মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গণসঙ্গীত

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫

একটু অনুপ্রেরণায় হেঁটে দেয়া যায় কয়েকশ’ মাইল পথ। একটু চেতনা জাগ্রত হলেই কাঁপিয়ে ফেলা যায় পুরো পৃথিবী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের সময় উদাত্ত আহ্বান আসে সংগ্রামের, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই আহ্বানের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে এদেশের গণসঙ্গীত।

সেদিনের সেই সংগ্রামের মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল অসংখ্য অজানা গায়ক, শিল্পী, অভিনেতা ও কবি-সাহিত্যিক। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা নিয়ে সামিল হয়েছিল মুক্তিসংগ্রামে।

স্বাধীনতার সময় আয়োজিত হয়েছিল এক আন্তর্জাতিক সঙ্গীতানুষ্ঠান, ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, জোয়ান ব্যাজ, রিংগুস্টারের মতো শিল্পীরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় যশোর সফর করেছিলেন মার্কিন কবি ও গীতিকার এ্যালেন গিনসবার্গ। তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গান ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক মর্মস্পর্শী গান।

এ গানটি জাপানের তাকামাসা সুজুকি জাপানের জনগণকে শুনিয়েছে পরিভ্রমণ করে। এভাবেই সারা বিশ্ব জেগে উঠেছিল বাংলাদেশের পক্ষে। সোচ্চার হয়েছিল বিশ্বের জনগণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাই তাদের মনের মর্মবাণী।

মুক্তিযুদ্ধে গণসঙ্গীত যেমন বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি মকুন্দ দাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ ও রজনীকান্তের দেশাত্মবোধক গানও মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে জোরালো ভূমিকা রেখেছে।

ইতিহাস থেকে দেখা যায়, পুরো বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এখানে পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলেছে। বাংলার স্বাধীনতার অর্জন ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে গণসঙ্গীত সৃষ্টি করেছে এক আলোকোজ্জ্বল ও স্বর্ণালি অধ্যায়।

এই সত্য ইতিহাসের অংশ, এই ইতিহাসের সাক্ষী গোটা জাতি। তা কী আর মুছে ফেলা সম্ভব! সত্য কখনও ধুলোবালি হয় না, সত্যে কখনও ধুলোবালি জমে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থাপিত হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’, প্রথমে মুক্তাঞ্চলে (আগরতলায়) এবং পরে মুজিবনগরে (কলকাতায়)। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে কণ্ঠশিল্পীরা পরিবেশন করেছেন উদ্দীপনার গান। সেই শিল্পীরা পরবর্তীতে ‘শব্দ সৈনিক’ নামে হয়েছেন পরিচিত।

শিল্পী আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ কিংবা ‘হাজার বছর পরে’, আপেল মাহমুদের কণ্ঠে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ কিংবা ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবোরে’, স্বপ্না রায়ের কণ্ঠে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না’, সর্দার আলাউদ্দিনের কণ্ঠে ‘জগৎবাসী একবার আসিয়া’, মোকসেদ আলী সাঁইয়ের লেখা ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে’, গাজী মাজহারুল ইসলামের লেখা ও আনোয়ার পারভেজের সুর করা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ প্রাণ দিয়েছে যোদ্ধাদের।

এছাড়াও গোবিন্দ হালদারের লেখা ও সময় দাসের সুরে ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, শহিদুল ইসলামের লেখা ও সুজেয় শ্যামের সুরে ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’, ফেরদৌস হোসেন ভূঞার লেখা ‘হায়রে কিষান’, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ-এর লেখা ও সুজেয় শ্যামের সুরে ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’, আখতার হোসেনের লেখা ও অজিত রায়ের সুরে ‘স্বাধীনতা স্বাধীন, দিকে দিকে’, জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’, সত্যেন সেনের লেখা ও অজিত রায়ের সুর করা ‘আজি সুপ্ত সাগর ওঠে উছলিয়া, তোরা শুনতে কি পাস’ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।

কবি নজরুলের লেখা ও আলতাফ মাহমুদের সুর করা ‘বিদ্রোহী’ কবিতা অজিত রায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেয়েছিলেন। কবি সুকান্তের ‘বোধন’ কবিতাও অজিত রায় সুর করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘বজ্রকণ্ঠ’ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন।

শহিদুল ইসলামের লেখা ও সুজেয় শ্যামের সুরে ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ গানটিতে অজিত রায়ের সঙ্গে কোরাসে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ফকির আলমগীর। এ ছাড়াও শহিদুল ইসলামের লেখা ও সুজেয় শ্যামের সুরারোপিত ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’ এমনকি শহিদুল ইসলামের লেখা ও অজিত রায়ের সুরে ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’, গোবিন্দ হালদারের লেখা ও সমর দাসের সুরে ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ সহ অসংখ্য গানে কোরাসে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কিংবদন্তি এই শব্দ সৈনিক।

একাত্তরে গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘শোন একটি মুজিবুরের থেকে লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’ গানটি সুর করে গেয়েছিলেন অংশুমান রায়, শ্যামল মিত্র গেয়েছিলেন ‘বাংলার হিন্দু বাংলার মুসলিম : আমরা সবাই বাঙালী’, ভূপেন হাজারিকা গেয়েছিলেন ‘জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ জয় জয় মুক্তিবাহিনী’। ফকির আলমগীরসহ অন্যরা কোরাসে গাইতে থাকলেন সঞ্জীব চৌধুরীর ‘বিচারপতি তোমার বিচার’, সিকান্দার আবু জাফরের লেখা ও শেখ লুতফর রহমানের সুরে ‘জনতার সংগ্রাম চলবে’, আবু বকর সিদ্দিকের লেখা ‘বিপ্লবের রক্তে রাঙা’ কিংবা স্বাধীন সরকারের সুরে ‘ব্যারিকেট, বেয়নেট, বেড়াজাল’, আবদুল লতিফের ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’সহ অসংখ্য জীবনের গান। মহসীন রেজার কথায় ও রথীন্দ্র নাথ রায়ের কণ্ঠে ‘ছোটদের বড়দের সকলের’ গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন। রবীন্দ্র/নজরুলের দেশাত্মবোধক গানও কিন্তু পর্যাপ্ত ভূমিকা পালন করে।

বিশেষ করে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ এবং বাঙালীর প্রাণপ্রিয় জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিসহ বিভিন্ন গান সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস আর প্রেরণা জুগিয়েছিল।

দুই ফ্রন্টে অস্ত্র হাতে হয়েছে স্বাধীন পতাকা অর্জনের যুদ্ধ। এক, সীমান্তে। দুই, দশের অভ্যন্তরে বহিরাগত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে। তৃতীয় ফ্রন্টও কিন্তু ছিল ব্যাপক সক্রিয়। তারা বাংলাদেশের কোটি কোটি মুক্তিপাগল জনগণ। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তারা পরোক্ষভাবে, মদদ জুগিয়েছে যুদ্ধ জয়ের। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র ছিল শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের আরেকটি সেক্টর। ‘শব্দ সৈনিক’রা ছিল দেশপ্রেমিক যোদ্ধা।

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫

১৭/১২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: