটা তত আর ভাল লাগছে না। দয়ানাথ একদিন আমাকে বলে ল যাই। তখন থেকে ইরাদির বাড়িতে যেতে শুরু করি আমরা। এরপর গ্রামের স্কুলে আমাদের পড়ার পাঠ শেষ। ভর্তি হই একতিরিশ মাইল দূরে শহরের স্কুলে। থাকার ব্যবস্থা হোস্টেলে।

শহরে ইরাদি ছিল না। তবে গল্পের বই ছিল। বন্ধুবান্ধব ছিল। সিনেমা দেখা, ঘুরে বেড়ানো, খেলাধুলা, হৈ চৈ ইত্যাদি ছিল। শহরে আমাদের সময়টা মন্দ কাটত না। মাঝে মাঝে আমার ও দয়ানাথের মনে পড়ে যেত ইরাদির কথা। মনটা খারাপ হয়ে যেত। ছুটি ঘনিয়ে এলে দিন যেন আর ফুরাতে চাইত না। ইরাদিকে দেখার জন্য আকুল হয়ে থাকতাম আমি ও দয়ানাথ।

ছুটিতে বাড়ি এসে নাওয়া, খাওয়া ও রাতের ঘুমটুকু ছাড়া বেশিরভাগ সময় ইরাদির আশপাশে ঘুর ঘুর করে কিংবা তার সঙ্গে খেলা করে আমাদের কাটত। মনীন্দ্রনাথের বাড়ির পেছনে বিশাল এক বাঁশঝাঁড়। একটু দূরে একটা ডোবার মতো আছে। চারদিকে গাছপালার ঘেরাও। ইরাদি, দয়ানাথ ও আমি মিলে এই ঘেরাওয়ের ভেতর গোল্লাছুট খেলি। চোর চোর খেলি। রাম সীতা, লক্ষণের খেলাটা খেলি। পাড়ার যাত্রাগান দেখে পালাটা আমাদের তিনজনেরই মুখস্থ। আমার মাঝে মাঝে রাম হতে ইচ্ছে করত ইরাদির পাশে। কিন্তু দয়া কিছুতেই তার পাঠ ছাড়তে রাজি না। ইরাদিরও কি ইচ্ছা আমাকে কোনকালে তার পাশে রাম হতে না দেয়া? কি জানি, হাবভাবে কিছুই বুঝতে পারি না। তবে লক্ষণের পাঠ করেও বেশ সন্তুষ্ট ছিলাম আমি। আর কিছু না হোক, ইরাদির পাশে পাশে তো থাকা যায়।

ইরাদি যে সব সময় আমাদের সঙ্গে খেলায় থাকে তা নয়। হঠাৎ হঠাৎ সে বাড়ির ভেতর চলে যায়। কাজ শেষ করে হাসিমুখে আবার ফিরে আসে। দয়ানাথ বলে; প্রিয়ে, কি হেতু, মলিন তব বদন। কহ মোরে সত্য করি। করও না গোপন কিছু বৃথা সঙ্কোচে।

নিমিষে পতিব্রতা সীতা হয়ে যায় ইরাদি। দয়ানাথের গল লগ্ন হয়ে ধরা গলায় বলতে থাকে’ কি কহিব নাথ, অহর্নিশ জ্বলি তব প্রেমে। দু’দ- বিরহ সে না পারে সহিতে। তব সনে প্রার্থনা এই, যেথা যাও এ দাসীরে নিয়ে যাও সঙ্গে।

রাম-সীমা পালায় লক্ষণের রোলও একেবারে ছোট না। অনেকগুলো মিল আছে তার। অনেকগুলো প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণ।

দু’-একটা সিন আছে যেখানে বীর রসের অবতারণা করে লক্ষণ স্টেজ কাঁপিয়ে দেয়। সীতার সঙ্গেও তার বেশ কয়েকটা সিন আছে। তবে মনীন্দ্রনাথের বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়ের আড়ালে তিনজন মিলে গোটা পালার অভিনয় তো আর হয় না। সেটা সম্ভবও নয়। রাম-সীতা পালার কিছু কিছু জায়গার সংলাপই আমার তিনজন মিলে আওড়াই। আর কিছু না, মজা করা। তিনজনের খেলাটা চালিয়ে যাওয়া।

এবার আমরা অপেক্ষা করছিলাম চাঁদের চতুর্দশীয়র জন্য। আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম। এই রাতে বেরিয়ে কোথায় কোথায় যাব। এ একটা রাত, মিস করলে বছরটাই বরবাদ। শহরে ফিরে এই রাতের এ্যাডভেঞ্চার নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কত গল্প করি। বছর তিন ধরে এই রাতটা আমি, ইরাদি ও দয়ানাথ মিলে খুবই যাপন করে আসছি।

জমিদার বাড়ির বাগানেই আগে যাই আমরা। বিরাট বাগান। ফলফলারি অনেক পাওয়া যায়। ফলের মধ্যে পাকা কলা, গোলাপজাম, কামরাঙা, শশা এবং কুলবরই। বাগানে এসবই প্রচুর আছে, শুধু পেড়ে আনতে পারলে হয়। ফুলের মধ্যে জবা ও গাঁদা তো আছেই। এ ছাড়া গোলাপ, চাঁপা, করবী, বেলী। আমাদের প্রথম টার্গেট জমিদার বাড়ির বাগান। এরপর যখন যে বাড়ি যে বাগান পাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার শেষ হয়। সন্ধ্যার প্রথমক্ষণ থেকেই আকাশে ঝলমল করে ফুটবে অনিন্দসুন্দর চতুর্দশীর চাঁদ। পূর্ণিমার রাত ওবটে। সন্ধ্যা থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা চলছিল। ঝামেলা শেষ হতে চায় না। বাড়ির লোকজনের খাওয়া দাওয়ার পালা শেষ হয় তো পান-তামাক সেবন শুরু। পান-তামাক সেবন করতে করতে গল্প-গুজব। শেষ আর হয় না। বাড়ির বাংলা ঘরে ঠাঁই নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম কখন বাড়ির শেষ বাতিটা নেভে। ঝামেলা আর শেষ হতে চায় না। যাহোক শেষ পর্যন্ত অপেক্ষার পালা সাঙ্গ হয়। এক সময় সব ঘরে রাশব্দ বেবাক থেমে যায়। নিঝুম নেমে আসে। পা টিপে টিপে বাংলা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি।

সারা গ্রামের মধ্যে জনশূন্য এবং নিঝুম হয়ে পড়েছিল। বাতাসে একটু একটু হিম। আকাশে চতুর্দশীর পূর্ণাভ চাঁদ জ্বলছে। জ্যোৎস্নার বান ডেকে যাচ্ছে চারদিকে। বড় বড় গাছপালা ও পোড়ো আঙিনা পার হয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল পুরো এলাকাটা যেন বা এক রহস্যপুরী। আকাশের চাঁদ ছিল রাতের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

আজ রাতে এমনটা হওয়ারই কথা। আজ পূর্ণিমা। নষ্ট চন্দ্রের রাত। আজ রাতভর চাঁদ তার যত নষ্টামি চালিয়ে যাবে। এটা শাস্ত্রের কথা। সেই মতো সন্ধ্যা হতে না হতেই চাঁদের ডিউটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। আকাশে দেদীপ্যমান হয়ে সে নিচের মাঠ, জলাশয়, বনজঙ্গল, লোকালয়, দুনিয়া-সংসার সব নিঃশব্দে চৌকি দিয়ে যাচ্ছিল। গাছপালা ও বাড়ি-ঘরের ভৌতিক ছায়া মাড়িয়ে কোন রকমে মনীন্দ্র মুদির বাড়ি পৌঁছে যাই।

সবারই বাঁশঝাড়ের নিচে পৌঁছার কথা। তাকাই চারদিকে জ্যোৎস্নার জালিকাটা আলো ছিল। এ ছাড়া নৈঃশব্দ ও ছায়া দেখতে পাই। কণ্ঠ রোধ করা একটা নিঝুম সবদিকে ওৎ পেতে বসে আছে। কিছু করার নেই। দয়ানাথ ও ইরাদির জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

হঠাৎ বেশ কিছুটা দূরে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে পরিচিত কণ্ঠের কু’শুনতে পাই। মনে হলো ইরাদি। ভয়ডর অনেকটা চলে যায়। খুঁজতে শুরু করে দিই। শেষে ঘন বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে ওদের খুঁজে বের করা হয়। ইরাদির সঙ্গে দয়ানাথও ছিল। তার মানে ওরা আগেই চলে এসেছিল।

ওদের খুঁজে বার করতেই ভাল একটা চোর চোর খেলা হয়ে গেল। ইরাদির পরনে খাটো ডোরা কাটা শাড়ি। পেছন থেকে দয়ানাথের গলা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিল। হাসছিল। অন্ধকারে দুটি ছায়াশরীর এক হয়ে যেন মিশে গিয়েছিল। ইরাদি হাসছিল, দয়ানাথ কথা বলছিল না। সে চুপচাপ। চোর চোর খেলায় তার যেন ইরাদির সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকার ইচ্ছে ছিল।

বেরিয়ে রাস্তায় নামি। দূরে কয়েকটা ছায়ামূর্তি দেখতে পাই। এক পলক দেখা দিয়েই আড়ালে মিলিয়ে গেল। আমরা মোটেও অবাক হই না। আজ রাতে গ্রামের ফল ফলারির গাছ তছনছ করতে অনেকে নামবে। আমরা সবার আগে পৌঁছুতে চাই। প্রথমে জমিদার বাড়ির বাগান। পরে সুবিধা মতন যে বাগানই পাওয়া যায়।

ইরাদি তার বাড়ি থেকে খানদুই বেতের ঝুড়ি নিয়ে এসেছিল। প্ল্যানমাফিক আমরা প্রথমে গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে দেয়ালঘেরা প্রাচীন জমিদার বাড়িতে যাই। পেছনে প্রাচীরের একটা ভাঙ্গা অংশ দিয়ে ভেতরে ঢোকার রাস্তা আমাদের জানা ছিল। বাড়িটা প্রকা- এবং বাগানটা পুরো দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক ছড়িয়ে আছে বলে পাহারাদারের চোখ এড়ানো সহজ ছিল। কিন্তু ভেতরে ঢুকে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। বাগান তছনছ করার আগেই হয়ে গেছে। আমরা যা পেলাম তা সামান্য কিছু।

তবে ঘণ্টাদুই ঘুরে রোজগার একেবারে খারাপ হলো না। একটা ঝুড়ির পুরো এবং আরেকটা অর্ধেক ভর্তি করা গেল ঠিকই। এগুলোর সদ্ব্যবহার কোথায় বসে হতে পারে তা নিয়ে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়। তবে খাওয়ার দিকে ইরাদির খুব আগ্রহ নেই। সে বলে; লও আমরা মাঠে যাই।

মাঠ তো গ্রামের শেষ সীমানায়, মাঠে কেন? আমি ও দয়ানাথ বুঝতে চেষ্টা করি। হঠাৎ দয়ানাথের কি হয়, একটা ঝুড়ি পিঠে ঝুলিয়ে আচমকা দৌড় লাগায় মাঠের দিকে। ব্যস, বোঝার আর কিছু নেই। আমি এবং ইরাদিও ছুটতে শুরু করি। দয়ানাথ দৌড়াচ্ছিল আর হো হো করে খামোখাই চেঁচাচ্ছিল। আমি ও ইরাদি হাসছিলাম। আর দৌড়াচ্ছিলাম। এতক্ষণে যেন নষ্টচন্দ্রের রাতটা গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠল। মোহনডাঙার মাঠে পৌঁছে যেতে বেশি দেরি হয় না। পৌঁছে দেখি, মাঠের ঠিক দু’হাত ওপরে চাঁদটা। এত সুন্দর চাঁদ, চাঁদের এমন সুন্দর হাসি ও লাস্য এর আগে কখনও দেখিনি।

আমরা তিনজন স্থির দাঁড়িয়ে। মাথা তুলে মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে আছি চাঁদের দিকে। এত বড় এবং জীবন্ত চাঁদ এর আগে আমি দেখিনি। চাঁদের চারপাশে একটা সাদা বলয় তৈরি হয়েছে। মাঝখানে রাজাধিরাজের মতো অবস্থান নিয়েছে চাঁদ। নিয়ে গোটা দিগ¦লয়ে জ্যোৎস্না কণার সোনালি বৃষ্টিপাত ঝরিয়ে চলেছে।

এক সময় তাকিয়ে দেখি ইরাদি তখনও পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। কখন যেন ফিতেবাঁধা, চুলের রশি খুলে দিয়েছিল। অজস্র কালো চুল তার মুখের পাশে, কাঁধে ও পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুটা বদলে দিয়েছে মুখের গড়ন। একটু অন্যরকম মনে হচ্ছিল ইরাদিকে। যেন অচেনা এক যুবতী। চাঁদ যেন নতুন করে তাকে তৈরি করছে।

দয়ানাথও তাকিয়ে আছে চাঁদে পাওয়া মোহাবিষ্ট ইরাদির দিকে। আমার মতো সেও খানিকটা বিস্মিত বা ভীত। কি হয়েছে ইরাদির? সে গিয়ে ইরাদির হাত ধরে। ঝাঁকুনি দিয়ে বলে; ইরাদি। এ্যাই ইরা। দয়ানাথ এবং আমি এক ক্লাসে পড়ার সুবাদে ইরাদিকে বহুবার ইরা ডাকতে চেয়েছি। বিশেষত দয়ানাথ, সে মাঝে মাঝে ইরাদিকে স্পষ্ট ইরা বলেই ডেকে বসে। আমি লজ্জা সঙ্কোচে ভুগি, তত পারি না। ইরাদিরও শক্ত মানা। ইরা বলা চলবে না। ইরাদি বলতে হবে। এভাবে ইরা-ইরাদি করে আমার ও দয়ানাথের চলে আসছে।

দয়ানাথের ডাক শুনে এবং দুই বাহুর ঝাঁকুনি খেয়ে ইরাদি যেন সম্বিত ফিরে পায়। সে তাকায় আমাদের দিকে। পরে চাঁদের দিকে। বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। ক্লান্ত, অবসন্ন মনে হচ্ছিল তাকে। বসে পড়ে নিচে ঘাসের ওপর।

আমি ও দয়ানাথ বসে পড়ি ইরাদির দু’পাশে। দু’জনই আমরা ইরাদির কাছে জানতে চাই তার কি হয়েছে। তার শরীর খারাপ লাগছে কিনা। আমরা বার বার জানতে চাই। অজ্ঞান হয়ে পড়া লোককে যেভাবে জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য ডাকা হয়, সেভাবে তাকে আমরা ডাকতে থাকি। ইরাদি হাঁটুর ওপর থুঁতনি রেখে বসে আছে। তাকাচ্ছে না আমাদের দিকে। এক আধবার বড়জোর বলে উঠছে : কি।

বোঝা যায় একটা কিছু হয়েছে ইরাদির। আমি ও দয়ানাথ চোখ চাওয়াওয়ি করি। জিনে আচর করেছে নাকি ইরাদিকে? গ্রামে বিয়ে না হওয়া সোমও-মেয়ের জিনে ধরা এ রকম ঘটনা এর আগে দু’-একবার দেখেছি আমরা। সে রকমই কিছু ইরাদির হলো কিনা ভেবে আমি ও দয়ানাথ চিন্তিত হয়ে পড়ি। শুধু দুশ্চিন্তা নয়, ভয়ও হচ্ছিল ভেতরে ভেতর। মোহনডাঙার মাঠে ভূত-পেতœীর হাতে পড়া বিচিত্র নয়। গ্রামের কত লোকই শহরগঞ্জ হাটবাজার থেকে ফেরার পথে মোহনডাঙার মাঠে রাতে বিরাতে এ রকম বিপদে পড়েছে। কেউ কেউ অজ্ঞান হয়েও পড়েছে। চল্লিশ একচল্লিশ বছর আগে এই মাঠে মঙ্গলবারে অমাবস্যার রাতে ভূতের খপ্পড়ে পড়ে মারাও গিয়েছিল একজন।

ঠিক এ সময় খুব স্বাভাবিক গলায় হেসে ওঠে ইরাদি। বলে : এ্যাই, তোরা ভয় পাইছস! বলে হাসতে থাকে। দু’হাত দিয়ে আমাদের দু’জনকে জড়িয়ে ধরে।

ইরাদির স্বাভাবিক গলায় কথা বলতে দেখে আমার ও দয়ানাথের ডরভয় অনেকটা কেটে যায়। এতক্ষণ কি একটা ঘোরে যেন আমরা ছিলাম। চাঁদটা ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল আমাদের। আজ নষ্টচন্দ্রের রাত। কোন সন্দেহ নেই চাঁদের শয়তানি চলছে।

আমাদের একটু আগের হৈচৈ করা মেজাজটা ফিরে আসে। তিনজন আমরা গোল হয়ে বসি। একটু একটু হিম পড়েছে। আদিগন্ত খোলা মাঠ হঠাৎ হঠাৎ শিস দিয়ে উঠছে চাঁদের দিকে তাকিয়ে। বাতাস, চাঁদ এবং আমরা ছাড়া মাঝরাত্তিরে আর কেউ জেগে নেই। চাঁদ আমাদের দিকে তাকিয়ে, আমরা তাকিয়ে চাঁদের দিকে। আজ নষ্টচন্দ্রের রাতে কি একটা গল্প যেন তৈরি হওয়ার কথা।

দয়ানাথ ফলমূলের ঝুড়িটা মাঝখানে রাখে। গল্প করা সেই সঙ্গে ফলের সদ্ব্যবহার করা চলতে থাকে। এক সময় তাকিয়ে দেখি মাথার ওপর থেকে চাঁদটা সরে গেছে। বেশ কিছুটা দূরে সরে গিয়ে মাঠের সামান্য ওপরে চুপ করে বসে আছে জ্বলন্ত গোলার মতো। মনে হলো চাঁদটা কান পেতে আমাদের তিন বন্ধুর গল্প শুনছে।

কথাটা ইরাদিই হাসতে হাসতে বলে। আমি ও দয়ানাথ তখন চাঁদের দিকে ড্যামকেয়ার ভাব করে তাকাই। হারজিতের খেলায় প্রতিপক্ষের দিকে যেভাবে তাকায়। দয়ানাথ উঠে দাঁড়িয়ে কলার শূন্য খোসা চাঁদের দিকে ছুড়ে মারে। বলে ঘোড়ার ডিমটা খাও। আমি ও ইরাদি হাসতে থাকি।

কলার শূন্য খোসা ছুড়ে মারায় চাঁদ কি একটু বিরক্ত? নাকি রেগে গেছে? আমরা তাকিয়ে দেখি চাঁদের রংটা যেন আচ্ছন্নের মতো হয়ে উঠেছে। একটু বেশি রক্তিমাভ। শিশির ও কুয়াশায় জড়ানো। বাতাস এ সময় তীক্ষè শিস দিয়ে ওঠে। মাঠজুড়ে চাঁদের মিহি আলো। জায়গায় জায়গায় স্তব্ধ হয়ে আছে মাটিতে ঢলে পড়া কুয়াশার মেঘ।

এ সবই নিঃশব্দে চলছিল। আর আমরা মোহনডাঙা মাঠের অনেকখানি ভেতরে বসে নষ্টচন্দ্রের রাতে কুহক ও শয়তানিতে পাওয়া চাঁদটাকে দেখছিলাম। নষ্টচন্দ্রের রাতে বাড়ির লোকেরা তেমন নজরদারি-খবরদারি করে না, এই যা রক্ষা। মহাফুর্তি বইছে আমাদের তিনজনের মনে।

ইরাদি হঠাৎ বলে : আয়, চোর চোর খেলি।

দয়ানাথ রাজি। আমিও তবে দয়ানাথ একটা শর্তজুড়ে দেয়। চোর চোর খেলায় আগেও দয়ানাথ শর্তটা জুড়ে দিত। ইরাদি প্রত্যেকবার না, না করেছে আর হেসেছে। এবারেও দয়ানাথের কথা শুনে হাসছিল। তবে হ্যাঁ, না কিছুই বলে না। আমরা ধরে নিই ইরাদি রাজি। খেলায় যে ছুঁতে পারবে, সে ইরাদিকে চুমো খাবে।

আমরা চোর চোর খেলি ইরাদির বাড়ির পেছনে, গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের বেষ্টনীর ভেতরে। অল্প একটু জায়গার ভেতরে। সেই তুলনায় মোহনডাঙার মাঠ কত বড়। কত বিশাল। মোহনডাঙা মাঠে আমাদের তিন মূর্তির চোর চোর খেলাটা কেমন দাঁড়াবে? তাছাড়া সবটাই তো খোলা মাঠ, চোর চোর খেলায় এখানে পালাবার জায়গা কোথায়?

দয়ানাথ কি ভাবছিল জানি না। আমি এ রকম ভাবছিলাম তবে ভাবনাচিন্তা করে তো লাভ নেই। ইরাদি যে মুহূর্তে ছুটে পালিয়েছে, সেই মুহূর্তে খেলাটা শুরু হয়ে গেছে। এখন আমার আর দয়ানাথের ভাগ্য পরীক্ষা। কে ইরাবতীর কাছ থেকে জয়ের পুরস্কারটা পায়।

মাইলের পর মাইল বিস্তার মোহনডাঙা মাঠের। এই মাঠ হেঁটে পার হতে শক্ত জোয়ান হাঁটুরেরও ঝাড়া পাঁচ ছ’ঘণ্টা লাগে। এমন বিশাল চৌহদ্দির ভেতর কেমন দাঁড়াবে আমাদের তিনজনের চোর চোর খেলা। খোলা মাঠে ইরাদি লুকোবেই বা কোথায়?

ইরাদি আগেই ছুটে পালিয়েছে। এতক্ষণে দূরত্ব এবং কুয়াশার জাল তাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলেছে। আমি ও দয়ানাথ নিজেদের মধ্যে একটু শলাপরামর্শ করে নিই। ফলের ঝুড়ি দুটি রেখে দিই চিহ্ন হিসেবে। এখানে তিনজন আমরা খেলা শেষে ফিরে আসব। এখান থেকে গ্রামের পথটা চিনে নিতে কোন অসুবিধা নেই।

ইরাদি যেদিকে ছুটে গিয়েছিল, সেদিকে ডানে ও বাঁয়ে দুই সমান্তরালে দৌড় লাগাই আমি ও দয়ানাথ। আমার বিশ্বাস হয়ে যায় আজ আমিই ইরাদিকে আগে খুঁজে পাব। চুমুটা নিশ্চিত আজ আমার কপালে।

বাতাসে অল্প অল্প হিম। দৌড়াতে ভাল লাগছিল বেশ। দৌড়াতে দৌড়াতে মনে হচ্ছিল দৌড়াচ্ছি যেন চাঁদটা ধরার জন্য। আমার করার কিছু ছিল না, চাঁদটা নিজেই আমার সামনে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে। যত তার দিকে দৌড়াই তত সে সরে যায়। কুয়াশার জটাজালে মাঝে মাঝে হারিয়েও যাচ্ছিল সে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে দৌড়ের পর আমি বুঝতে পারলাম চাঁদটা খামোখা আমাকে দিয়ে খাঁটিয়ে নিচ্ছে। আমি তো দৌড়ে গিয়ে ইরাবতীকে ধরতে চাই। চাঁদটা কেন সামনে সামনে আসছে? কেন ধোঁকা দিচ্ছে। খামোখা খাঁটিয়ে নিচ্ছে!

দৌড়াতে দৌড়াতে আর পারি না। হাঁপিয়ে যাই। খোলা মাঠে কোথায় লুকিয়েছে ইরাদি? দয়ানাথই বা কোথায়? ভাবতে গিয়ে একটা ভয় চিনচিন করে ওঠে বুকের ভেতর। মনে হয় এই মাঝরাত্তিরে মোহনডাঙার মাঠে কেন দৌড়াচ্ছি আমরা? আমি, দয়ানাথ আর ইরাবতী? কে দৌড়াচ্ছে আমাদের দিকে? তাকাতেই চোখে পড়ে সামনে ফর্সা, সুন্দর, চকচকে চাঁদটাকে। মনে হলো মিটি মিটি হাসছে। বুঝতে পারি চাঁদেরই শয়তানি। মাঝরাত্তিরে মোহনডাঙার মাঠে তুকতাক করে ডেকে এনে সেই-ই আমাদের দিয়ে অন্তহীন এই দৌড় করাচ্ছে। কোন সন্দেহ নেই।

বুকের ভেতর চিনচিন করা ভয়। সেই সঙ্গে এও ভাবছিলাম, ভয় পেলে চলবে না, বুকে সাহস বাঁধতে হবে, রাতের মধ্যে ফিরে যেতে হবে গ্রামে। সাহস আনার জন্যই আকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা চাঁদটাকে মনে মনে অস্বীকার করতে লাগলাম। মধ্যরাতের নিঝুমকে পরোয়া করতে চাইছিলাম না। বার বার মনকে বুঝাতে থাকি, এই তো কিছুক্ষণের মধ্যে গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।

যত এ রকম অনুশীলন করছিলাম তত যেন ভয় বাড়ছিল। ভয়টা আরও বেড়ে যায় কাছাকাছি কোথাও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শুনে। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠা যাকে বলে। শরীর অসার হয়ে উঠতে শুরু করে।

হঠাৎ মনে হয় ইরাবতীর গলা না? ভয়ই যেন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় সামনে ফুটে ওঠা একটা ছায়াপুঞ্জের দিকে। ওটা ছিল মাঠে এসে হারিয়ে যাওয়া একটা শুকনো নদীর তলদেশ। পাড়ে কাঁটামেদি এবং কেয়ার ঝোপ। কাঁটামেদি আর কেয়ার ঝোপের আড়ালে এসে লুকিয়েছিল ইরাদি। তারই কান্না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।

ইরাদিকে দেখতে পেয়ে ভয় অনেকটা কেটে যায়। কাছে গিয়ে বলি : ইরাদি।

ইরাদি মাথা তুলে দ্যাখে আমাকে। তার কান্না আরও বেড়ে যায়। মাটিতে মাথা লুটিয়ে কাঁদছে। কি করব ভাবছি এ সময় দয়ানাথ এসে দাঁড়ায়। সেও আমার মতো সন্ত্রস্ত।

দয়ানাথ ইরাদির পাশে বসে। মাথায় হাত রেখে বলে : কি অইছে ইরাদি? কানতাছ কেরে?

ইরাদি দয়ানাথের হাত জড়িয়ে ধরে। কাঁদছে আরও জোরে জোরে। আমার বিয়া অয় না ক্যান রে। বলছিল কাঁদতে কাঁদতে। হঠাৎ হঠাৎ ইরাদির সেই পুরনোর কান্না। আমাদের উদ্দেশ্যে নাকি কপালকে দোষ দিয়ে বুঝতে পারছিলাম না আমি বা দয়ানাথ। দু’জন আমরা দু’জনার দিকে তাকাই। আমরা জানি ফর্সা, লম্বা, সুন্দরী ইরাবতীর কেন বিয়ে হয় না। তার বাবা মনীন্দ্রমুদীর মেয়ের বিয়ের যৌতুক দেয়ার মুরোদ নেই। কিছু টাকা মনীন্দ্রনাথ জমিয়েছিল। এই কিছু দিন আগে টাকাটা চুরি গেছে।

আমরা ইরাদিকে ধরাধরি করে নিয়ে চললাম। ইরাদির দুঃখে আমাদেরও কষ্ট হচ্ছিল খুব। দয়ানাথের চোখ দিয়ে টস্্টস করে দুফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। ইরাদিকে আমরা দুই বন্ধু খুব ভালবাসি। খুব কষ্ট হচ্ছিল আমাদের ইরাদির দুঃখ।

এরপর ইরাদির জীবনের গল্প খুব বেশি দূর এগোয়নি। আমরা সে সময় মেট্রিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। গ্রাম থেকে আসা একটা লোকের কাছ থেকে খবর পেলাম গেল পূর্ণিমার রাতে মেয়েটা কাউকে না জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। শেষে খোঁজাখুঁজি করে তার লাশ পাওয়া যায় মোহনডাঙা মাঠে। বাড়ির বঁটি দাটা সে সঙ্গ করে নিয়ে গিয়েছিল। সন্দেহ নেই, গলা দু’ফাঁক করেছিল সে নিজের হাতেই।

আমি ও দয়ানাথ খবরটা যখন শুনি তার দিন দশেক আগেই ইরাবতীর দাহ শেষ হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলা ছাড়া আমাদের করার কিছু ছিল না। আমি ও দয়ানাথ দুঃখ করে ভাবলাম ইরাদি আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারল না কেন। বড় হয়ে আমাদের দু’জনের যে কেউ তাকে বিয়ে করে ফেলতে পারতাম। আমরা তো সে জন্য তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছিলাম। ইরাদি’টা এত বাকা আর সেন্টিমেটাল!

এই ঘটনার বছর দুই পর দয়ানাথ এবং তার পরিবার পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে যায়। বেশ কয়েক বছর চিঠিপত্র চালালি ছিল ওর সঙ্গে। মাঝে একবার কলকাতায় দেখাও হয়েছিল। এরপর বহু বছর যায়। দয়ানাথের সঙ্গে আর কোন যোগাযোগ নেই। আমার প্রাণের বন্ধু কোথায় যে আছে, বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে কেমন আছে, বেঁচে আছে কিনা তার কিছুই জানি না আমি। জলপাইগুড়িতে সেটল করেছিল। সেখানে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি বলে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু স্ট্যাটাসে ঝাড়খ-ে গিয়েছিল। এরপর আর কোন খবরাখবর জানি না।

এর মধ্যে কেটে গেছে জীবনের অনেকটা সময়। সব মিলিয়ে আমি বেশ আছি। পরীক্ষা পাশটাশ দিয়ে একটা করেজে শিক্ষকতা করতে শুরু করেছিলাম। কিছুদিন পর ক্লাসে গোলমাল হয়, পড়াতে পারি না, এই অভিযোগে আমার চাকরি যায়। আমার স্ত্রী সুলতানা নাহার আমাকে ত্যাগ করে প্রায় একই ধরনের অভিযোগে। আমার চাকরি যায়। আমার স্ত্রী সুলতানা নাহার আমাকে ত্যাগ করে প্রায় একই ধরনের অভিযোগে। সে বলে যে কোন নারীকে ভালবাসার ক্ষমতা আমার নেই। আমি নপুংসক তা নয়। এই অভিযোগ তার ছিল না। আমার পৌরুষের পক্ষে বিপক্ষে কিছুই বলেনি সে। শুধু তালাকনামায় উল্লেখ করেছিল যে স্ত্রীসহ দুনিয়ার জাগতিক বিষয়ে আমি অত্যন্ত উদাসীন। নিস্পৃহ। কিছুটা গোলমেলে। সুলতানা নাহারের পর আর কোন স্ত্রী বা নারীর জন্য চেষ্টা করিনি আমি। এমনিতে বেশ আছি বলে মনে হয় আমার। থাকি ঢাকা শহরের খুব ধনবান এক ব্যক্তির ছয় তলা ভবনের ছাদে, চিলে কোঠায়। কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়েকে ইংরেজী শিখিয়ে যা পাই তাতে চলে যায় আমার।

আমার সবচেয়ে সুন্দর সময় হচ্ছে মাসের শুক্লপক্ষের সময়টা। চাঁদ আমার প্রিয় সাবজেক্ট। বেশ কেটে যায় চাঁদ দেখে এবং কখনও না দেখে। দুনিয়ার চাঁদে পাওয়া বিরল জনগোষ্ঠীর আমি একজন।

কেউ কেউ আমাকে দুনিয়া ছাড়া বলে। আমি মোটেও তা নই। সবার সঙ্গে আমি সমান দক্ষতার সঙ্গে মিশতে পারি। লোকজনের সঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলতে পারি। দুনিয়ার অনেক ভ-ামিও আমি শিখে গিয়েছি, স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে গলে ওগুলো কাজে লাগে বলে। আমি ব্যাংকের এ্যাকাউন্টও সযতেœ রাখি। নিশ্চিত জানি জমানো টাকাগুলোই আমাকে বাঁচাবে। আমাকে অবৈষয়িক বা সামাজিক বলর উপায় নেই। কাজেই আমাকে দুনিয়া ছাড়া বলা উচিত না। চাঁদে পাওয়া বললেও বলা যায়।

তবে চাঁদ একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধর্ম ও দাম্পত্যের মতো। কেউ চাঁদ বেশি দ্যাখে। কেউ দ্যাখে না। কেউ চাঁদের নৌকা বাইতে পারে। কারু কারু সে ক্ষমতা নেই। এই পারা না পারা নিয়ে তো মন্তব্য করা ঠিক না। চাঁদ আসলে একটা সুন্দর আশ্রয়। সেটা যে জানে সে জানে।

শীর্ষ সংবাদ:
একদিনে করোনায় ১২ মৃত্যু, শনাক্ত ৯৫০০         আগামীকাল থেকে উপজেলাতেও ওএমএসে চাল-আটা বিক্রি         বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব         করোনার সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে ১২ জেলা         আপাতত বাড়ছে না ভোজ্যতেলের দাম         শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে রিট         ঢাকায় সেফুদার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু         ‘বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না’         দখলদারদের উচ্ছেদ ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে ডিসিদের নির্দেশ         পরিবহন শ্রমিকদের টিকা দেওয়া শুরু         শিমুকে হত্যার পর নিখোঁজের জিডি করেন স্বামী         বিশ্বজুড়ে করোনায় আরও ৯৬৬৯ মৃত্যু         ফুটপাতে নির্মাণসামগ্রী ॥ মেয়র আতিকের ক্ষোভ প্রকাশ         আমিরাতে হুতিদের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশের নিন্দা         সুপ্রিম কোর্টে ভার্চ্যুয়াল বিচার কাজ শুরু         কেউ যেন হয়রানি না হয় ॥ সেবামুখী জনপ্রশাসন গড়তে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ         দাম্পত্য কলহেই চিত্রনায়িকা শিমু খুন         ইসি সার্চ কমিটিতেই         করোনা শনাক্তের হার আশঙ্কাজনক বাড়ছে         ব্যাপক তুষারপাত ॥ শীতে নাকাল আমেরিকা ইউরোপ