ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

নেত্রকোনায় ফসলহানির শঙ্কায় কৃষক

নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ

নূরুল আলম কামাল, নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ২২:২১, ৩ মার্চ ২০২৬

নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ

নেত্রকোনায় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি কাজ

নেত্রকোনা হাওরাঞ্চলে মানুষের প্রধান আয়ের উৎস ধান উৎপাদন মাছ শিকার। তবে প্রধান উৎস ধান। এ থেকে আয়ের টাকায় পরিবারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ব্যয়বারসহ সকল খরচ নির্বাহ করা হয়। প্রায়ই আগাম বন্যায় এসব অঞ্চলে ফসলহানি ঘটতো। এ কারণে সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করে থাকে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় কয়েক বছর ধরে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ হয় না। পাউবোর দাবি হাওরের পানি নামতে বিলম্ব ও উপজেল স্কীম কমিটির অবহেলায় পিআইসি কমিটি গঠনে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু ও শেষ হতে দেরি হচ্ছে।

তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে বলে জানান তারা। ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ দিনে কাগজে কলমে ৬৫-৭০ ভাগ কাজ বাস্তবায়ন দেখালেও প্রকৃতপক্ষে স্থানীয়দের তথ্য মতে ৫৫-৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন পর্যায়ে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাঁধের কাজ শেষ হতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ফসলহানির উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে সুশিল সমাজ মনে করেন সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় নির্ধারিত সময়ে ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। হাওরে প্রয়োজন ছাড়াও ফসল রক্ষার নামে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে হাওরের নাব্যতা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে মৎস্য ভা-র। তাদের দাবি প্রয়োজনীয় বাঁধ ছাড়া অন্যগুলো যেন বাতিল করে হাওরের নাব্যতা ঠিক রাখা হয়। 
নেত্রকোনা পাউবো ও কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার ৫টি উপজেলায় ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব এলাকায় ৩৬৫ কি.মি. অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে। হাওরে এক সময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হতো। ২০১৭ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর পাউবো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেন। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কৃষক স্থানীয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে ৫/৭ সদস্যের কমিটি (পিআইসি) গঠন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারেন। এবার জেলায় ১লাখ ৯৮ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হচ্ছে।

আর বাঁধগুলোর আওতায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমির রয়েছে। হাওরে ১৩৬ দশমিক ৭৯৮ কি.মি. বাঁধ মেরামতের জন্য পাউবো ২০২টি পিআইসির মাধ্যমে প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৩১ কোটি টাকা ধরা হয়। ১৫ ডিসেম্বর থেকে এসব প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার জন্য পিআইসি কমিটিকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো বাঁধগুলোর কাজ সম্পন্ন হয়নি। সোমবার সরেজমিনে মদন, খালিয়াজুরী ও মোহনগঞ্জ এলাকার প্রায় ৬৭টি প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে- এসব এলাকার হাওরের জগন্নাতপুর রাজঘাট বাঁধে কিছু মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। পাশের আরেকটি বাঁধে অর্ধেক অংশে মাটি ফেলা হয়েছে। এটির কাজ চলমান রয়েছে। কীর্তনখোলা বাঁধের কয়েকটি পিআইসি অবস্থাও একই। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাঁধেই কাজ শেষ হয়নি।
তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বাঁধগুলোর কাজ রাজনৈতিক নেতারা করেন। এবছর নির্বাচন হওয়ায় কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। আবার নির্বচনী ফলাফল কি হয় এতে কোনো প্রভাব পড়ে কি না এর জন্যও অনেকে অপেক্ষা করেছেন। অকিাংশ বাঁধ নির্বচন শেষ হওয়ার পর শুরু করেছে। আজ মার্চ মাসের ২ তারিখ, বাঁধের কাজ দুইদিন আগে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে পুরোপুরি শেষ হতে আরও একমাস সময় লাগবে। এরমধ্যে নদীতে জোয়ার এসেছে। পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন আমরা আতঙ্কে আছি। যেভাবে ঢিলেমিশি হচ্ছে আগাম বন্যা হলে ফসলহানির হতে পারে। 
খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাতপুর গ্রামের শরীফ, আরিফুল ইসলাম, চাকুয়া শিবির এলাকার নূর আহমদ, লিপসিয়ার আজিজুল, রসুলপুর গ্রামের মুজিবুর, মদন উপজেলার কাতলা গ্রামের নূরুল হুদা, ঘাটুয়া এলাকার আবুল কালাম, গোবিন্দশ্রী গ্রামের সুজন, মাজলু, মোহনগঞ্জ উপজেলার বেতাম গ্রামের মাসুদ, সুখদেবপুর গ্রামের হাসানসহ অনেকেই জানান, হাওরে এক ফসলি জমি। এ ফসলের আয় দিয়ে সারাবছরের পরিবারের জীবিকাসহ ব্যয়ভার নির্বাহ করা হয়। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ কাজ এখনো শেষ হয়নি। যদি আগাম বন্যা হয় তাহলে ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে। 
খালিয়াজুরির জগন্নাতপুর রাজঘাট, রসূলপুর ও কীর্তনখোলা ফসররক্ষা বাঁধের পিআইসিগন বলেন, অন্য সাইটে ভেকু কাজ করতেছে। বাঁধে মাটি ফেলা হচ্ছে। ১৫-২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে। খালিয়াজুরী খাবিটা স্কীমের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, খালিয়াজুরেিত ফসলরক্ষার বাঁধ প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে শেষ হবে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত হোসেন বলেন, হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হয়েছে। তারপরও অন্যান্য বছরের তুলনায় কাজ অনেক দ্রুত হয়েছে। কয়েকটি বাঁধ ছাড়া অধিকাংশ বাঁধে মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের বাঁধের কাজ শেষ হবে। 
পাউবোর জেলা স্কীমের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সাইফুল রহমান বলেন, ফসলরক্ষা বাঁধে মাটি ফেলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। যে কয়টা বাকী আছে এগুলো কাজ হচ্ছে। অন্যান্য কাজগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় পিআইসির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্যানেল হু

×