১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

লাতিন আমেরিকার অর্থনীতিতে কেন এই স্থবিরতা


বেশ কয়েক বছর ধরে জোয়ারে ভেসে চলার পর লাতিন আমেরিকার অর্থনীতিতে এখন ভাটা চলছে। একটা স্থবিরতা এসে গ্রাস করেছে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতিতে জোয়ার এসেছিল চীনের শিল্পায়নের সময়। এই শিল্পায়ন ওই দেশগুলোতে সোনালি দশকের সূচনা করেছিল। তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিশেষত খনিজ সম্পদ, তেল ও খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ২০১২ সাল পর্যন্ত এক দশকে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছিল বার্ষিক ৪.১ শতাংশ হারে। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজেও কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। ৬ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের জোয়াল থেকে মুক্তি করা হয়েছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রসার ঘটেছিল।

সেই সুদিন এখন ফুরিয়ে গেছে। লাতিন আমেরিকার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সঙ্কুচিত হতে হতে থেমে এসেছে। গত বছর প্রবৃদ্ধি হয়েছিল কোনক্রমে মাত্র ১.৩ শতাংশ। এ বছর তা মাত্র ০.৯ শতাংশ হবে বলে আইএমএফের ধারণা। এভাবে টানা পাঁচ বছর প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে কমেছে। অর্থাৎ লাতিন আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ থেমে গেছে। এখন সেখানে বছরে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ করে নতুন সাধারণ প্রবৃদ্ধি ঘটবে। এতে সাম্প্রতিককালে অর্জিত সামাজিক সুফল নস্যাৎ হয়ে যাবে। দারিদ্র্য হ্রাস পেতে পেতে ইতোমধ্যে তা থেমেও গেছে।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, ব্যাপারটি কি? গোলমালটা কোথায়? এর তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা হলো, এ অঞ্চলের আমদানি ও রফতানি পণ্যের দামের অনুপাত হ্রাস পেয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পণ্য মূল্য কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল।

কিন্তু গত বছর তা দারুণভাবে হ্রাস পায়। ২০১১ সাল থেকে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ মন্থর হয়ে পড়েছে। আইএমএফের মতে বিনিয়োগের ব্যাপারটা পণ্যমূল্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। অর্থলগ্নি বাজারও সে অনুযায়ী আচরণ করেছে। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে এ অঞ্চলের প্রধান প্রধান মুদ্রার ডলারের সঙ্গে বিনিময়মূল্য গড়ে ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বেশিরভাগ শেয়ার বাজারে দর পড়তির দিকে।

আগে অর্থনীতির গতিপথ হঠাৎ করে এভাবে পাল্টে গেলে আতঙ্ক সৃষ্টি হতো। মূলধন বা পুঁজি বাইরে পাচার হয়ে যেত। এবার পরিস্থিতিটা অন্ততপক্ষে আংশিক ভিন্ন হয়েছে। উন্নততর ম্যাক্রো অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণের কারণে অনেক দেশ সুন্দরভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। চিলি, কলম্বিয়া ও পেরু দায়িত্বশীলভাবে তাদের অর্থনীতি পরিচালনা করেছে এবং এখনও প্রবৃদ্ধি ঘটে চলেছে। তবে তা ঘটছে অনেক বেশি মন্থরগতিতে। তেমনি অবস্থা বলিভিয়ারও। সেখানকার বামপন্থী সরকার অপেক্ষাকৃত বিচক্ষণতার সঙ্গে অর্থনীতি পরিচালনা করছে। মেক্সিকো, সেন্ট্রাল আমেরিকা ও ডোমিনিকাল রিপাবলিক হল নিট পণ্য আমদানিকারী দেশ, আগামী দিনগুলোতে এরা গড় প্রবৃদ্ধির চাইতে ভাল কিছু অর্জন করতে উদ্যত।

প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হলো ব্রাজিলের। ২০০৬ সালেও সেদেশের অর্থনীতিতে বেশ গতিবেগ ছিল। কিন্তু এখনকার অবস্থা ভিন্ন। এ বছর অর্থনীতি সরকারের হিসেবে ১.২ শতাংশ সঙ্কুচিত হবে। বেকারত্ব তো বেড়েই চলেছে। আর্জেন্টিনায় দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা চলছে। সেখানে মুদ্রাস্ফীতির হার এখন ডাবল ডিজিটে। ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি এ বছর সঙ্কোচন ঘটবে ৭ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়াবে ৯৫ শতাংশ। কালোবাজারে দেশটার মুদ্রার মূল্য গত জানুয়ারি মাসে এক ডলারের জায়গায় নেমে এসেছিল অর্ধেকে ।

লাতিন আমেরিকার অর্থনীতির তেজী ভাবটা সম্পূর্ণ মুছে যায়নি। তবে সেটা পুরোপুরি কাজেও লাগানো হয়নি। লাতিন আমেরিকার বিনিয়োগের স্তরটা বরাবরই কম ছিল। সেই স্তুরটি অবশ্য উন্নীত হয়েছে। ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলটির অর্থনীতি অল্প সময়ের জন্য নিম্নগামী হলেও ২০০৮-৯ সালের মহামন্দা পার হয়ে আসতে পেরেছে। তবে আর্থিক ও মুদ্রানীতি এখনও তেমন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারেনি। পেরু ও চিলির মতো আংশিক ব্যতিক্রম ছাড়া আর কোন সরকারের আর্থিক ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির মন্থরতা রোধ করার এখন কোন সুযোগ নেই।

দ্রুততর প্রবৃদ্ধিতে ফিরে যেতে হলে লাতিন আমেরিকাকে অবশ্যই তার অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। সোজা কথায় বলতে গেলে এই অঞ্চলের দেশগুলো সামগ্রিকভাবে রফতানি করে বেশ কম। তেমনি সঞ্চয় ও বিনিয়োগও করে খুব সামান্য। এদের অর্থনীতি যথেষ্ট মাত্রায় বিভিন্নমুখী নয় এবং এদের অধিকাংশ শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অনুৎপাদনশীল। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে গত ১৫ বছরে। চীন ও সাধারণভাবে উদীয়মান বিশ্বের উত্থান, যার কারণে এদের কিছু কিছু সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের গত মে মাসের রিপোর্টে এই অভিমত ব্যক্ত হয়েছে। ব্যাংক মনে করে, চীন পণ্য রফতানিকারক হিসেবে লাতিন আমেরিকার ভূমিকাকে জোরদার করে তুললেও কারখানাজাত পণ্যের রফতানিকারক হিসেবে এদের আপেক্ষিক গুরুত্ব খর্ব হয়েছে। এর আংশিক কারণ হলো লাতিন আমেরিকার সঞ্চয়ের হার কম। এই হার জিডিপির ২০ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঞ্চয়ের হার ৩০ শতাংশ। এই অঞ্চলটি বিদেশী সঞ্চয় নিয়ে আসার ওপর নির্ভর করেছে। তার অর্থ অর্থনীতিতে তেজীভাব থাকার সময় এর মুদ্রাগুলোর মূল্যমান অন্য অবস্থায় যা হতে পারত, তার চেয়ে বেশি থেকেছে। এর ফলে পণ্য বহির্ভূত অনেক ব্যবসা অপ্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়েছে।

তাছাড়া লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর উৎপাদনশীলতাও হ্রাস পেয়েছে। এই অঞ্চল এবং বিশ্বের অবশিষ্ট অংশের মধ্যে উৎপাদনশীলতার ব্যবধান বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে এটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে অর্থনীতিতে। এর জন্য অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটছে না।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট