ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

আস্থা অর্জনে ইসির ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা

ইভিএমে ভোট

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৩:২১, ৫ অক্টোবর ২০২২

ইভিএমে ভোট

ইভিএমে ভোট

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ভোটের বিষয়ে এখনও রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিধাবিভক্ত। বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও রয়েছে মতভেদ। তবে ইভিএমে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় সেটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই এ বিষয়ে সবার আস্থা অর্জন করতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে ইসি থেকে বলা হচ্ছে অনেকে না বুঝেই এ বিষয়ে অপপ্রচার করছে।

এ পদ্ধতিতে ভোট হলে একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারে না, তাই ভোট কারচুপির কোন সুযোগ নেই। তবে পুরোপুরি সক্ষমতা না থাকায় এবার ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেক আসনে ইভিএমে ভোট করা হচ্ছে।
নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১৭টি দল ইভিএমের পক্ষে। আর ২২টি দল বিপক্ষে। ইসি থেকে জানানো হয়, সংলাপে অংশ নেয়া ২৯টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগসহ চারটি দল নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে সরাসরি মত দিয়েছে। ১৩টি দল অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করে ইভিএমে ভোট করার পক্ষে। আর জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ১২টি দল বিপক্ষে মতামত দেয়।

অন্যদিকে সংলাপে অংশ না নেয়া ১০টি দলের মধ্যে বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলই ইভিএমের বিরোধিতা করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছে। তবুও ইসি ইভিএমের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় বিতর্ক চলছে। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোট কেন্দ্র দখল, একজনের ভোট আরেকজনের দেয়া, আগের রাতেই ভোট দেয়া ও ভোটের পর ফল পরিবর্তন বন্ধ করতে ইভিএম সর্বোত্তম পদ্ধতি।

এদিকে সকল অপপ্রচার বন্ধ করে ইভিএমে আস্থা অর্জন করতে ব্যাপক ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ইসি। এর মধ্যে রয়েছে টিভিসি (টেলিভিশন কমার্শিয়াল) তৈরি করে ভুল ধারণা দূর করতে বিটিভি, বিভিন্ন চ্যানেল ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ। এ ছাড়া ইভিএমের ইতিবাচক দিক নিয়ে পত্রপত্রিকা, মসজিদ-মন্দির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক প্রচার। ইভিএমের ব্যবহার সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দূর করার জন্য যত সন্দেহ আছে, সেগুলো প্রশ্ন ও উত্তর আকারে টিভিসির মতো করে প্রচার।

ইসি আরও যা করবে তা হচ্ছে ডিসি-এসপিসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ইভিএমের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করা, ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট এ্যাপ তৈরি  করা, নতুন ২ লাখ ইভিএম মেশিন ক্রয়, পুরাতন ৫০ হাজার ইভিএমে মেরামত, ইভিএম সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ, আঙ্গুলের ছাপ না মেলা এক শতাংশ ভোটাধিকারের ভোট নিশ্চিত করার বিষয়টি আইনের আওতায় আনা, আঙ্গুলের ছাপ না মেলার সংখ্যা কমাতে ভোটের আগে সবার দশ আঙ্গুলের ছাপ নেয়া, ইলেকশন মনিটরিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ইভিএম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়া এবং যেসব রাজনৈতিক দলের ইভিএম নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব আছে তাদের ইসিতে ডেকে আবারও ইভিএমের প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা এবং ইভিএম মেশিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার সুযোগ দেয়া। এর মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনমুখী করতে চমক আসবে বলেও ইসি সূত্র জানিয়েছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই ইভিএমে ভোটের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সম্প্রতি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে গিয়ে ইসি থেকে জানানো হয় ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট হবে। ইসির এই সিদ্ধান্ত জানার পর বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ প্রসঙ্গে নেতিবাচক মন্তব্য করে। আর আওয়ামী লীগসহ সরকার সমর্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইভিএমে ভোট করার ব্যাপারে ইসির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়।

ইভিএমের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতভেদ দেখা দেয়। পক্ষে থাকা বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইভিএমে ভোট হলে কারচুপির কোন সুযোগ থাকে না, সুষ্ঠু ভোটের জন্য এ পদ্ধতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এবং ফল প্রকাশও দ্রুত করা যায়। অপরদিকে বিপক্ষের বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত নেতিবাচক। কারণ, অশিক্ষিত মানুষ ও বয়স্করা এ পদ্ধতিতে ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হন। তাই ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়ায় ইসির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হবে। তবে ইসি থেকে বলা হয় সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করেই ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, গত ৫ বছরে ইভিএমে ৭৯১টি নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে ইভিএমে ভোট হয়। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের শূন্য হওয়া বিভিন্ন আসনেও ইভিএমে ভোট হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও ইভিএমে ভোট হয়েছে। ইভিএমে হওয়া ওইসব নির্বাচনে অন্যান্য কিছু অভিযোগ থাকলেও ভোট কারচুপির কোন অভিযোগ নেই।
১৫০ আসনে ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এ নিয়ে বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমরা অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইভিএমে ভোট কারচুপি করা সম্ভব তার প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। ইভিএম দিয়ে হ্যাকিং সম্ভব নয়। কেন না, এটা একক মেশিন। ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তবে আমাদের মুখ্য বিবেচনায় এসেছে যারা কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবেন তাদের বিষয়টি। ভোটাররা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারেন সেটি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা ইভিএমে ভোটের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ইভিএমের বিপক্ষে অবস্থান করা দেশের ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিক ইসিতে দেয়া চিঠিতে জানান, প্রযুক্তির কারণে ইভিএম ব্যবহার করে ডিজিটাল জালিয়াতিও করা যায়। বায়োমেট্রিক্সভিত্তিক ইভিএম অনেক ভোটারকেই শনাক্ত করতে পারে না, ইসি প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তাদের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে যন্ত্রটি খুলে দেয়ার তথা ইভিএমকে ওভাররাইট করার ক্ষমতা দিয়ে থাকে। যে কোন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মতো প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে ইভিএমের ফল নিয়েও কারসাজি করা যায়। এছাড়া নির্বাচনের সময়ে মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত কারিগরি টিমও নির্বাচনী ফল বদলে দিতে পারেন। তাই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোঃ আলমগীর  জানিয়েছেন, ইভিএমে ব্যালট ছিনতাই, জালভোট ও রাতে ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। তাই ইভিএম ব্যবহার করার কারণে কোন রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচন বয়কট করবে না। নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে আসবে। কেননা, ইভিএম নিয়ে দলগুলোর মুখে না থাকলেও অন্তরে বিশ্বাস আছে। হয়ত সেটা তাদের কৌশল হতে পারে। তিনি জানান, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

আলমগীর বলেন, ইভিএমে ভোট দেয়ার সময় কারও আঙ্গুলের ছাপ না মেলা সর্বোচ্চ এক শতাংশ ভোটারকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তার আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে ভোট দেয়ার অনুমতি দেন। তার আগে সংশ্লিষ্ট ভোটারের পরিচিতি এনআইডি নম্বর দিয়ে শনাক্ত করা হয়। অথচ টক শোতে বলা হচ্ছে ওভাররাইট করা যায়। ইভিএমে ওভাররাইট করার কোন সুযোগ নেই। কেউ বলছেন, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এটাকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করতে পারেন, এ কথা ঠিক নয়। আবার কেউ বলেন, মামলা হলে কিসের ভিত্তিতে হবে, ভিপি ট্রেইল তো নেই। তবে আমাদের ইভিএমে এর চেয়ে ভাল ব্যবস্থা আছে।

নির্বাচনের পর এক বছর পর্যন্ত সিলগালা অবস্থায় থাকবে। এখানে থেকে কোন মার্কায়, কখন কত ভোট পড়েছে সব প্রিন্ট করা যাবে। তবে অনেকেই ইভিএম নিয়ে অপপ্রচার করছেন। তিনি বলেন, ইভিএমে প্রাথমিক ব্যয় বেশি। আর ব্যালট কিন্তু ছাপাতে হয়, বহন করতে হয়, এতে খরচ আছে। ইভিএমে একবার খরচ হয়। এরপর এটা আমরা বিভিন্ন নির্বাচনে ব্যবহার করি। তিনি আরও জানান, সংলাপে অংশ নেয়া ২৯টি দলের মধ্যে ১৭টি দল ইভিএমে ভোট চেয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সব আসনে ইভিএমে ভোট করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন নির্বাচন কমিশন। তবে তখন এ নিয়ে নানা মহলে বিতর্ক শুরু হওয়ায় সব আসনে না করে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএমে ভোট করা হয়। কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। এ জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা সংলাপ করে। ধারাবাহিক ওই সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দেন।
ইসি সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম ইভিএম নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ২০১০ সালের ১৭ জুন দেশে ইভিএমের মাধ্যমে প্রথম ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন  নির্বাচন কমিশন সে সময় বুয়েটের কাছ থেকে প্রতিটি ১২ হাজার টাকা করে প্রায় এক হাজার ২৫০টি ইভিএম তৈরি করিয়ে নেয়। ওই  কমিশন এই ইভিএমের মাধ্যমে কোন কোন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালভাবেই ভোট নেয়।

এরপর বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২০১২ সাল থেকে ইভিএমে ভোটগ্রহণ আস্তে আস্তে বাড়ানো হয়। কিন্তু কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০১৫ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট নিতে গেলে একটি ইভিএম বিকল হয়ে পড়ে। এরপর নতুনভাবে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে আরও উন্নত প্রযুক্তির ইভিএম তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। হাতে নেয়া হয় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে নতুন ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হয়। তারপর থেকে জাতীয় সংসদের প্রতিটি উপনির্বাচনে এবং সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও কিছু ইউপি নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হচ্ছে।

এ বছর ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পুরোপুরি ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হয় এবং এই নির্বাচনের পর কেউ ভোট কারচুপির অভিযোগ করতে পারেনি। ১৫ জুন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনহ কয়েকটি পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনও ইভিএমে হয়। তবে কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে ফল ঘোষণায় বিলম্ব হওয়ায় এ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক হয়।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, বর্তমানে ইভিএমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি থাকলেও ভোটার ভেরিফাইড অডিট ট্রেইল (ভিভিএটি) সুবিধা নেই। সুধীজনদের সঙ্গে ইসির সংলাপে ভিভিএটি যুক্ত করার পরামর্শ আসে। ভারতে ভিভিএটি সংযুক্ত করে ভোট পরিচালনা করা হচ্ছে দীর্ঘদিন যাবত। এ ব্যবস্থায় একজন ভোটার ভোট দেয়ার পর মার্কা সংবলিত একটি প্রিন্টেড কাগজ স্বচক্ষে কিছুক্ষণ (সাত সেকেন্ড) দেখতে পান। অতঃপর এই কাগজটি ইভিএমের সঙ্গে সংযুক্ত একটি বক্সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হয়, যা প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক সংরক্ষিত। ইভিএমের সঙ্গে এই সুযোগটি সংযুক্ত হলে ভোটগ্রহণে যেমন স্বচ্ছতা আসবে, তেমনি ভোটারদের মধ্যেও স্বস্তি ও আস্থা ফিরে আসবে।
ইভিএম সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, আমরা ইভিএমে ভোট চাই না, তাই বিরোধিতা করছি। কি কারণে ইভিএমে ভোট নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তার যথাযথ কারণও আমরা ব্যাখ্যা করেছি। সারাবিশ্বেই ইভিএম নিয়ে বিতর্ক আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ইভিএমের বিপক্ষে। তরপরও ইসি কেন ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? আমরা মনে করি এটি জাতির সঙ্গে তামাশা। আমরা চাই ভোট হবে ব্যালটে।  
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সিল মারামারির ভোট চাই না, জালিয়াতিমুক্ত ভোট চাই বলেই আমরা ইভিএমের পক্ষে। কিন্তু যারা সিল মারামারির নির্বাচনে অভ্যস্ত, যারা নির্বাচন বলতে কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, কারচুপি ও জালিয়াতি বোঝে, তারা ইভিএমকে সমর্থন করে না।
এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জনকণ্ঠকে জানান, আমাদের দল ইভিএমে ভোট চায় না। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই ইভিএমের বিপক্ষে। তারপরও ইসি ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট করতে চাচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। আর যেই মুহূর্তে দেশে অর্থ সঙ্কট চলছে সেই মুহূর্তে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ব্যয় করে ইভিএম মেশিন কিনতে হবে কেন? এতে জনগণের কি লাভ?
পক্ষে-বিপক্ষে বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া ॥ নির্বাচন কমিশনের ইভিএমে ভোট করার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কেউ বলছেন এতে ভোট কারচুপির সুযোগ থাকে। আবার কেউ বলছেন এতে ভোট কারচুপির কোন সুযোগ নেই। আবার কেউ বলছেন এক্সটারনাল ডিভাইস যুক্ত করে ভোট কারসাজি করা যায়, কেউ বলছেন এমন কিছু করার সুযোগ একেবারেই নেই। তবে অনেকেই বলেছেন, ভোটারদের আস্থা না থাকলে ইভিএমে যত ভাল নির্বাচনই হোক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এজন্য ইসিকে এ বিষয়ে আস্থা ফেরানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রযুক্তিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, আমি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ইভিএম মেশিনের হার্ডওয়্যার থেকে শুরু করে সবকিছু পরীক্ষা করে দেখেছি। অন্য কোন যন্ত্রাংশ বা ডিভাইস এতে যুক্ত করার সুযোগ নেই। ইভিএম ভার্চুয়ালি ম্যানিপুলেট করাও অসম্ভব। আমি টেকনিক্যাল বিষয়টা বলেছি। তবে কেউ তা বিশ্বাস করবে কিনা সেটা তার ব্যাপার।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, দেশে এখনও ইভিএমে ভোটের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এ ছাড়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএম চায় না। নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। ইভিএমে ভোটের সময় আঙ্গুলের ছাপ না মিললে ভোট দেয়া যায় না। তাই এ পরিস্থিতিতে ইভিএমে ভোট হলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং বিতর্ক হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার খান বলেন, ইভিএমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সবকিছু লকড। তারপরও কথা রয়েছে। এ মেশিন সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে না। এটি মাঠ পর্যায়ের মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইভিএম একটা নিকৃষ্ট যন্ত্র। কারণ, যে যন্ত্র সফটওয়্যার দিয়ে পরিচালিত হয়, তাতে কারসাজি করা যেতে পারে। যারা প্রোগ্রামিং করে তারাও কারসাজি  করতে পারে। যেহেতু নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওভার রাইটিংয়ের ক্ষমতা দেয়া আছে, তারাও কারসাজি করতে পারে। এ ছাড়া ইভিএমে আঙ্গুলের ছাপ না মেলায় অনেকে  ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম বলেন, ইভিএমে কি কি সমস্যা হচ্ছে, তার একটি পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ ও চিত্র নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি অংশীজনদেরও এগুলো জানানো উচিত। কারণ, নির্বাচনে  স্বচ্ছতা না থাকলে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়।
ইসির ১৫০ আসনে ইভিএমে নির্বাচনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশন দেশের মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের নির্বাচন ভবনে ডেকে মতামত নেয়া হয়। কিন্তু তাদের কোন মতামতই আমলে নেয়নি ইসি।
ইভিএম উদ্ভাবন কমিটির সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ভোট কেন্দ্র দখল, একজনের ভোট আরেকজনের দেয়া, আগের রাতেই ভোট দেয়া, ভোটের পর ফল পরিবর্তন হয়ে যাওয়া- এসব বন্ধ করতেই ইভিএম আনা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে এগুলোর কোনটিই সম্ভব নয়। এটি দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, ইন্টারনেটসহ কোন ধরনের সংযোগ নেই। এক্সটারনাল ডিভাইসও যুক্ত করার সুযোগ নেই। ফলে ইভিএমে স্বচ্ছভাবে ভোটগ্রহণ করা সম্ভব। এতে কোন ধরনের কারচুপির সুযোগ নেই।
ইভিএম প্রকল্পে ৮৭১১ কোটি টাকা বরাদ্দের অপেক্ষায় ইসি ॥ ২ লাখ ইভিএম মেশিন ক্রয়, সংরক্ষণের জন্য ভাল মানের কিছু স্টোর নির্মাণ ও দক্ষ লোকবল তৈরি করতে প্রশিক্ষণের জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ইসি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট করতে ইসি এ প্রকল্প গ্রহণের পর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ ক’টি দল স্বাগত জানালেও বিএনপিসহ কিছু দল এর তীব্র সমালোচনা করে।

তবে  সরকার প্রকল্প অনুমোদনের পর কবে অর্থ বরাদ্দ হবে সে অপেক্ষায় রয়েছে ইসি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দেড় লাখ ইভিএম কিনতে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রকল্প নিয়েছিল ইসি। ওই প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম মেশিন ক্রয় করেছিল ইসি।
আগে কেনা দেড় লাখের মধ্যে ভাল আছে ৭০ হাজার ॥ ইভিএমে ভোট করার জন্য আগের নির্বাচন কমিশন ইভিএম মেশিন কিনেছিল দেড় লাখ। এর মধ্যে ৭০ হাজার ভাল আছে। আর বাকি ৮০ হাজার ইভিএমে ত্রুটি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার অকেজো হয়ে গেছে। বাকি ৫০ হাজার ইভিএম মেরামত করে সক্রিয় করবে ইসি। আগে কেনা দেড় লাখের মধ্যে গত চার বছরে সারাদেশের আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়গুলোতে প্রায় সাড়ে ৯৩ হাজার ইভিএম পাঠিয়েছিল। সেগুলো এখনও সেখানেই রয়েছে। এ ছাড়া সাড়ে ৫৪ হাজার ইভিএম রাখা হয়েছে গাজীপুরের মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে। আর আড়াই হাজার ইভিএম আছে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে।
জাতীয় নির্বাচনের আগেই নেয়া হবে সব ভোটারের ১০ আঙ্গুলের ছাপ ॥ ইভিএমে ভোটদানের ক্ষেত্রে কেউ যাতে বিড়ম্বনার শিকার না হন সে জন্য দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই সকল ভোটারের দুই হাতের ১০ আঙ্গুলের ছাপ নেবে ইসি। এর ফলে আঙ্গুলের ছাপ না মেলার সমস্যা অনেকাংশে কেটে যাবে বলে মনে করছেন ইসি কর্মকর্তারা। কারণ, ১০ আঙ্গুলের ছাপ নিলে যদি একটা আঙ্গুলও মিলে যায়, তবু ভোটার ভোট দিতে পারবে। এখন চার আঙ্গুলের ছাপ থাকায় অনেকেরই মেলে না।
বিভিন্ন দেশে ইভিএম ॥ তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পাঞ্চ কার্ডের মাধ্যমে ভোট প্রদানের পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর ১৯৮০ সালে এম.বি. হানিফা প্রথম ভারতীয় ভোটিং মেশিন আবিষ্কার করেন। অনেকের মতে, সেটারই উন্নয়নের ফল আজকের ইভিএম। ইভিএম ১৯৮২ সালে ভারতের কেরলে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানে ভারত ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, পেরু, সুইজারল্যান্ড, এস্তোনিয়া ও ফিলিপিন্সসহ বিভিন্ন দেশে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে।

তবে গত ১৫ বছরে যত দেশ ইভিএম গ্রহণ করেছে তার চেয়ে বেশি দেশ ইভিএম বাতিল করেছে। ইভিএম বাতিল করা দেশের তালিকায় আছে জার্মানি, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, নরওয়ে, ভেনিজুয়েলা, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রাজ্য। যেসব দেশে এখন ইভিএমে ভোট হয় সেখানেও সব মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

monarchmart
monarchmart