ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত নওগাঁর আত্রাইয়ের গান্ধী আশ্রম

প্রকাশিত: ১৮:০৬, ১৬ নভেম্বর ২০২১

মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত নওগাঁর আত্রাইয়ের গান্ধী আশ্রম

নিজস্ব সংবাদদাতা, নওগাঁ ॥ ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃত, অহিংস ব্যক্তিত্ব ও ভারতবর্ষের জনপ্রিয় নেতা মহাতœা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত নওগাঁর আত্রাইয়ের গান্ধী আশ্রমটি অনেকটাই সেজেগুছে এগুচ্ছে। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দিন দিন গান্ধী আশ্রমের কলেবর বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে ভারতীয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের অর্থায়নে মহাতœা গান্ধী ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল গড়ে উঠেছে এখানে। বর্তমানে আশ্রমের অনেকটা জায়গা জুড়ে চাষ করা হচ্ছে তুঁত গাছ। এছাড়াও জেলা পরিষদের অর্থায়নে সেখানে সীমানা প্রাচীর ও দৃষ্টিনন্দন গেট নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে তুঁত গাছ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা দেখতে আসেন। শুধু তাই নয়, প্রতি সপ্তাহে একজন ডাক্তার এসে রোগী দেখেন। তবে ওখানে স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের। আর তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আশ্রমটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব বলে দাবি সচেতন মহলের। সূত্রে জানা গেছে, ইংরেজ সামাজ্র্যবাদের নির্যাতনের যাঁতাকলে যখন পিষ্ট গোটা ভারতবর্ষবাসী। তাদের জুলুম ও নিপীড়নে অতীষ্ঠ বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ। সে সময় ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে জনমনে জায়গা করে নেন ভারতবর্ষের কিংবদন্তি নেতা মহাত্মা গান্ধী। হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ধর্ম-বর্ণের উর্দ্ধে থেকে তিনি এ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইংরেজদের পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জনমত সৃষ্টি করেন। তিনি এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ১৯২৫ সালে নওগাঁর আত্রাইয়ে এসেছিলেন। সে সময় তিনি আত্রাই রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন তেতুঁলিয়া নামক স্থানের আজকের এই গান্ধী আশ্রমে অবস্থান করে এলাকার অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করেন। একই সঙ্গে এলাকাবাসীকে আতœনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে তিনি এখানে খদ্দর কাপড় তৈরির তাঁত শিল্প স্থাপন ও খাঁটি সরিষার তেলের জন্য ঘানি স্থাপনসহ অনেক স্মৃতিচিহ্নই গড়ে তোলেন। তৎকালীন সময়ে বানভাসী মানুষদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যে তিনি এখানে স্থাপন করেন বঙ্গীয় রিলিফ কমিটি (বিআরসি)। গান্ধী আশ্রম দেখতে আসা শিক্ষার্থী মুন্নি, নিলীমা, রতœাসহ অনেকেই জানায়, মহাতœা গান্ধীর স্মৃতি বিজড়িত গান্ধী আশ্রমটি খুব ভাল লেগেছে। তবে এখানে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যায়। সেই স্কুলে স্থানীয় গরীব, অসহায় ও ছিন্নমূল পর্যায়ের শিশুরা লেখাপড়া করতে পারতো। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহাসিক আশ্রমটিকে আন্তর্জাতিক মানের একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দা মনিরা বেগম, ফরিদুল আলম পিন্টুসহ অনেকেই বলেন, এখানকার অনেক জায়গা অবৈধ ভাবে দখল হয়ে আছে। সেই সব জায়গা উদ্ধার করে এখানে স্কুলের পাশাপাশি একটি হাসপাতাল স্থাপন করলে আমরা এবং স্থানীয় গরীব-অসহায় মানুষসহ অনেকেই উপকৃত হবো। এছাড়াও এখানে যা বর্তমানে আছে তার রক্ষনাবেক্ষণ ও সংস্কার প্রয়োজন। এখানে করার আরো অনেক কিছুই আছে। এখানে কিছু করার জন্য শুধুমাত্র কর্তা ব্যক্তিদের সুদৃষ্টি ও সৎ মন মানসিকতার প্রয়োজন। গান্ধী আশ্রম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. নিরঞ্জন কুমার দাস বলেন, এক সময় গান্ধী আশ্রমের উন্নয়ন মুখ থুবরে পড়ে থাকলেও বর্তমান সরকারের আমলে ভারতীয় অর্থায়নে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মহাত্মা গান্ধী ও পিসি রায় মেমোরিয়াল হল। এখানে প্রতি বছর আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় গান্ধীর জন্মোৎসব। আমি প্রতিদিন এই এলাকার গরীব ও অসহায় মানুষদের কষ্টের কথা চিন্তা করে বিনামূল্যে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি। তাই আশ্রমের আরো উন্নয়নের পাশাপাশি একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। আমি সরকার কিংবা উপজেলা প্রশাসন এমন কি এই আশ্রম থেকেও কিছু পাই না। শুধু আমি নই এই আশ্রমে দীর্ঘ ৩বছর ধরে একজন কেয়ারটেকার দেখভাল করলেও তার কোন বেতন-ভাতা কিংবা কোন সুযোগ-সুবিধা কিছুই পান না। স্থানীয় এমপি মোঃ আনোয়ার হোসেন হেলাল বলেন, বিগত সরকারের আমলে এই ঐতিহাসিক আশ্রমটি খুবই অবহেলিত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে আশ্রমটির মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি আশ্রমটিকে আধুনিক মানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে উন্নীত করার জন্য প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা রাখি আমি তাতে সফল হব। এদিকে গত ২ অক্টোবর (শনিবার) নওগাঁর আত্রাইয়ে ঐতিহাসিক গান্ধী আশ্রমে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর ১৫২তম জন্ম বার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে গান্ধীজির ভাস্কর্য উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ভাস্কর্যের উদ্বোধন শেষে কেক কেটে গান্ধীজির জন্মবার্ষিকী পালন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটী। ভাস্কর্য উদ্বোধন শেষে এদিন আত্রাই উপজেলার গান্ধী আশ্রমে বঙ্গীয় রিলিফ কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম মোল্লার সভাপতিত্বে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন, সাবেক এমপি বীরমুক্তিযোদ্ধা ওহিদুর রহমান, উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এবাদুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইকতেখারুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নৃপেন্দ্রনাথ দত্ত দুলাল, সহ-সভাপতি চৌধুরী গোলাম মোস্তফা বাদল, সম্পাদক আক্কাস আলী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে অতিথিরা বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের অকৃত্রিম বন্ধু। তাই ভারতীয় জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতি ও আদর্শকে বুকে ধারন, লালন ও পালন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের লাল সবুজের বাংলাদেশ বিনির্মানে কাজ করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান তারা।
×