মূলত মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.৮ °C
 
২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ৯ ফাল্গুন ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এডিনবরার দিকে তাকিয়ে মিনহাজুল আবেদীন নান্নু!

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জাহিদ রহমান

বাংলাদেশ ক্রিকেটের এখন যে রাজকীয় জমজমাট উত্থান তা মোটেও রাতারাতি হয়নি। অনেকেরই মেধা, শ্রম, বৃদ্ধিমত্তার বিনিময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট বর্তমান জায়গাতে এসেছে। সবার সমন্বিত চেষ্টাতেই ক্রিকেট হয়ে উঠেছে আরও বর্ণময়। তৈরি হয়েছে একটি ক্রিকেটপ্রেমী জাতি। আমাদের বর্ণময় ক্রিকেটের শেকড়ের অন্যতম একজন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। ক্রিকেটের কিংবদন্তিও তিনি। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে একজন মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর জন্ম না হলে ক্রিকেটের আজকের উত্থানটা এত মসৃণ নাও হতে পারত। ’৯৯ সালে প্রথম বিশ্বকাপে এডিনবরাতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর একটি দায়িত্বশীল লড়াকু ইনিংস সত্যিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের মোড়-ই ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আর তাই একটি নয় মোট দুটি ম্যাচে জয়ী হয়ে প্রথম বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পদার্পণটা ছিল স্মরণে রাখার মতোই। প্রথম বিশ্বকাপে আমাদের যা কিছু অর্জন সেখানে টিমের বাইরে ব্যক্তি নান্নুর নৈপুণ্যতা ছাপিয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

অনেকেরই হয়ত মনে আছে, প্রথম বিশ্বকাপে যখন পরপর দুটি ম্যাচে নিউজিল্যান্ড এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে যথাক্রমে ৬ ও ৭ উইকেটের ব্যবধানে বাংলাদেশ পরাজয় বরণ করে তখন বিষয়টি দেশের ক্রীড়ামোদি কাছে চরম মানসিক কষ্টের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে ’৯৯ সালের ২৪ মে এডিনবার্গে তৃতীয় ম্যাচে মুখোমুখি হয় স্কটল্যান্ডের। এদিন পরাজয়ের বৃত্ত ভাঙ্গার নিশানা নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। কিন্তু শুরুতে ব্যাটিং লাইনে ধস নামলে ব্যর্থতারই ইঙ্গিতই যেন হাত-ইশারা দিতে থাকে। কিন্তু না, এ ম্যাচে মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর একটি লড়াকু সৌন্দর্যময় ইনিংসের বদৌলতে বাজিমাত করে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে বাংলাদেশ প্রথম ব্যাট করতে নেমে ১৮৫ রান করে। রানের খাতায় সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী স্কোর করেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। ১১৬ বল খেলে হাফডজন চার মেরে ৬৭ রান করেন তিনি। নান্নুর এই বীরত্বময় ইনিংসের আগে ওপেনার খালেদ মাসুদ, মেহরাব হোসেন, ফারুক আহমেদ, অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম সবাই ব্যাটিং ব্যর্থতা দেখিয়ে সাজঘরে ফেরেন। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু একাই বীরের মতো লড়ে রানকে একটি চমৎকার ফাইটিংয়ের জায়গায় নিতে সক্ষম হন। তাঁর পথ ধরে দলের ভীতকে শক্তপোক্ত স্থানে নিয়ে যান নাইমুর রহমান দুর্জয়। শুধু রান করাই নয়, সেদিনের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। প্রথম বিশ্বকাপে বাংলাদেশ তৃতীয় ম্যাচে নান্নুর রৌদ্রকরোজ্জ্বল ইনিংস, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের ২২ রানে জয় সত্যিই ক্রিকেটের চলার পথে এক নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করে। ঐ অনুপ্রেরণার পথ ধরেই বাংলাদেশ দল ৩১ মে পাকিস্তানকে ৬২ রানে পরাজিত করে এক মহাসাফল্যের সাক্ষর রাখে। প্রথম বিশ্বকাপের বাংলাদেশের যে ক্রিকেটার প্রথম ‘প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ’ হয়েছিলেন সেই মিনহাজুল আবেদীন নান্নু এখন দেশের ক্রিকেট বোর্ডের অন্যতম নির্বাচক। একসময় মাঠে লড়াই করতেন। এখন মাঠের লড়াকুদের নির্বাচন করার অন্যতম অধিকর্তা তিনি।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ-সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানের মুখোমুখি হবে। সবাই মুখিয়ে আছেন লড়াই দেখার জন্যে। নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু কি ভুলে গেছেন নিজের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের স্মৃতি? না একটু ভুলেননি। উল্টো নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অর্জন এবং নিজের অর্জনের প্রভাবকে মিলিয়ে দেখেন বর্তমান বাস্তবতায়। তাঁর বিশ্লেষণ মোতাবেক বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যে চারবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলেছেÑ এর মধ্যে সব ভাল যায়নি। দুটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ বেশ ভাল করেছে, অন্য দুটিতে তেমন কোন অর্জন নেই। তবে প্রথম বিশ্বকাপের অর্জনটাকে তিনি খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর মতে, প্রথম বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড এবং পাকিস্তানকে পরাজিত করার মধ্যে অর্জিত সাফল্যই এ দেশের ক্রিকেট নেশন হিসেবে গড়ে তোলার একটি চমৎকার পথচলা তৈরি হয়। এডিনবরাতে নিজের সেই অতুলনীয় স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, পরপর দুটি ম্যাচে পরাজয়ের পর স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হই। এই ম্যাচে সবার লক্ষ্য ছিল জয় পাওয়া। আমি একটা ভাল পার্টনারশিপ করতে সক্ষম হই। সবশেষে চমৎকার দলীয় সংহতি প্রদর্শন করে দেশের ক্রীড়ামোদিদের মুখে হাসি ফুটাতে সক্ষম হই। সেই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের বিপক্ষে আরেকটি বিস্ময়কর বিজয় অর্জন আসে।

নান্নু বলেন, তাঁদের আমলের ক্রিকেটের সঙ্গে বর্তমান আমলের ক্রিকেটের অনেক তফাত আছে। ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনেক বেশি বিস্তৃত ঘটেছে। তাঁর ভাষায়, আগে একজন ক্রিকেটার একটা বছরে সামান্য কয়েকটি একদিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ পেত। কিন্তু এখন একজন ক্রিকেটারের জন্য এই সুযোগটা অনেক বেশি প্রসারিত। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি। সেই বিবেচনা থেকে মনে করি এখন একজন ক্রিকেটারকে অবশ্যই অনেক ভাল খেলতে হবে, দেশের জন্য ভাল খেলা উপহার দিতে হবে। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল কেমন করবে এমনতরো আলোচনায় বরাবরই স্বল্পভাষী নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বলেন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এখন আর আমরা নবাগত কেউ নই। আমরাও চারটি বিশ্বকাপ ইতিমধ্যে খেলে ফেলেছি। মূল বিষয় হলো বর্তমান জেনারেশন একটা ভাল অবস্থায় ক্রিকেটটাকে পেয়েছে। আমাদের সময়ে অনেক কিছুর জন্য আমাদের স্ট্র্যাগল করতে হলেও সে সময়টা পেরিয়ে গেছে বেশ আগেই। এখন ক্রিকেটারদের জন্য অবারিত সব সুবিধাদি তৈরি হয়েছে। সেই নিরিখে আমাদের সবারই প্রত্যাশা তো রয়েছে। তবে সেই প্রত্যাশা তারা কতটুকু পূরণ করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। প্রত্যাশা পূরণ হলে আমাদের চলার পথ আরও সুগম হবে। আমরা ক্রিকেট নেশন হিসেবে নিজেদের আরও মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারব। সবার জন্যে তাই অবারিত শুভকামনা থাকল।

প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: