১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গারো পাহাড়ে অস্ত্রভা-ার উলফা-জামায়াত জঙ্গী কানেকশনের ফল!


রফিকুল ইসলাম আধার, শেরপুর থেকে ॥ শেরপুর সীমান্তে মধুটিলা ইকোপার্ক সংলগ্ন বুরুঙ্গা কালাপানি এলাকার গহীন অরণ্য থেকে র‌্যাবের অভিযানে বিমান বিধ্বংসী গোলাবারুদসহ ৪৮ হাজার গুলি, ৬০টি ভারি অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের পর ফের উলফা-জামায়াত জঙ্গী কানেকশনের প্রশ্ন উঠে আসছে। ইতোপূর্বে শেরপুর সীমান্ত থেকে দফায় দফায় ভারি গুলি, রকেট লাঞ্চার, গ্রেনেড, মাইনসহ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটলেও সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে এবার। এ ঘটনার পর থেকে সীমান্তের পাহাড়ী এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। বুধবার দুপুরে সরেজমিনে সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের মধুটিলা ইকোপার্কসহ সমশ্চুড়া, বুরুঙ্গা ও কালাপানি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, র‌্যাবের অভিযানে অস্ত্রভা-ার আবিষ্কারের পর থেকেই ওইসব জনপদের চিত্র পাল্টে গেছে। কমে গেছে পর্যটকদের আনাগোনাসহ ভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াত। আদিবাসী অধ্যুষিত ওইসব জনপদে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। আদিবাসী পরিবারের যেসব দরিদ্র সদস্য জীবিকা নির্বাহের তাগিদে প্রতিনিয়ত পাহাড়ের লাকড়ি সংগ্রহের জন্য বের হতো, তারাও এখন থমকে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতি খুব কমই মোকাবেলা করতে হয়েছে তাদের। ওই জনপদসহ গারো পাহাড়ের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে এক সময় ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম (উলফা) সদস্যদের অবাধ বিচরণের কথা অকপটে তারা স্বীকার করে গেলেও এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুদ কিভাবে, কারা করেছে সেই অতি জানা উত্তরটাও যেন তারা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা পাওয়া গেল, অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া র‌্যাব-পুলিশ, বিজিবি ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলে।

বুধবার বিকেলে দৈনিক জনকণ্ঠকে র‌্যাব-৫-এর কোম্পানি কমান্ডার মোবাশ্বের হোসেন খান জানান, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আপাতত সমাপ্ত হলেও ওইসব পাহাড়ী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া র‌্যাবের টহল চলছে। তবে অস্ত্র মজুদের সঙ্গে কারা জড়িত, সে ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। একই কথা জানান র‌্যাব-১৪ (জামালপুর-শেরপুর) এর কোম্পানি কমান্ডার মোঃ তাজুল ইসলাম ও বিজিবি বারমারীর ক্যাম্প কমান্ডার রফিকুল ইসলাম। আর পুলিশ যেন রয়েছে অন্ধকারে। অবশ্য উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ কাদের হতে পারে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল এইড এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সোমবার শেরপুর সীমান্তে প্রেস ব্রিফিংকালে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মিডিয়া কর্মীদের বলেছিলেন, মামলার পর তদন্তে সেটা বেরিয়ে আসবে। ‘রাজশাহীতে চারজনকে আটকের পর তাদের দেয়া তথ্য মোতাবেক ওই অভিযান ও অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কি-না’Ñ এমন এক প্রশ্নের জবাব পাশ কাটিয়ে তিনি জানিয়েছেন, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র রাজশাহীতে চারজন আটকের তথ্য উড়িয়ে না দেয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত হলেই ওই অস্ত্র মজুদের হোতা কে বা কারা সেটি সহজেই বেরিয়ে আসার কথা।

এদিকে ওইসব অস্ত্রশস্ত্র কাদের হতে পারে তা র‌্যাব নিশ্চিত করে না বললেও স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, ওইসব অস্ত্রশস্ত্র ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার হতে পারে। একসময় ওই এলাকায় উলফা সদস্যদের বিচরণ ছিল বলেও জানান তারা। কিন্তু মাটি খুঁড়ে যেভাবে ৪৮ হাজার গোলাবারুদ এবং ৬০টি ভারি অস্ত্রসহ সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি উদ্ধার হয়েছে তা নেহায়েত ফেলে যাওয়ার ঘটনা তো নয়ই, বরং তা উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোন জঙ্গী চক্রের পরিকল্পিত আস্তানা বা অস্ত্রভা-ারের বহির্প্রকাশ বলেই মনে করা হচ্ছে। আর শীর্ষ নেতাদের একের পর এক চূড়ান্ত বিচারের পর সেই জঙ্গী চক্র জামায়াত সৃষ্টও হতে পারাটা অস্বাভাবিক নয়।

আর ওই অবস্থায় ফের ঘুরেফিরে উঠে আসছে ইতোপূর্বে ওই পাহাড়ী এলাকার পাশেই অবস্থিত মধুটিলা ইকোপার্কে উলফা-জামায়াত জঙ্গী গোষ্ঠীর একটি গোপন বৈঠকের তথ্য। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সূত্রের বরাত দিয়ে ২০১৪ সালের ৭ নবেম্বর বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন নিউজপোর্টালে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছিল, ‘পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন উলফা জামায়াতের জন্য বাংলাদেশে অস্ত্র পাচার করছে। এজন্য চুক্তি করতে গত ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশের শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা ইকোপার্কে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জামায়াত ও বিএনপির কিছু নেতা এবং উলফার পক্ষ থেকে তাদের দু’জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ওইসময় জামায়াতের নেতারা ছোট অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এজন্য উলফা প্রতিনিধিদের কাছে ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।’ প্রকাশিত খবরটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে শেরপুরে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন এবং বিশেষ করে ওইসময় চূড়ান্ত বিচারে ফাঁসি বহাল থাকা জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আর ওই আতঙ্কে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন একই উপজেলার পার্শ্ববর্তী সোহাগপুর বিধবাপল্লীতে থাকা রাষ্ট্রপক্ষের ৪ সাক্ষীসহ অন্যান্য বীরাঙ্গনা ও তাদের স্বজনরা। আর এ নিয়ে ওইসময়ে দৈনিক জনকণ্ঠে একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হলে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কিছুটা সময় টনক নড়ে প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর। কিন্তু এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোন বিভাগই ওই গোপন বৈঠক বা উলফা-জামায়াতের অস্ত্র বেচা-কেনা চুক্তির কোন ক্লু-ই খুঁজে পায়নি। ঘটনা পরম্পরায় দীর্ঘ প্রায় দেড় বছরের মাথায় ঠিক ওই মধুটিলা ইকোপার্কের অদূরের গহীন অরণ্যে র‌্যাবের অস্ত্র ভা-ার আবিষ্কারের পর থেকে সঙ্গত কারণেই উলফা-জামায়াতের গোপন বৈঠকের বিষয়টি উঠে আসছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: