২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

লঞ্চঘাটা স্মৃতিস্তম্ভ


মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে লঞ্চঘাটা বধ্যভূমিতে এনে হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েক হাজার মানুষকে। ২০০৫ সালে গফরগাঁওয়ের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গৌতম কুমার সরকার ও পৌরসভার উদ্যোগে স্থানটি নির্ধারণ করে তৈরি করা হয় বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ। পরে ২০১১ সালে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের অর্থায়নে সংস্কারের পর বর্তমান রূপে এলেও এখন পর্যন্ত আশপাশের স্থান নির্ধারণ নিয়ে রয়েছে জটিলতা। এছাড়া গফরগাঁওয়ে আরও ১০টি বধ্যভূমি রয়েছে অরক্ষিত।

-শেখ আব্দুল আওয়াল, গফরগাঁও থেকে

২৪ বধ্যভূমি

অরক্ষিত

একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে নৃশংস হত্যার স্থান কিশোরগঞ্জের ২৪টি বধ্যভূমির সুষ্ঠু সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠার কারণে এসবের অধিকাংশই এখন গোচারণ ভূমি। সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের শোলমারা সেতুসংলগ্ন বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ থাকলেও তা অত্যন্ত অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকসেনা ও এদেশী দালাল রাজাকার-আল বদর, আল শামস ও মুজাহিদ বাহিনী সারা দেশের মতো কিশোরগঞ্জেও ব্যাপক অগ্নিকা-, হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ-নির্যাতন করে। সেইসব স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি কিশোরগঞ্জবাসীকে আজও স্মরণ করিয়ে দেয় একাত্তরের ভয়াল দিনের কথা। জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে অর্ধশতাধিক বধ্যভূমি থাকলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংরক্ষণযোগ্য ২৪টি বধ্যভূমি সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে তথ্য পাঠানো হয়।

Ñমাজহার মান্না, কিশোরগঞ্জ থেকে

ত্রিমোহনীতে

স্মৃতিস্তম্ভ

ত্রিমোহনী। নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের মাঝামাঝিতে অবস্থিত স্থান। মগড়া নদীর ত্রিমোহনায় অবস্থিত স্থানটিতে একাত্তরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকবাহিনী। অগণিত নিরীহ মুক্তিকামী বাঙালীর বুকের রক্তে ভিজেছিল এখানকার মাটি। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪২ বছর পর্যন্ত বধ্যভূমিটি ছিল অরক্ষিত। ‘অমাস’ নামক উন্নয়ন সংস্থা উদ্যোগ নেয় স্থানটি সংরক্ষণের। নির্মাণ করে স্মৃতিস্তম্ভ। এতে খানিক সময়ের জন্য হলেও সেখানে থেমে দাঁড়ায় পথিক।

একাত্তরে ত্রিমোহনীতে মগড়া নদীর ওপর পাকা সেতু ছিল। বর্বর পাকবাহিনী এ সেতুটিকেই বেছে নিয়েছিল হত্যাযজ্ঞের নিরাপদ স্থান হিসেবে। ত্রিমোহনীতে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে একাত্তরের ২২ সেপ্টেম্বর। সেদিন ২৫ নিরীহ বাঙালী হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করা হয় সেখানে।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে

গণহত্যার সাক্ষী

খুনিয়া দীঘি

জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরবর্তী রাণীশংকৈল উপজেলা সদর থেকে মাত্র সিকি মাইল দক্ষিণে পাকা রাস্তা সংলগ্ন খুনিয়াদীঘি ঠাকুরগাঁও জেলার বড় বধ্যভূমি। ৬ একর আয়তনের খুনিয়া দীঘি দু’শ’ বছর আগে স্থানীয় জমিদার খনন করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় খানসেনারা এখানে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। নিরীহ মানুষের রক্তে দীঘির পানি দীর্ঘদিন লাল হয়ে ছিল।

Ñএস. এম. জসিম উদ্দিন

ঠাকুরগাঁও থেকে

২শ’ বধ্যভূমিতে

স্মৃতিসৌধ নেই

লক্ষ্মীপুরে দু’শ’ বধ্যভূমির সন্ধান পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড এ নিয়ে তালিকা প্রণয়ন করছে বলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আনোয়ারুল হক মাস্টার জানান। এর মধ্যে সদর উপজেলার উত্তর পাশে বাগবাড়ি সংলগ্ন মাদাম ব্রিজের পাশে বর্তমান শিশু পার্কে প্রবেশ দ্বারে সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর পৌর মেয়র আবু তাহেরের উদ্যোগে দেয়াল নির্মাণ করে সেটি চিহ্নিত করা হয়। তবে সরকারী স্বীকৃতি দেয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জানায়। সদর উপজেলার পিয়ারাপুর ওয়াপদা খালের ব্রিজের পাশে রয়েছে গণকবর।

Ñমহিউদ্দিন মুরাদ, লক্ষ্মীপুর থেকে

পুরো শহরই

ছিল বধ্যভূমি

পার্বতীপুরে মহিলা কলেজ সংলগ্ন রেল গোলাইয়ের পূর্বপাশের স্মৃতিসৌধটি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের গণহত্যার স্মৃতিধারক। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে নিরীহ বাঙালীদের ধরে এনে গরু-ছাগলের মতো জবাই করে ডোবায়-নালায়, যেখানে সেখানে ফেলে রাখে হানাদাররা। তখন বিহারী কাললু কসাই মানুষ জবাই কাজে নিয়োজিত ছিল। তারা অসংখ্য গৃহবধূ, কুমারী মেয়ের সম্ভ্রমহানির পর হত্যা করেছে। দেশ স্বাধীনের পর শহরের জলাশয়, খাদে, পরিত্যক্ত কূপে চোখে পড়ে শুধু লাশ আর লাশ।

Ñশ.আ.ম হায়দার, পার্বতীপুর থেকে

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ

চির উন্নত মম শির

একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে পাকিসেনা ও সহযোগীদের নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি সাগরপারের জেলা পটুয়াখালীর প্রত্যন্ত দ্বীপ-জনপদ গলাচিপার মানুষও। বরং মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতাসহ বিভিন্ন কারণে এ জনপদে পাক জান্তা সেনারা বার বার হানা দিয়েছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী তিন দশকে মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে গলাচিপায় কোন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বেসরকারী উদ্যোগে গলাচিপা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কার্যালয় চত্বরে দেড় দশক আগে নির্মিত হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। দৃষ্টিনন্দন এ স্মৃতিস্তম্ভের প্রতিটি স্তরে উৎকীর্ণ করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক নির্দেশাবলী, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন উপজেলা কমান্ডার ডা. আবদুল মালেক এমনিতেই এলাকায় প্রগতিশীলতার পাশাপাশি সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনিই প্রথম এ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসেন।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে

৫২ বধ্যভূমির মধ্যে

চিহ্নিত চার

জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৫২ বধ্যভূমিতে পাকিবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সকল বধ্যভূমি সরকারীভাবে চিহ্নিত না হলেও মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা করছেন এমন গবেষকদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। সরকারীভাবে জয়পুরহাট সদর উপজেলার চকবরকত ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী পাগলা দেওয়ান ও সদর উপজেলার বম্বু ইউনিয়নের কড়ই-কাদিপুর গ্রামের দু’টি স্মৃতিসৌধ, আক্কেলপুর উপজেলার আমুট্ট গ্রামে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয় এবং পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জি ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন নন্দুইল গ্রামে আদিবাসীদের হত্যার স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। ১৯৯২ সালে জয়পুরহাটে দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি আমিনুল হক বাবুল ও আজকের কাগজের প্রতিনিধি নন্দকিশোর আগরওয়ালা মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমির স্থানগুলো অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে পাগলা দেওয়ান গ্রামে এই বধ্যভূমির খোঁজ পান।

Ñতপন কুমার খাঁ, জয়পুরহাট থেকে

অনেকে নীরবে চোখের পানি ফেলে ফিরে যায়

আলমডাঙ্গার রেলের লাল ব্রিজের কাছে ট্রেন থেকে নামিয়ে মুক্তিকামী, নারী ও পুরুষকে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হতো। সেই স্থানটি হলো আলমডাঙ্গার বধ্যভূমি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এমপি নিজ উদ্যোগে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বধ্যভূমির গর্তে পাওয়া গেছে অসংখ্য মানুষের মাথার খুলি-হাড়।

অনেকে এই বধ্যভূমিতে এসে তাদের আত্মীয়স্বজনদের আজও খুঁজে ফেরে। কেউ গুমরে কেঁদে উঠে আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়।

Ñরাজীব হাসান কচি, চুয়াডাঙ্গা থেকে