ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৮ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

পাঁচ মৃত ব্যক্তি, কারাগার ও লন্ডন প্রবাসির নামে ভূয়া বিল

প্রকাশিত: ২২:৪৬, ৩০ জুন ২০১৭

পাঁচ মৃত ব্যক্তি, কারাগার ও লন্ডন প্রবাসির নামে ভূয়া বিল

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার ॥ কক্সবাজার বেতারে প্রবাসি, জেল হাজতে বন্দি এবং মৃত ব্যক্তিদের নামেও ভূয়া বিল জমা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আঞ্চলিক পরিচালক মো: হাবিবুর রহমানের সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত ১২টি ভাউচারে এসব বিল অনুমোদনের জন্য কক্সবাজার জেলা হিসাব রক্ষণ অফিসে পাঠানো হলে সন্দেহ জাগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের কোষাগার থেকে বিপুল টাকা বেহাত হচ্ছে বুঝতে পেরে জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা সুকোমল বড়–য়া ওসব ভূয়া বিল ফেরত পাঠিয়েছেন। সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ২১ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রামুর প্রতিভাবান শিল্পী ও সাংবাদিক আবীর বড়ুয়া। কিন্তু চলতি বছরের মে ও জুন মাসে দুই দফা মৃত আবীর বড়–য়া ও তার সঙ্গীরা কক্সবাজার বেতারের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করেছেন বলে ৯ হাজার টাকাসহ দশ হাজার টাকার সম্মানিও অনুমোদনের জন্য বিল জমা করা হয়েছে। একইভাবে গোষ্ঠী ভিত্তিক অনুষ্ঠানে আরও অংশ নিয়েছেন বলে ভূয়া বিলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রয়াত শিল্পী ক্যাছেন (ক্যাছেন রাখাইন), প্রয়াত নাট্যশিল্পী তাহানুল কবির রানা, প্রয়াত শিল্পী ওকেছেন রাখাইন ও ইমং চৌধুরী। আশ্চর্য জনক হলেও সত্য এ তালিকা থেকে বাদ যায়নি কয়েক বছর আগে থেকে লন্ডনে বসবাসরত বেতারের সাবেক অনুষ্ঠান ঘোষক নাজমুল আহাম্মদ মুন্না এবং প্রায় এক বছর আগে থেকে কারাগারে অন্তরীণ বেতারের শিল্পী মো: সেলিমের নামও। শুধু তাই নয়, মৃত, জীবিত এবং প্রবাসী শিল্পীদের দস্তখত নকল করে নামে-বেনামে ভূয়া কন্ট্রাক্ট দেখিয়ে শুধুমাত্র মে-জুন দুই মাসেই প্রায় ১৯ লাখ টাকার বিল করেছেন কক্সবাজার বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক মো: হাবিবুর রহমান। তালিকায় দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসে ৫টি পৃথক বিলে ২৯০ জন শিল্পীর নামে ৯ লাখ ৫৯ হাজার ২৫ টাকা এবং মে মাসে ৭টি বিলে ৪২২জন শিল্পীর নামে ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৫ টাকাসহ মোট ১৯লাখ ৫৫ হাজার ৬’শ টাকা বিল করেছেন তিনি। এরমধ্যে এ দুই মাসে ১০৭টি গোষ্ঠী ভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখানো হয়েছে। গোষ্ঠী ভিত্তিক এ সব অনুষ্ঠানের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ৯ হাজার সর্বনিম্ন ৩ হাজার ২’শ টাকা বিল করা হয়। সে হিসেবে দুইমাসের বিলের সিংহ ভাগই গোষ্ঠী ভিত্তিক অনুষ্ঠানের বিল। শিল্পীদের অভিযোগ, মাত্র হাতেগুনা কয়েকটি অনুষ্ঠানছাড়া কোন অনুষ্ঠানই এই দুইমাসে রেকডিং হয়নি। সেখানে ১০৭টি দলগত পরিবেশনা। বিষয়টি অবাস্তব এবং বিষ্ময়কর ও বটে। জানা যায়, মে মাসের ১৩৭ নম্বর বিলের ৬০ জনের তালিকার ৫২ নম্বর ক্রমিকে আছেন প্রয়াত মেধাবী নাট্যকর্মী তাহানুল কবির রানার নাম। যদিও তাঁর শুদ্ধ নাম ছিল তাহানুল বশির রানা। ২০১১ সালে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান থিয়েটারের রানা। একই মাসের ১৩১ নম্বর বিলের ৭ নম্বর ক্রমিকে বেতারের শিল্পী মো: সেলিম প্রায় ১ বছর আগে থেকে একটি মামলায় কারাগারে আছেন। এ তালিকায় ১৯ নম্বরে শিল্পী মৃত ওকেছেন। ১৩৩ নম্বর বিলের ৯ এবং ৫৪ নম্বরে কক্সবাজার বেতারের সাবেক অনুষ্ঠান ঘোষক নাজমুল আহাম্মদ মুন্না প্রায় ৪ বছর ধরে আছেন লন্ডনে। এ তালিকার ১৪ নম্বরে ইমং চৌধুরী এবং ৫৮ নম্বর ক্রমিকে প্রয়াত শিল্পী সাংবাদিক আবীর বড়–য়ার নাম। ইমং ২০১৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের রাখাইনদের বর্ষা উৎসব চলাকালে সাগরে সলিল সমাধি হন। জুনের ১৫০ নম্বর বিলে ৬০ নম্বর ক্রমিকে কক্সবাজারের সাবেক জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অমিতোষ সেন। অথচ প্রায় ৬ মাস আগে এ কর্মকর্তা অন্যত্র বদলী হন। কক্সবাজার জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা সুকোমল বড়–য়া জনকণ্ঠকে জানান, বিলগুলোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক মো: হাবিবুর রহমানের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। শিল্পী শহিদুল ইসলাম বলেন, অনুষ্ঠান ঘোষণার জন্য বেতারে নিয়মিত যাই কিন্তু গত ছয় মাসের কোন গোষ্ঠী ভিত্তিক তো দূরের কথা- কোন একক অনুষ্ঠানও করেছি বলে আমার মনে পড়ছেনা। আমার নামে এটা ভুয়া বিল। বেতারের নাট্য প্রযোজক স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, কক্সবাজারে সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে হাতেগুনা ১০ থেকে ১৫টি। কিন্তু অবিশ্বাস্য ভাবে বেতারে দুই মাসে ১০৭টি গোষ্ঠী ভিত্তিক ভূয়া অনুষ্ঠান দেখানো হয়েছে। তদন্ত করলে কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে দাবী করে তিনি আরও বলেন, যাদের নামে এ অনুষ্ঠান দেখানো হয়েছে- ওসব নামের অস্থিত্বই কক্সবাজারে নেই। এটি বড় ধরনের জালিয়াতি। কক্সবাজার বেতারের কয়েকজন শিল্পী জানান, দেড় বছর আগে আঞ্চলিক পরিচালক মো: হাবিবুর রহমান যোগদানের পর থেকে বিশেষ দিবসের কয়েকটি অনুষ্ঠানছাড়া সব রেকডিং এক প্রকার বন্ধ করে দেন। শুধু মাত্র হাতেগুনা কয়েকজন শিল্পী কথককে দিয়ে কয়েকটি অনুষ্ঠান ছাড়া বেশির ভাগ অনুষ্ঠানই পুণপ্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু রেকর্ডিং বন্ধ থাকলেও প্রতিমাসে নামে বেনামে লাখ লাখ টাকার ভূয়া বিল দেখিয়ে শিল্পীদের সম্মানি খাতে এসব টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে।