ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

যেসব কারণে ইরান যুদ্ধে জয়ের ঘোষণা দিতে পারছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প

প্রকাশিত: ১৫:১০, ১৫ মার্চ ২০২৬

যেসব কারণে ইরান যুদ্ধে জয়ের ঘোষণা দিতে পারছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান ইস্যুতে কঠিন কূটনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। আবার তা বন্ধ করলে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। এই অবস্থায় যুদ্ধ জয়ের স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া তার জন্য সহজ হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনো অতীতের বড় ব্যর্থতার মতো পর্যায়ে না গেলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত দেখা যাচ্ছে। অন্তত সাতটি বড় কারণ রয়েছে, যেগুলোর কারণে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত ইরানে যুদ্ধজয়ের দাবি করতে পারছেন না।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালী সংকট। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের অবস্থানের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পুরোপুরি এই পথ নিরাপদ রাখা কঠিন বলেই বিশেষজ্ঞদের মত।

দ্বিতীয়ত, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব সংক্রান্ত পরিস্থিতি। সামরিক উত্তেজনার শুরুর দিকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পরিবর্তনের খবর আসে এবং নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেয়। এতে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; বরং নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

তৃতীয়ত, ইসরায়েলের ভূমিকা। যুদ্ধের গতিপথ এখন পুরোপুরি ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে যুদ্ধ বন্ধ বা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

চতুর্থত, যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ইরানে ঠিক কী অর্জন করতে চায়, সে বিষয়ে স্পষ্ট ও একক লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে না। কোথাও বলা হচ্ছে পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। লক্ষ্য পরিষ্কার না হলে জয় বা সাফল্যের মানদণ্ড নির্ধারণও কঠিন হয়ে যায়।

পঞ্চমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক। ট্রাম্প দাবি করছেন, কর্মসূচি প্রায় ধ্বংস হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিছু স্থানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকতে পারে। এটি থাকলে ভবিষ্যতে ইরান আবার কর্মসূচি শুরু করতে সক্ষম হতে পারে।

ষষ্ঠত, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যুদ্ধ ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর বড় ধরনের গণ-আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এখনো তেমন বিদ্রোহ দেখা যায়নি। বরং অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুদ্ধ শেষে সরকারের অবস্থান আরও সুসংহত হতে পারে।

সপ্তমত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। একই সঙ্গে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও জনমনে প্রভাব ফেলছে। নির্বাচনী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় প্রশাসনের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সামরিক দিক থেকে প্রাথমিক সাফল্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল রূপ নিচ্ছে। ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, তা শেষ করা তত কঠিন। তাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে পরিস্থিতি সামলে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো যায়।

এ.এইচ

×