২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কাইয়ুম চৌধুরীর রেখালেখ্য


এদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী দীর্ঘ ষাট বছরের নিরলস চিত্র সাধনার মধ্যদিয়ে হয়ে উঠেছিলেন এদেশের শীর্ষ শিল্পীদের অন্যতম। চারুকলা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় আবর্তনের ছাত্র কাইয়ুম চৌধুরী দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ¦ল এক শৈলী নির্মাণ এবং বিষয়ের গুণে নিজস্ব ভুবন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এজন্যই ছবিতে শিল্পীর স্বাক্ষর না থাকলেও চিত্রকলার বোদ্ধা যে কোন দর্শকই ছবি দেখেই বলে দিতে পারেন এটি শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাজ। বাস্তবধর্মী অসংখ্য ছবি সৃজনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম পুরোধা শিল্পী যাঁর চিত্রপটে কোন ধরনের বিমূর্তায়নের ছায়া নেই বা নির্বস্তুক বিষয় নিয়ে যিনি ছবি আঁকেননি।

বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর তিরাশিতম জন্মবার্ষিকী বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাস এই মার্চেই। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এ উপলক্ষে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের সচিত্রকরণে ব্যবহৃত তাঁর মূল ড্রয়িংসমূহ নিয়ে ‘কালি ও কলমে কাইয়ুম চৌধুরীর রেখালেখ্য’ শীর্ষক নির্বাচিত রেখাচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এ্যামিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিল্পী রফিকুন্নবী এবং শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী যৌথভাবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। এ প্রদর্শনীতে মোট ড্রয়িং-এর সংখ্যা ১২২টি। সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের জন্মলগ্ন থেকেই শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর মননে ও চিন্তনে এটি দৃষ্টিনন্দন ও ব্যতিক্রমী একটি পত্রিকা হয়ে উঠেছিল। পত্রিকাটির অঙ্গসৌষ্ঠবে যে পারিপাট্য দেখা যায় সেক্ষেত্রে শিল্পীর শিল্প নির্দেশনা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত দৃষ্টিনন্দন ব্রোশিওরে কালি ও কলম-এর সম্পাদক আবুল হাসনাত যথার্থই উল্লেখ করেছেনÑ “কালি ও কলমের দীর্ঘ এগারো বছরের বন্ধুর যাত্রাপথে তিনি গল্প, কবিতা, উপন্যাস বা প্রবন্ধে অক্ষরবিন্যাসের মধ্য দিয়ে যে সচিত্রকরণ করেছেন, তার সংখ্যা কম নয়। একদিকে তাঁর রেখা যেমন দীপ্তিময়, উজ্জ্বল, সৃজনধারার অনুষঙ্গী, তেমনি তাঁর রেখার প্রাণময়তা, শক্তিময়তা ও আবেগ প্রাণস্ফুর্তিতে উজ্জ্বল। এছাড়া যেসব প্রবন্ধের নামলিপি করেছেন, তাতেও কাইয়ুম চৌধুরীর অক্ষরবিন্যাসের ধীশক্তি নানাভাবে উন্মেচিত। এ সব সৃজনে তাঁর বহু ভাবনা ও জিজ্ঞাসার ছাপ আছে। তাঁর সচিত্রকরণের দুটি বৈশিষ্ট্য আমাদের কাছে খুবই প্রণিধানযোগ্য বলে মনে হয়। একটি হলোÑ যে গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা, কবিতা ও প্রবন্ধের তিনি সচিত্রকরণ করতেন তার বিষয়কে তিনি প্রাধান্য দিতেন। বিষয় যেন পাঠকের হৃদয়-মনে চিন্তা-চেতনায় সহজ দৃষ্টিপাতে ধরা দেয়, সেদিকে তাঁর তীক্ষè মনোযোগ ছিল। সে জন্য এ সচিত্রকরণ হয়ে উঠত অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, কোন ধরনের প্রতীকাশ্রয়ী বা বিমূর্তায়নের ছোঁয়া তাঁর এ সৃজনে প্রাধান্য বিস্তার করেনি।”

রেখার যে অপরিসীম শক্তি তা শিল্পীর রেখালেখ্য দেখলেই টের পাওয়া যায়। কাইয়ুম চৌধুরীর রেখা যেন চলে বহতা নদীর মতো। অত্যন্ত কম রেখাবিন্যাসে তিনি সৃজন করেছেন অজস্র্র ফর্ম। বিমূর্তায়নের ছিঁটেফোঁটাও না চর্চা করে কত সহজে মানুষ, জীব-জন্তু, পরিবেশ, নিসর্গ, নৌকা, ফুল ইত্যাদি দিয়ে অন্য কবি বা লেখকের গল্প কবিতা তাঁর আঁচড়ে হয়ে ওঠে অনবদ্য। মাত্রা যোগ হয় শিল্পীর পরিমিত রেখা বিন্যাসে।

আবার রঙের ব্যবহারে এ শিল্পীর কোনই কার্পণ্য নেই। নানাবিধ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর রং নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী যেন হোলিখেলায় মেতে ওঠেন। মুক্তিযোদ্ধা এ শিল্পীর কাজে রক্ত লাল আর সবুজ যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রকৃতির প্রতীক সবুজের বহুবিধ ব্যবহারে তাঁর ক্যানভাস মূর্ত হয়ে জানান দেয় সবুজ চাদরে ঢাকা এ রূপসী বাংলার অপরূপ রূপ। কত ধরনের সবুজ যে তাঁর তুলিতে ব্যবহৃত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বিশিষ্ট রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর এক লেখায় তৎকালীন পূর্ব-বাঙলার সবুজ সৌন্দর্য প্রতিভাত হয়েছে এভাবে- পূর্ব-বাঙলার সৌন্দর্য দূরতে নয় পূর্ব-বাঙলার মাঠের শেষে মাঠ, মাঠের শেষে সুদূর গ্রামখানি আকাশে মেশে’ নয়। সেখানে মাঠের শেষেই ঘন সবুজগ্রাম আর গ্রামখানির উপর পাহারা দিচ্ছে সবুজের উপর সাদা ডোবা কেটে কেটে সুদীর্ঘ সুপারি গাছ। আর সে সবুজ কত না আভা, কত না আভাস ধরতে জানে। কচি ধানের কাঁচা-সবুজ, হলদে সবুজ থেকে আরম্ভ করে আম, জাম, কাঁঠালের ঘন সবুজ, কৃষ্ণচূড়া- রাধাচূড়ার কালো সবুজ। পানার সবুজ, শ্যাওলার সবুজ, কচিবাঁশের সবুজ, ঘনবেতের সবুজ। এত সবুজের সমারোহ যেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর ক্যানভাসেও আমরা পেয়ে যাই। শিল্পীর চিত্রপটে উঠে এসেছে আবহমান বাংলার অনির্বচনীয় সৌন্দর্য।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৫৪ সালে গবর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। একুশে পদক পান ১৯৮৬ সালে। ৩৭ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষকতা করার পর ১৯৯৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালের নবেম্বরে বাংলাদেশের শিল্পকলা ইতিহাসের এই প্রাণপুরুষের জীবনাবসান ঘটে।