১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পাঠ্যসূচীতে বীরাঙ্গনাদের কথা


পাঠ্যসূচীতে বীরাঙ্গনাদের কথা

বিজয় দিবস উপলক্ষে রাইজিং পাথ অব ওয়ার হিরোইনস ও নারী সাংবাদিক কেন্দ্র আয়োজিত এক আলোচনা সভায় গত ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪ মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে, বীরাঙ্গনাদের পর্যায়ক্রমে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। গেজেট আকারে প্রকাশ করার জন্য তাদের নামের তালিকা আহ্বান করা হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সবাই এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পর হলেও রাষ্ট্র এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এর পরে গত ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪ সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ধর্ষণের শিকার নারী ও যুদ্ধশিশুদের ‘জাতীয় বীর’ বলে অভিহিত করেন এবং তাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’র সম্মান দেয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগের কাহিনী স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী তেতাল্লিশ বছরেও কেন বীরাঙ্গনাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হয়নি সে ব্যাপারে উচ্চ আদালত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চায়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে বীরাঙ্গনাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’র স্বীকৃতি দেয়ার দাবি উঠে আসছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সেটি আরও ব্যাপকতা পাচ্ছে।

একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে এসব নারী নিজেদের মানসিক ও শারীরিকভাবে যুদ্ধ করেছেন। কেবল তাই নয়, যুদ্ধের পরবর্তী বছরগুলোয়ও সেসব দুর্বিষহ স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র দ্বারা বার বার অপমানিত আর নিগৃহীত হয়েছেন। সেসব নারীদের জন্য এ উদ্যোগ হয়ত বা এখন আর কোন তাৎপর্য বহন করবে না। অনেকে এখন জীবনের শেষপ্রান্তে, আবার অনেকেই নিগ্রহ আর যন্ত্রণা নিয়েই এ ভুবন ত্যাগ করেছেন। কিন্তু জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য একটি বড় তাৎপর্য বয়ে আনতে পারে। এতদিন পর রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব নারীদের তাদের সত্যিকার স্বীকৃতি দেয়ার এই সুযোগ।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে, যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংগ্রামে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা আর ধর্ষণকে যুদ্ধেরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিজয়ীপক্ষ সবসময় পরাজিতপক্ষের নারীকে বিজিত সীমানার মতো নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে, এভাবে নারী হয়ে দাঁড়ায় ‘ট্রফি অব ওয়ার’। ঠিক তেমনি যুদ্ধের বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধের সময় তাদের প্রতিপক্ষের নারীদের ওপর নিজেদের অধিকার আছে বলেই ধরে নেয়। নারীর শরীর বিবেচিত হয় একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে, ধর্ষণের মাধ্যমে যা জয় করতে সৈন্যরা উজ্জীবিত হয়। এর আরেকটা উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ভয় দেখিয়ে, সে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা। এই ধারাবাহিকতায় যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ যুদ্ধের একটি সুনির্দিষ্ট ও বহুল ব্যবহৃত রণকৌশল হিসেবে বিবেচিত ও প্রয়োগ হয়ে আসছে। এর কারণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজব্যবস্থায় যুদ্ধ হচ্ছে একটি পুরুষালি ধারণা যেখানে তারা দেশ আর জাতিকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করবে, নারীদের বিবেচনা করা হয় সে জাতি বা রাষ্ট্রের সম্মান, সংস্কৃতির ধারক এবং পরবর্তী প্রজন্মের বাহক হিসেবে। তাই নারীর অবমাননা পুরো জাতি রাষ্ট্রের অবমাননা বলে মান্য করা হয়, নারীর সম্ভ্রম রক্ষা যেখানে জাতীয় দায়িত্ব আর এ দায়িত্ব মূলত সে জাতির পুরুষদের! জাতীয় জীবনে নারীর অবস্থানের এ পুরুষতান্ত্রিক চিত্রায়ণ নারীকে আরও বেশি হুমকির মধ্যে ফেলে। কেননা প্রতিপক্ষের জাতীয় মনোবলে চিড় ধরানোর, আত্মগরিমায় আঘাত হানার অস্ত্র হিসেবে ধরা হয় ধর্ষণ আর যৌন সহিংসতাকে। পাশাপাশি নারীকে ধর্ষণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ জাতির ওপর নিজ জাতির বিস্তার লাভ করাও উদ্দেশ্য। অনেক গবেষক যাকে ‘জেনেটিক ইম্পেরিয়ালিজম’ বলে উল্লেখ করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী স্থানীয় রাজাকার, আলবদর, আল-শামসদের সহায়তায় এ কৌশলটিই ব্যবহার করেছে। প্রায় দু’ লাখ নারী এ সময় ধর্ষিত হয় এবং পাক সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নানা অমানবিক নির্যাতন আর যন্ত্রণা সহ্য করে। এসব নারীদের কোন নির্দিষ্ট বয়স ছিল না। সুজান ব্রাউনমিলার তাঁর বই ‘এগেইনস্ট আওয়ার উইল : ম্যান, ওমেন, এ্যান্ড রেপ’-এ উল্লেখ করেছেন যে, আট বছরের শিশু থেকে পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা কেউ রেহাই পায়নি। সব ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণীর নারীরা-এর শিকার হয়।

প্রায় পঁচিশ হাজার নারীকে জোরপূর্বক অন্তঃসত্ত্বা করা হয় সে সময়। কিন্তু যুদ্ধশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম, ত্যাগ আর অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মহিমান্বিত করা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে সেভাবে গৌরবান্বিত করা হয়নি। তাদের প্রতি দীর্ঘ নয় মাসে যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে সেসব বিষয়ে বিশদভাবে আলোকপাত করা হয়নি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দেয়া হলেও তা সমাজে তাদের মর্যাদাবৃদ্ধি করার পরিবর্তে বরং তাদের চিহ্নিত করে দেয় যুদ্ধকালীন ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার হিসেবে। যুদ্ধের সময় নির্যাতিত এসব নারীরা তাই যুদ্ধপরবর্তী সময়ে হয়ে পড়ে নিগৃহীত, পরিত্যক্ত। আমাদের সমাজে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত বদ্ধমূল ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি তাদের করে দেয় একঘরে। অন্যদিকে রাষ্ট্র থেকেও তাদের নির্যাতন, অবমাননার বিষয়গুলো সঠিকভাবে সামনে না এনে বরং চাপা দেয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি আর সামান্য হলেও কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী প্রজন্মও নানাভাবে সে স্বীকৃতির অংশীদার হয়েছেন কিন্তু বীরাঙ্গনাদের আমরা স্মরণ করেছি কেবল বিজয় দিবস কিংবা স্বাধীনতা দিবসে। অথচ তাদের যুদ্ধের শিকার বিবেচনা না করে, শুরু থেকেই তাদের যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা গেলে এসব নারীদের অবদানের প্রকৃত মূল্যায়ন ঘটত।

আন্তর্জাতিকভাবেও এসব সহিংসতা সঠিকভাবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বেশ সময় লেগেছে।

পূর্বে যুদ্ধকালীন ধর্ষণসহ অন্যান্য যৌন সহিংসতাকে এড়ানো সম্ভব নয় বলেই বিবেচনা করা হতো। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯) যুদ্ধকালীন ধর্ষণ ও জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করে। তবে ১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারের উদ্দেশ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ধর্ষণকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গণহত্যার একটি উপাদান বলে সংজ্ঞায়িত করে একটি মাইলফলক তৈরি করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধিতে নারীর প্রতি ব্যাপক মাত্রার ও পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। অন্যদিকে সাবেক যুগোসøাভিয়ায় সংঘটিত অপরাধসমূহের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ধর্ষণ ও যৌন দাসত্বকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, একটি একক ধর্ষণের ঘটনাও মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ২০০৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে যেখানে উল্লেখ করা হয় যে, ধর্ষণসহ অন্যান্য যৌন সহিংসতা যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা গণহত্যার উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইন, ১৯৭৩, যার ভিত্তিতে বর্তমানে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে, সেখানে ধর্ষণ, নির্যাতন, অন্যান্য অমানবিক আচরণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার উপাদান হিসেবে সরাসরি চিহ্নিত না করলেও এ আইন এগুলোকে যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার উপাদান হিসেবে বিবেচনার যথেষ্ট সুযোগ রেখেছে। এ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এরইধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বেশ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে শাস্তি ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতাযুদ্ধের তেতাল্লিশ বছর পরে হলেও যুদ্ধে যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের যদি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করে, তবে তা এক্ষেত্রে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান বিশ্বে এখন পর্যন্ত কোন দেশে যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণের শিকার নারীদের ‘যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছেÑ এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায় না। বাংলাদেশ যদি এ স্বীকৃতি দেয় তবে তা হবে বিশ্বে প্রশংসিত দৃষ্টান্ত।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র