ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের (ডানে) সঙ্গে মিরাজ ও রিশাদ
পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস পর আবারও ওয়ানডে ফরম্যাটে ফিরছে বাংলাদেশ। যে সিরিজটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণও। কারণ সামনে রয়েছে বিশ্বকাপে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের নানা হিসাব-নিকাশ। ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ সরাসরি খেলতে হলে বাংলাদেশকে কঠিন চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হবে। সেই মিশন শুরু হচ্ছে পাকিস্তানকে দিয়ে। আইসিসি-এর শর্ত পূরণ করে ২০১৫, ২০১৯ ও ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দীর্ঘ সময় ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের ৭ নম্বরে থাকা দলটি এখন নেমে গেছে ১০ নম্বরে। রেটিং পয়েন্ট ৭৬। পাকিস্তানের বিপক্ষে তাই হোম সিরিজটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে র্যাঙ্কিংয়ের সেরা আট দলের মধ্যে থাকতে হবে। আর মেহেদি হাসান মিরাজের দল সেটা পারবে বলেই বিশ্বাস টাইগারদের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলের। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেই সেই যাত্রা শুরু করতে চান সাবেক অধিনায়ক, ‘যতগুলো সিরিজ আমরা দেশে খেলব, চেষ্টা করব সবগুলোতেই জয় তুলে নিতে। এওয়ে ট্যুরে কন্ডিশন কঠিন হয়, তাই ঘরের মাঠে সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে বড় ব্যবধানে জিততে চাই। ৩-০ জয় হলে আমাদের জন্য অনেক লাভ। কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। এই সিরিজ দিয়েই সেটা শুরু করতে চাই।’
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ টি২০ ও টেস্ট ফরম্যাটেই ব্যস্ত ছিল। ওয়ানডেতে খেলার সুযোগ খুব কম মিলেছে। সিরিজের আগে বিসিএলের চার ম্যাচ আর গত ৭ মার্চ একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে নাজমুল হোসেন শান্তরা কিছুটা ছন্দ ফিরিয়ে এনেছেন। আশরাফুল যোগ করেন, ‘অনেকদিন পর ওয়ানডে খেলছি। বিসিএল আর প্র্যাকটিস ম্যাচগুলো খুব কাজে লাগবে। আমরা তিন বিভাগেই সেরাটা দিতে চাই।’ একসময় ওয়ানডে ছিল বাংলাদেশের শক্ত ফরম্যাট ২০১৭-১৮ সালে ইংল্যান্ডকে হারানোর মতো স্মৃতি রয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফলাফল খারাপ। শেষ ১৫ ম্যাচে মাত্র ৩ জয়। আশরাফুল স্বীকার করেন, ‘শেষ ১০ ম্যাচে ৭ বারই আমরা ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে পারিনি। টেস্ট ও টি২০তে প্লেয়াররা দারুণ করেছে, কিন্তু ওয়ানডেতে এখনো সেট হতে পারছি না।’ পাকিস্তানের বিপক্ষে ইতিহাস বলছে, ৩৯ ওয়ানডেতে বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র ৫টি। সর্বশেষ ৫ ম্যাচে জয় মাত্র একটি। তবু আশরাফুলের চাওয়া স্পষ্টÑযে কোনো মূল্যে বড় জয়। এই সিরিজ শুধু জয়ের জন্য নয়, ২০২৭ বিশ্বকাপের স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করার প্রথম ধাপ। আগামি বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপে দুই আয়োজকসহ ১৪ দল অংশগ্রহন করবে। সরাসরি সুযোগ পাবে র্যাঙ্কিংয়ের সেরা আট দল। বাকি দলগুলোকে খেলতে হবে বাছাইপর্ব। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে ছাড়াও র্যাঙ্কিংয়ের সেরা আট দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে।
অর্থাৎ স্বাগতিকরা যদি সেরা আটের মধ্যে থাকে, তাহলে র্যাঙ্কিংয়ের ১০ নম্বর পর্যন্ত দলও সরাসরি সুযোগ পেতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে থাকতে না পারলে অপেক্ষা করছে কঠিন বাছাইপর্ব। উল্লেখ্য, গত বিশ্বকাপে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ও বাছাই পেরিায়ে উঠতে পারেনি। এদিকে জিম্বাবুয়ে স্বাগতিক হিসেবে সরাসরি জায়গা পেয়ে যাওয়ায় বাস্তবে বাংলাদেশ যেন ১১ নম্বর অবস্থানেই রয়েছে। ফলে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের আগে অন্তত ৯ নম্বরে উঠতে না পারলে বাছাইপর্ব খেলতেই হবে মিরাজদের। সব মিলিয়ে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার পথটা বাংলাদেশের জন্য বেশ জটিল। প্রতিটি সিরিজ, প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ। পুরো দল নতুন শুরুর অপেক্ষায়। অবশ্য এমন শুরু অনেকবারই হয়েছে। বিরতি কিংবা টানা ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করে দল।
কখনো সফল হয়। কখনো হয় না। আবার কখনো ব্যর্থতার চাদরে মুড়ে থাকে। গল্পগুলো যেমনই হোক, নিজেদের সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের ফরম্যাটে বাংলাদেশকে কঠিন সময় দিতে হবে এই বছর। পাকিস্তানের পর ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে তিনটি করে এবং অ্যাওয়েতে আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যথাক্রমে তিনটি ও পাঁচটি ওয়ানডে খেলবে টাইগাররা। এই ম্যাচগুলো আইসিসির এফটিপির অংশ হওয়ায় র্যাংকিং নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের অনুপ্রেরণা হতে পারে ১১ বছর আগের পাকিস্তান সিরিজ। ২০১৫ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল গিয়েছিল মাশরাফি বিন মুর্তজার হাত ধরে। সেটা ছিল বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের টার্ণিং পয়েন্ট। এরপর ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা শুরু করে।
এরপর ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানকে সিরিজ হারায় বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডকেও প্রায় বাগিয়ে এনেছিল। পরে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারে। এবারের সিরিজটি বাংলাদেশের জন্য পুরানো সুখস্মৃতি ফিরিয়ে আনার বড় সুযোগ। সঙ্গে সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার দৌড়ে একটু এগিয়েও থাকা যাবে। সর্বোপরি এখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে ৩৯ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, যেখানে পাকিস্তানের ৩৪ জয়ের বিপরীতে বাংলাদেশের জয় মাত্র ৫টিতে।
প্রধান কোচ ফিল সিমন্স অবশ্য এখনই অত দূরে চোখ রাখতে চান না। লক্ষ্য সিরিজ বাই সিরিজ এগোনো, ‘আমাদের দিক থেকে, বিশ্বকাপে (সরাসরি) জায়গা করে নেওয়ার ব্যাপারটি আমাদের ভাবনায় নেই। আমরা ওয়ানডে ক্রিকেটে আরও ভালো হয়ে উঠতে চাই। কয়েক বছর আগে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ শীর্ষ দিকেই ছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখন আমাদের আর নেই, সাকিব নেই এবং আরও নানা ব্যাপার আছে। তবে ছেলেদের সঙ্গে মিলে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যেন, প্রতিভা অনুযায়ী খেলতে পারি আমরা। র্যাঙ্কিংয়ে যত ওপরে আমরা থাকতে পারি, তত ভালো। আট নম্বরের ওপরে থাকতে পারলে ভালো।’ বাংলাদেশ দল সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে।
গত অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলা দল থেকে পাকিস্তানের বিপক্ষে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজের জন্য ছয়টি পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রায় ১৫ মাস পর জাতীয় দলে ফিরেছেন আফিফ হোসেন ও শরিফুল ইসলাম। এছাড়া চোটের কারণে আগের সিরিজে স্কোয়াডে না থাকা লিটন দাসও ফিরেছেন দলে। ক্যারিবিয়ান সফরের দলে থাকা ছয় ক্রিকেটারকে এবার বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন জাকের আলি অনিক, শামীম হোসেন, নুরুল হাসান সোহান, তানজিম হাসান সাকিব, নাসুম আহমেদ ও হাসান মাহমুদ। তাদের জায়গায় দলে ফিরেছেন আফিফ হোসেন, শরিফুল ইসলাম, লিটন দাস ও নাহিদ রানা।
দীর্ঘদিন পর আফিফকে দলে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেছেন, ‘আমরা মিডল অর্ডারে অনেক খেলোয়াড়কে সুযোগ দিয়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউ কেউ নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করতে পারেনি। সেই কারণে আফিফ হোসেনকে আবার দলে নেওয়া হয়েছে। আশা করি তিনি তার অভিজ্ঞতার ছাপ এই সিরিজে রাখতে পারবেন।’
এদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে প্রথমবার ওয়ানডে দলে সুযোগ পাওয়া উইকেটকিপার-ব্যাটার মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের ওপর আস্থা রেখেছেন নির্বাচকরা। সেই সিরিজে তিন ম্যাচে তার রান ছিল ৪৬, ১৭ ও ৬। এবারও তাকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘মাহিদুলকেও দলে রাখা হয়েছে। এটি তার জন্য নিজের প্রতিভা দেখানোর দারুণ সুযোগ।’ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে পিঠের চোটের কারণে খেলতে পারেননি লিটন দাস। যদিও ওয়ানডে ফরম্যাটে তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো নয়। শেষ ১৫ ইনিংসে তার একটি মাত্র ফিফটি রয়েছে। সর্বশেষ আট ম্যাচে তিনি ডাবল ডিজিটেও পৌঁছাতে পারেননি এবং চারবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। তবে তার ওপর আস্থা রেখেছেন নির্বাচকরা।
প্যানেল হু








