ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

দুইদিনের মধ্যে যথাযথ উত্তর না দিলে ব্যবস্থা ॥ ডিবি

সনদ জালিয়াতির কথা অস্বীকার কারিগরির চেয়ারম্যানের

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:০৭, ২৩ এপ্রিল ২০২৪

সনদ জালিয়াতির কথা অস্বীকার কারিগরির চেয়ারম্যানের

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েও অধীনস্তদের সনদ জালিয়াতির বিষয়টি কখনো নজরে আসেনি আলী আকবর খানের। এমনকি সনদ জালিয়াতি করা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্ত্রী শেহেলা পারভীনের টাকা নেওয়ার বিষয়টিও তার জানা নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। আবার এ ঘটনার জন্য লজ্জিত এবং দুঃখও প্রকাশ করেছেন তিনি।

তবে সদ্য ওএসডি হওয়া চেয়ারম্যান আলী আকবর খান যা-ই বলুক না কেন, তিনি এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে তাকে দুই দিন সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যথাযথ উত্তর দিতে না পারলে এবং জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিবি। 
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদ জালিয়াতির ঘটনায় মঙ্গলবার ডিবি কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আলী আকবর খানকে। প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ডিবি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি। এ সময় হাজার হাজার সনদ জালিয়াতির ঘটনা, এর সঙ্গে তার স্ত্রীর জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। এরপর সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ বিস্তারিত জানান।
সদ্য ওএসডি হওয়া কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান আলী আকবর খানের কাছে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা বের করেছে, এর বেশি কিছু জানি না। সার্টিফিকেটের কাগজ ওয়েবসাইটে পাইনি। আমি ভেতরে ভেতরে এসব বিষয়ে জানার চেষ্টা করেছিলাম। তার বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে তদন্তও চলছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এটির তদন্ত চলছে।

কী পরিমাণ সার্টিফিকেট বাণিজ্য হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মিডিয়াতে শুনতে পেয়েছি পাঁচ কী সাড়ে পাঁচ হাজার। তবে এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। স্ত্রীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী কোনো ভুল করেছে কি না আমি জানি না। আমি তার বিষয়ে কিছুই জানি না। গোয়েন্দা সংস্থা তার কাছে কী তথ্য পেয়েছে সেটিও জানি না। আমি মনে করি বিনা অপরাধেই জেল খাটছে।’ ডিবি বানোয়াট বলছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাহলে আপনাকে ওএসডি করা হয়েছে কেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে আলী আকবর বলেন, মিডিয়ায় একটি সংবাদ চলে আসছে এবং ডিবির কাছে তথ্য আছে, সেজন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। এক্ষেত্রে আমরা লজ্জিত ও দুঃখিত।
এদিকে ডিবিতে সংবাদ সম্মেলনে হারুন অর রশীদ বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদ জালিয়াতির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খান। ডিবি পুলিশ তাকে দুদিনের সময় দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি তিনি সেটা না করেন এবং পরবর্তীতে সনদ জালিয়াতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনিও স্বীকার করেছেন। তিনি যে সিস্টেম অ্যানালিস্ট শামসুজ্জামানের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন, সেটাও স্বীকার করেছেন।  শামসুজ্জামান ও কারিগরির চেয়ারম্যানের স্ত্রী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মঙ্গলবার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সদ্য ওএসডি হওয়া চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কেফায়েত উল্লাহকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
সার্টিফিকেট কেনাবেচা হচ্ছে, সার্টিফিকেট বানানোর পর আবার ওয়েবসাইটেও আপলোড হচ্ছে; এতসব অনিয়মের পরও চেয়ারম্যান দায় এড়াতে পারেন কি না। স্ত্রীর বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। জানতেন না বলে দাবি করেছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিবিপ্রধান বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ইতিহাসে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কলঙ্কিত ও কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। চেয়ারম্যান আসলেই সনদ বিক্রির বিষয়টি জানতেন কি না? তার তদন্ত করা হবে।

তিনি তো আসল সার্টিফিকেট বিক্রির মাধ্যমে শিক্ষা ও জাতির মেরুদ- ভেঙে দিয়েছেন। সনদ জালিয়াতির ঘটনায় তার দায় সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তিনি বলেন, পরীক্ষার হলে নকল প্রতিরোধে আমরা কাজ করেছি, অপরাধী চক্রকে গ্রেপ্তার করেছি। অথচ দুঃখজনক হলো- কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, তার পরিবার, সিস্টেম অ্যানালিস্ট, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মিলে সিন্ডিকেট বানিয়ে যেভাবে প্রতারণা, সনদ জালিয়াতি করেছেন তা নজিরবিহীন। এটা আসলে কাম্য হতে পারে না, তাই জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেব না।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও চেয়ারম্যান জানার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে ডিবিপ্রধান বলেন, এটা ইচ্ছাকৃত, নাকি জেনেও ব্যবস্থা নেননি তা জানার চেষ্টা করব। দায় এড়ানোর তো সুযোগই নেই। সার্টিফিকেটগুলো কারা কিনেছেন, কোথায় কোথায় বিক্রি হয়েছে, সেটা দেখা হবে। বুয়েটের একটা পরীক্ষক দল আসবে। বিশ্লেষণ করে দেখা হবে- আসলে কী পরিমাণ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছিল। কী পরিমাণ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। তদন্ত আরও চলবে। কারা টাকা দিয়েছে, কারা সনদ নিয়েছে।

তারা কখন কাকে কী পরিমাণ টাকা দিয়েছেন, সেসব বিষয় দেখা হবে। আর্থিকভাবে চেয়ারম্যান জড়িত কি না তা খুঁজে বের করা হবে। সব কিছু তদন্ত করা হবে। তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও ডিবির নজরদারিতে থাকবেন।
গত ১ এপ্রিল কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সনদ জালিয়াতির অভিযোগে প্রথমে গ্রেপ্তার হন সিস্টেম অ্যানালিস্ট প্রকৌশলী এ কে এম শামসুজ্জামান। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে একে একে উঠে আসে এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বোর্ড সংশ্লিষ্ট অনেক ছোট-বড় কর্মকর্তা ও দেশের কয়েকটি কারিগরি স্কুল ও কলেজের প্রধান আর অধ্যক্ষের নাম। গ্রেপ্তার করা হয়েছে চেয়ারম্যানের স্ত্রীকেও। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে কী পরিমাণ সনদ জালিয়াতি করা হয়েছে, সেটি এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি ডিবি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ডিবি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সনদ জালিয়াতির বিষয়টি জেনে যাওয়ায় বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে আর্থিক সুবিধা দিয়েছে চক্র। দুদকের কয়েক কর্মকর্তাও কোটি টাকার ওপরে আর্থিক সুবিধা নিয়েছে সিন্ডিকেটের কাছ থেকে। বিষয়টি দুদক চেয়ারম্যান, সচিবকে জানানো হয়েছে। তারা তদন্ত করে খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

×