ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৩ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

আখেরি মোনাজাতে শেষ হলো ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব 

নূরুল ইসলাম, টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান থেকে

প্রকাশিত: ১৫:২১, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪; আপডেট: ১৫:২৫, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আখেরি মোনাজাতে শেষ হলো ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব 

বিশ্ব ইজতেমা

আমিন, আল্লাহহুম্মা আমিন। লাখ লাখ মানুষের এমব সকরুণ আহাজারি আর বুকফাটা কান্নার রোলের মধ্য দিয়ে রবিবার শেষ হয়েছে তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা। লাখো মানুষের কাঙ্ক্ষিত আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন আদি তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা সাদ হজরতজী হুজুরের বড় ছেলে ইউসুফ বিন সাদ। বাদ ফজর থেকে দিকনির্দেশনামূলক বয়ানের পর ১১টা ১৭ মনিটে শুরু হয় আখেরি মোনাজাত। ১১টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত ২৬ মিনিটের মোনাজাতে দেশ ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করা হয়। ২৬ মিনিট স্থায়ী অগণিত মানুষের জনসমুদ্রে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে দুহাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। হৃদয়গ্রাহী কলিজা কাপানো এবারের আখেরি মোনাজাতে সবাই কেঁদেছেন, চোখের পানি ঝড়িয়েছেন।

ইয়া আল্লাহ আমাদের সবার গুনা খাতা মাফ করে দাও। আমাদের সুখ দাও, শান্তি দাও, আল্লাহর দরবারে এমন আকুতি মিনতি করে লাখ লাখ মুসল্লী দুনিয়া ও আখেরাতে সুখ শান্তি ও দেশের কল্যাণ কামনা করে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। তাবলিগ জামাতের তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আয়োজনে ছিলেন আদি তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা সাদ হজরতজী হুজুর। দুই গ্রুপের আয়োজনের বিশ্ব ইজতেমা জোবায়ের গ্রুপের নেতৃত্বে প্রথম পর্ব শেষ হবার পর শুক্রবার শুরু হয় আদি তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বি ভারতের মাওলানা সাদ আয়োজিত বিশ্ব ইজতেমা। 

আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার ভোর থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে থাকেন। সকাল ৯ টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেলে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলি-গলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া আবদুল্লাহপুর সড়ক, টঙ্গী পূবাইল সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। হাজার হাজার মানুষকে টঙ্গী কলেজগেট থেকে উত্তরা রাজউক কলেজ পর্যন্ত ফ্লাইওভারে বসে দাঁড়িয়ে হেঁটে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে দেখা যায়। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।

সব পথের মোহনা হয়ে ওঠে তুরাগ তীরের ইজতেমা ময়দান। টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিসসহ প্রায় সব কিছু ছিল বন্ধ। 
সবার প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লিদের সঙ্গে মোনাজাতে শরিক হয়ে নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। ২৬ মিনিটের মোনাজাতে মূলত প্রথম পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণের মাধ্যমে ও পরে উর্দু ভাষায় দোয়া করেন।

তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে বিভেদের কারণে এবারও বিশ্ব ইজতেমা হয়েছে আলাদাভাবে। দুটি গ্রুপে বিভক্ত তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন আলেমওলেমা গ্রুপের নেতা কাকরাইল মসজিদের ইমাম মাওলানা জোবায়ের। আদি তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বি ভারতের দিল্লিস্হ মাওলানা সাদ নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন আরেক গ্রুপের। সাদ গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা মুসল্লীদের বাংলাদেশস্হ নেতা ওয়াসেকুল ইসলাম।

মোনাজাতে সমগ্র বিশ্বের পথভ্রষ্ট মুসলমানদের নাজাত, ঐক্য, মুক্তি, সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা, আত্মশুদ্ধি, ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ কামনা করে রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাজির  ফরিয়াদ জানানো হয়। ভাবাবেগপূর্ণ পরিবেশে ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে শীতের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে মহামহিম ও দয়াময় আল্লাহর দরবারে অপার করুণা ও অশেষ রহমত কামনা করেছেন দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান।আবেগঘন আখেরি মোনাজাতে লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে রাহমানুর রাহিম অসীম, অনন্ত, প্রেমময় আল্লাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। সবাই যেন কিছু সময়ের জন্য আল্লাহর প্রেমে দিওয়ানা হয়ে ভুলে গিয়েছিল হিংসা-বিদ্বেষ, ক্ষোভ ও ভেদাভেদ। আমির-ফকির, মনিব-ভৃত্য, ধনী-গরিব, নেতা-কর্মী-নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ পরওয়ারদেগার আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

বিশাল জনসমুদ্র থেকে আকাশ কাঁপিয়ে ধ্বনি ওঠে ‘ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ।’ মুঠোফোনে এবং স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তুলেছেন ক্ষমাশীল পরওয়ারদিগারের শাহী দরবারে। গুনাহগার, পাপী-তাপী বান্দা প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চেয়ে কান্নায় চোখের পানিতে চোখ মুখ গাল ভাসিয়েছেন উপস্থিত সবাই।

বয়ান করলেন যাঁরাঃ

রবিবার ফজরের পর বয়ান করেন মুফতি মাকসুদ (ভারত), বাংলায় তরজমা করবেন মাওলানা আব্দুল্লাহ। সকাল ১০টার দিকে হেদায়েতের বয়ান করেন মাওলানা ইউসুফ বিন সাদ (ভারত), বাংলায় তরজমা করবেন মাওলানা মনির বিন ইউসুফ। এরপর আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

আট মুসল্লির মৃত্যু 

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে রবিবার পর্যন্ত আট মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ইজতেমা ময়দানে সাতজন ও ময়দানে আসার পথে একজনের মৃত্যু হয়। তাঁরা হলেন- ঢাকার বংশালের মুনতাজ উদ্দিন (৭৮), সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের জালাল মণ্ডল (৬০), জামালপুরের ইসলামপুরের নবীর উদ্দিন (৬০), শেরপুরের আবুল কালাম (৬৫), নেত্রকোনার কেন্দুয়ার আব্দুল হেলিম মিয়া (৬২), দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের জহির উদ্দিন (৭০) ও লক্ষ্মীপুরের রামগতির আবুল কাসেম (৬৫)। ইজতেমায় আসার পথে আবদুল্লাহপুরে বাসের ধাক্কায় আবুল কাসেম মারা যান। সর্বশেষ মৃত ব্যাক্তি যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানার চারাতোলা গ্রামের মৃত কাবিল হোসেনের ছেলে হারুন অর রশীদ (৬৫)। আজ রবিবার ভোররাত ৩টার দিকে ইজতেমা ময়দানে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান।

বিদেশি মেহমানঃ

রবিবার সকাল ১০টায় বিশ্ব ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সায়েম জনকণ্ঠকে জানান, ৬৫টি দেশের  ৯২৩১ জন বিদেশি মেহমান ইজতেমা ময়দানে এসেছেন। 

হেদায়েতের বয়ান শেষ হওয়ার পর আখেরি মোনাজাতের পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশের সুরা সদস্য সাদ গ্রুপের বাংলাদেশের আমির সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম মোনাজাত মঞ্চ থেকে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আজ যদি মাওলানা সাদ সাহেব এখানে আসতেন তাহলে এই দোয়া তিনি করতেন, আমাদের এই পুরা মজমা এই ব্যথা দিলে রেখে বিশ্ব ইজতেমা শেষ করলাম। আমরা সকলে খুব বেশি দোয়া করব যাতে মাওলানা সাদ সাহেব খুব দ্রুত বাংলাদেশে আসতে পারেন। এসময় ইজতেমা ময়দানে উপস্থিত লাখ লাখ মানুষকে দোয়া করার জন্য ওয়াদা করান এবং যারা বিরোধিতা করে মাওলানা সাদ সাহেবের আসার বিষয় তাদেরকেও মাওলানা সাদ সাহেব আসার বিষয় বাধা ও বিরোধিতা না করার আহ্বান জানান। সহযোগিতা করতে বলেন যাতে মাওলানা সাদ সাহেব বাংলাদেশের ইজতেমায় আসতে পারেন। মাওলানা সাদ গ্রুপের বাংলাদেশের আমির ওয়াসিকুল ইসলাম বিশ্ব ইজতেমা সফল করতে যারা মেহনত করছেন, সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ইজতেমায় সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানান।
 

তাসমিম

×