মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ আগস্ট ২০১৭, ৯ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর ২০১৫
  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

কৈশোরের আরও স্মৃতি

(২৭ অক্টোবরের পর)

ফারুকের মুশকিল আসান হয়ে গেলাম আমি। তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন সিলেটে জজ আদালতে উকিল। তিনি এই বিয়েতে কোন ভূমিকা রাখতে গড়রাজি হলেন। তাই ফারুকের অনুরোধ আমার আব্বাকে দিয়ে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফারুক আমাদের বাড়িতে সকলের প্রিয়পাত্র ছিল। আমাদের ভাইবোনদের পছন্দের ভাই এবং আমার আম্মা-আব্বারও ঘনিষ্ঠ। আব্বাকে আমি সমস্যাটি বলতেই বললেন, ফারুকের আত্মীয় উকিল চাচার সঙ্গে তিনি প্রথমে কথা বলবেন। তারপর ঠিক করবেন কিভাবে সমস্যার সমাধান মিলে। আব্বার উকিল বন্ধু সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি এতে সংশ্লিষ্ট হবেন না। এমনকি বিয়ে হলে তাতে অংশও নিবেন না। সেই প্রেক্ষিতে আমার আব্বা ফারুকের অভিভাবক বনে গেলেন। ফারুকের বিয়ে ঠিক হলো এবং সম্ভবত আমাদের বাড়ি বা মোবারক হোটেল থেকে বরযাত্রীরা ফারুককে নিয়ে তার শ্বশুর বাড়িতে গেলেন। ফারুক অল্প বয়সে বিয়ে করে অত্যন্ত সুখী ও উন্নত জীবনযাপন করে। সে উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেয় এবং প্রুডেনশিয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পূর্ব পাকিস্তান এবং পরে বাংলাদেশের দফতরে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে। ফারুকের সব কিছুতেই তাড়া ছিল। সে ঢাকায় শ্যামলীতে একটি বাড়ি নির্মাণ করে সম্ভবত ষাটের দশকে। তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর সেও ইহধাম থেকে বিদায় নেয় আশির দশকে। তার ছেলেমেয়েরা অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী।

নাইওরপুলে ঐ সময় মৎস্য ব্যবসায়ী বস্তির কিশোরদের সঙ্গে আমার খুব সখ্য সৃষ্টি হয়। এই বস্তিতে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ মোটামুটি কম ছিল এবং আমি তাদের শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির প্রয়াস চালাই। এদের মতো এত বন্ধুবৎসল গোষ্ঠী আমি খুবই কম দেখেছি। আমার অনেক বন্ধু তাদের লেখাপড়া কার্যক্রম চালিয়ে যায় এবং সেই এলাকা থেকে আমার সমসাময়িক দু’একজন প্রথমবারের মতো সরকারী চাকরিতে যোগ দেয়। এই বস্তির সঙ্গে আমার পরিচয়ের আর একটি বিষয় ছিল। তারা মোটামুটি নাইওরপুলের মসজিদের দেখাশোনা করতেন এবং তাদের মধ্যেই এই মসজিদের মুসল্লিদের সিংহভাগ ছিলেন। আমি এই মসজিদে (তখন এটিই ছিল আমাদের নিকটস্থ মসজিদ) নামাজ আদায় করতাম, বিশেষ করে রমজান মাসের তারাবি নামাজ পড়তাম। কিছুদিন আমি মসজিদের এশা ও ফজরের মুয়াজ্জিনের দায়িত্বও নিই। তখন মসজিদে ইমাম নিয়মিত হাদিয়া পেতেন না। তিনি প্রায় নিয়মিতভাবে ফজর, মাগরিব, এশা এবং জুমা ও রমজানে তারাবি নামাজে ইমামতি করতেন। রমজানে শেষ তারাবির দিনে তাকে কিছু বিশেষ হাদিয়া দেয়া হতো।

১৯৪৬ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে মুসলিম লীগ তাদের জনপ্রিয়তার উত্তম স্বাক্ষর রাখে। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে সমস্ত মুসলমানে আসন মুসলিম লীগ দখল করে, যেখানে কংগ্রেস পাঁচটি সাধারণ আসনে বিফল মনোরথ হয়। প্রাদেশিক নির্বাচনে অবশ্য মুসলিম লীগ তেমন ঐক্যের পরিচয় দিতে পারেনি। সেখানে সমগ্র ভারতবর্ষে ৪৯৪টি মুসলমানদের আসনে মুসলিম লীগ ৪৩৯টি দখল করে। আসামে মুসলিম লীগ যথেষ্ট ভাল করে এবং সিলেটে ১৯টি মুসলমান আসনের মধ্যে ১৭টি মুসলিম লীগ দখল করে। তবে আসামে কংগ্রেস সরকার গঠিত হয় এবং এই সরকারে সিলেটের একজন জমিয়তে ওলামা-এ-হিন্দ দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি গোলাপগঞ্জের আবদুর রশিদ এবং আর একজন কাছাড়ের মুসলিম আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধি আবদুল মতলিব মন্ত্রী হন। কংগ্রেসের বরদলই সরকার বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু করে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যেসব চাষী আসামের বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে থাকে তাদের অভিবাসন বন্ধ করে দেয়। নানা আবেদন এবং প্রতিবাদ করেও এই নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া গেল না। পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনের উদ্দেশ্যে কংগ্রেস সরকার নানা জায়গায় গুলিবর্ষণ করে। এই অত্যাচার, নির্যাতন এবং বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আসাম মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের সমর্থন নিয়ে ১৯৪৭ সালের ১০ মার্চ আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। এই আইন অমান্য আন্দোলন ১৯৪২ সালের কংগ্রেস পরিচালিত ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের চেয়েও দুর্বল ছিল। অবশ্য মুসলিম লীগের বড় নেতারা আসাম এবং সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় গ্রেফতার হন। সিলেটে প্রতিদিনই আইন অমান্য আন্দোলন উপলক্ষে সভা, শোভাযাত্রা ইত্যাদি হতে থাকে। ২৩ এপ্রিল শোভাযাত্রা জেলা প্রশাসক দফতরের সামনে চৌমোহনায় পৌঁছে সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক পতাকাটিকে দফতরের চূড়া থেকে নামিয়ে নেবে। মুসলিম লীগ নেতা আবদুল বারি (ধলা) স্থাপনার ছাদে উঠে পড়লেন এবং তার সঙ্গে থাকেন ছাত্রকর্মী সরকারী স্কুলের ছাত্র আমাদের এক বছরের কনিষ্ঠ আকদ্দস আলী। তারা পতাকাটি নামিয়ে সেখানে মুসলিম লীগের পতাকা ওড়ালেন। প্রশাসন ব্যাপারটা আঁচ করার আগেই ঘটনাটি ঘটে গেল। ডেপুটি কমিশনার ডামব্রেক সাহেব বুদ্ধিমানের মতো কোন আগ্রাসী অবস্থানে গেলেন না। মুসলিম লীগ পতাকা নামিয়ে ইউনিয়ন জ্যাক ওড়ানো হলো এবং তিনি লুণ্ঠিত ইউনিয়ন জ্যাক উদ্ধারে ব্যস্ত হলেন। অবশেষে অপরাহ্ণে তিনি সেটা ফেরত পেলেন। অপরাহ্ণে গোবিন্দ পার্কে রুটিনমতো সভা শুরু হলো। ডামব্রেক সাহেব তার দফতর থেকে পদব্রজে সভায় আসলেন এবং আমার আব্বাকে তার পতাকা উদ্ধারে সাহায্য করতে বললেন। আব্বা অনুনয়-বিনয় করে এবং ভয় দেখিয়ে বারি সাহেবকে পতাকাটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফেরত দিতে বাধ্য করলেন। বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়ে গেল। ২৪ এপ্রিল এক শোভাযাত্রা কোতোয়ালি থানায় ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে মুসলিম লীগের পতাকা উড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হয়। থানায় রাষ্ট্রীয় পতাকা নামাবার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করা হয় বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে সিলেট শহরের মোহাম্মদ আলকাস নামক এক যুবক শহীদ হয়। তাই আইন অমান্য আন্দোলনে সিলেটে অন্তত একদিন গুলিবর্ষণ হয় এবং একজন লীগ কর্মী শহীদ হন। আমি সেদিন কোন শোভাযাত্রায় ছিলাম না। কারণ আমার ও আমার বড় ভাইয়ের জলবসন্ত হয় এবং আমরা কষ্টে কাতর হয়ে শোবার খাটে মশারির নিচে অবস্থান নিয়েছিলাম। চলবে...

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর ২০১৫

২৮/১০/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ:
ঘূর্ণিঝড়, পাহাড় ধস, বন্যা ॥ দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না || বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের শিকার পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান || বিটি প্রযুক্তির ব্যবহার দেশকে কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য এনে দিয়েছে || রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ পুরো ফেরত পাওয়া যাবে || গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক ১৮ আসামিকে ফেরত আনার চেষ্টা || অনেক সড়ক মহাসড়ক পানির নিচে মহাদুর্ভোগের শঙ্কা || খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ’২১ সালের মধ্যে বিলিয়ন ডলার রফতানি || নূর হোসেনের দম্ভোক্তি উবে গেছে, কালো মেঘে ছেয়েছে মুখ || জবাবদিহিতা না থাকা ও রাজনৈতিক প্রভাবে পাউবো প্রকল্পে দুর্নীতি || রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে আজ চূড়ান্ত রিপোর্ট দিচ্ছে আনান কমিশন ||