আবদুল আউয়াল মিন্টু, সাকিফ শামীম ও মোস্তফা আবিদ খান (বা থেকে)। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছে যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে ভবিষ্যৎ বিচার করা সম্ভব নয়-বরং নীতির মান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মানই আগামী দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণ করবে।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ এ বছরের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণ মর্যাদার পাশাপাশি এক নতুন চাপও তৈরি করছে, কারণ বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দেশীয় শিল্পকে আরও দক্ষ হতে হবে। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট সেক্টরের সবচেয়ে বড় সংগঠন এফবিসিসিআই কি শুধু প্রতিনিধিত্বের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে, নাকি একটি কার্যকর নীতি-থিংক ট্যাংকে রূপান্তরিত হবে-এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সদ্য নিয়োগ পাওয়া বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, অর্থনীতিবিদ (এফএসিএইচই এফএলএমআই), ব্যবসায়ী নেতা ও ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম এবং বাণিজ্য নীতি ও শুল্ক বিশেষজ্ঞ মোস্তফা আবিদ খান। তবে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ব্যবসা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ এবং চলমান এই বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রভাব অর্থনীতির ওপর কিভাবে পড়ছে তা নিয়েও তিনি সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে বেসরকারি খাতের সর্বোচ্চ এপেক্স বডি হিসেবে নীতি-সংলাপ, বাজেট প্রস্তাবনা, শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা, শিল্প সুরক্ষা, রপ্তানি সম্প্রসারণ—এসব বিষয়ে এফবিসিসিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কেন এফবিসিসিআইকে একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রাতিষ্ঠানিক নীতি-থিংক ট্যাংকে রূপান্তর করা সম্ভব হলো না?
ব্যবসায়ীরা মনে করেন, অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় কেবল দাবিদাওয়া-নির্ভর বাণিজ্য সংগঠন দিয়ে আর চলবে না। প্রয়োজন গবেষণানির্ভর নীতিপ্রস্তাব, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, সেক্টরভিত্তিক ডেটা ব্যাংক এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলপত্র—যা সরকার, সংসদ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শক্তিশালী থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করতে হলে নিয়মিত রিসার্চ ইউনিট, দক্ষ অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক মানের ডেটাবেস এবং স্বাধীন নীতি-প্রস্তাব প্রণয়ন কাঠামো দরকার।
এফবিসিসিআইয়ের সাংগঠনিক কাঠামো এখনও মূলত নির্বাচিত নেতৃত্বকেন্দ্রিক; স্থায়ী গবেষণা সেল বা পলিসি ইনস্টিটিউশনালাইজেশন যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি। আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতে, এফবিসিসিআইয়ের শক্তি হলো এর বিস্তৃত সদস্যভিত্তি ও জাতীয় প্রতিনিধিত্ব। কিন্তু এই শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানে রূপান্তর করতে হলে স্থায়ী পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট গঠন করতে হবে। বোর্ড পরিবর্তন হলেও গবেষণা কার্যক্রম যেন চলমান থাকে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা শুধু কর-সুবিধা চান—এমন ধারণা ভাঙতে হবে। বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, লজিস্টিক খরচ কমানো এবং আর্থিক খাত সংস্কার—এসব বিষয়ে সুসংগঠিত নীতি-প্রস্তাব দেওয়া জরুরী। আবদুল আউয়াল মিন্টু আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখনই বাস্তব ও চলমান সংকট এবং এর ফলে আবহাওয়ার ধারায় পরিবর্তন ঘটছে। যা পরিবেশ, বন সংরক্ষণ ও কৃষিকে কঠিন করে তুলছে। এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব মূলত কৃষি উৎপাদন, বন রক্ষা ও পুনর্বাসন খরচ, জলবায়ু অভিযোজন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে পড়ছে — যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরের কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সাকিফ শামীম বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও ডিজিটাল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আলাদা একটি নীতি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির বড় একটি অংশ আসবে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা থেকে-যা এখনো এফবিসিসিআই-এর মূল আলোচনায় যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এফবিসিসিআই-এর ভেতর ইতোমধ্যেই বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটি, সেক্টরভিত্তিক ফোরাম এবং রিসার্চ সংশ্লিষ্ট কাঠামো থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোই নিয়মিত আউটপুট বা সক্রিয় নীতিগত বিশ্লেষণে দৃশ্যমান নয়। এই বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করে যদি নির্দিষ্ট সময় অন্তর রিপোর্ট, পলিসি ব্রিফিং এবং খাতভিত্তিক সুপারিশ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে সংগঠনটির প্রভাব অনেক বেশি বাস্তবমুখী হবে।
তিনি বলেন, এফবিসিসিআইয়ের হাতে প্রতিনিধিত্ব আছে, কাঠামো আছে, তথ্যের প্রবেশাধিকার আছে; কিন্তু এখনো পূর্ণাঙ্গ নীতি-থিংক ট্যাংকে রূপান্তর হয়নি। এই রূপান্তর সম্ভব হবে তখনই, যখন তারা নিয়মিত গবেষণা প্রকাশ করবে, ডেটা-ড্রিভেন নীতি সুপারিশ দেবে এবং স্বল্পমেয়াদি নবাবি থেকে বের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিশনে কাজ করবে।
মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এফবিসিসিআইয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। সংগঠনটি যদি সত্যিকারের নীতি-থিংক ট্যাংক হতে চায়, তাহলে তাদের নিজস্ব রিসার্চ উইং থাকতে হবে, যেখানে বাণিজ্যনীতি, ডব্লিউটিও ইস্যু, আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি, ট্যারিফ কাঠামো, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ—এসব বিষয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণ হবে। শুধু দাবি-দাওয়া নয়, প্রমাণভিত্তিক নীতিপত্র তৈরি করে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশগুলোর চেম্বার সংগঠনগুলো কেবল লবিং করে না; তারা নীতি-গবেষণা, সেক্টরাল স্টাডি ও প্রেডিক্টিভ অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করে। বাংলাদেশেও যদি বেসরকারি খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে হয়, তাহলে এফবিসিসিআইকে সেই পথে হাঁটতেই হবে। এখন সময় এসেছে এফবিসিসিআইয়ের ভেতরে একটি স্বাধীন পলিসি কাউন্সিল গঠনের, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব নয়, গবেষণালব্ধ তথ্যই হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, লজিস্টিক খরচ কমানো এবং আর্থিক খাত সংস্কার—এসব বিষয়ে সুসংগঠিত নীতি-প্রস্তাব দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, এফবিসিসিআই যদি একটি বিশ্বাসযোগ্য থিংক ট্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে সরকারও তাদের সুপারিশকে আরও গুরুত্ব দেবে।
সাকিফ শামীমের মতে, একটি আধুনিক থিংক ট্যাংকের মূল শক্তি হলো ডেটা ও বিশ্লেষণ। এফবিসিসিআই যদি প্রতিটি খাতের জন্য ডেটা সেল তৈরি করে এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশ করে, তাহলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রভাব বহুগুণ বাড়বে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে শুল্কসুবিধাহীন বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্পোন্নয়ন কৌশল, আর্থিক প্রণোদনার পুনর্বিন্যাস—এসব বিষয়ে গভীর গবেষণা ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ ও শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে-বিশ্বের অনেক দেশে চেম্বার সংগঠনগুলো নিজস্ব থিংক ট্যাংক পরিচালনা করে। তারা নিয়মিত পলিসি পেপার, ইকোনমিক আউটলুক রিপোর্ট, সেক্টরাল রিভিউ প্রকাশ করে এবং সরকারের সঙ্গে কাঠামোগত সংলাপ চালিয়ে যায়। বাংলাদেশেও এমন একটি মডেল গড়ে তোলা সম্ভব—যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও গবেষণানির্ভর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা যায় তবে।
সাকিফ শামীম বলেন, এফবিসিসিআই ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে মূলত বেসরকারি খাতের স্বার্থ রক্ষায় পরামর্শমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে ১০৬টি চেম্বার ও ৪০২টি ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে, যা এটিকে দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। অর্থাৎ উৎপাদন, রপ্তানি, সেবা, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা এখানে উপস্থিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই বিশাল নেটওয়ার্ক কি এখনো শুধুই দাবিদাওয়া ও সুপারিশে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অর্থনৈতিক নীতির জন্য জ্ঞানভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এফবিসিসিআই-এর ভেতর ইতোমধ্যেই বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটি, সেক্টরভিত্তিক ফোরাম এবং রিসার্চ সংশ্লিষ্ট কাঠামো থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোই নিয়মিত আউটপুট বা সক্রিয় নীতিগত বিশ্লেষণে দৃশ্যমান নয়। এই বিদ্যমান প্ল্যাটফর্মগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করে যদি নির্দিষ্ট সময় অন্তর রিপোর্ট, পলিসি ব্রিফিং এবং খাতভিত্তিক সুপারিশ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে সংগঠনটির প্রভাব অনেক বেশি বাস্তবমুখী হবে।
কারণ বাস্তবতা খুব স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে দেখা যাচ্ছে, বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি FY23-এ ৫.৮ শতাংশ থেকে FY24-এ নেমে ৪.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং FY25-এ তা আরও কমে ৩.৩ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, যার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিনিয়োগ হ্রাস, শিল্পখাতে মন্থরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। একই রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে-বাংলাদেশের জন্য বোল্ড রিফর্ম ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে যেখানে নীতির ভুল কেবল সংখ্যায় নয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, এখানেই একটি পলিসি থিংক ট্যাংকের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শক্তিশালী ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কেবল সরকারকে প্রস্তাব দেয় না, তারা ডেটা বিশ্লেষণ করে, সম্ভাব্য নীতির প্রভাব মডেল এবং আগাম সতর্কতা তৈরি করে। বাংলাদেশে এই জায়গাটি এখনো অনেকাংশে ফাঁকা। অথচ এফবিসিসিআইয়ের নিজস্ব কাঠামোয় গবেষণা ও পরিকল্পনা ইউনিট রয়েছে, যেখানে বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান সংগ্রহের কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ সম্ভাবনা কাঠামোর ভেতরেই আছে, অনুপস্থিত শুধু স্কেল এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি।
সাকিফ শামীমের মতে, এফবিসিসিআইতে নতুনভাবে কয়েকটি বিষয় ইনক্লুড করা যেতে পারে-যেমন একটি স্থায়ী "Policy Impact Assessment Cell", যেখানে প্রস্তাবিত সরকারি নীতির সম্ভাব্য প্রভাব আগেই বিশ্লেষণ করা হবে; একটি "SME Data Observatory", যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাস্তব সমস্যার ডেটা নিয়মিত আপডেট হয়; এবং একটি "Private Sector Competitiveness index", যা বছরে একবার প্রকাশিত হয়ে দেশের ব্যবসা পরিবেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারে।
আরও বড় বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাইভেট সেক্টরই এখন চাকরি, রপ্তানি এবং উৎপাদনের প্রধান চালিকা শক্তি। বিশ্বব্যাংক বলছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগের মন্থরতা প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্টকে চাপে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে নীতিগত আলোচনায় যদি মাঠের বাস্তবতা যথাযথভাবে না আসে, তাহলে সিদ্ধান্তের সাথে বাস্তব অর্থনীতির দূরত্ব বাড়বে। এফবিসিসিআই যদি নিয়মিত খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে পারে-যেমন উৎপাদন ব্যয়ের প্রবণতা, রপ্তানি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, এসএমই অর্থায়নের বাস্তব চিত্র বা দক্ষ শ্রমবাজারের ঘাটতি-তাহলে নীতিনির্ধারণ আরও বাস্তবমুখী হবে।
তাঁর মতে, একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও ডিজিটাল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আলাদা একটি নীতি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা প্রয়োজন, কারণ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির বড় একটি অংশ আসবে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা থেকে-যা এখনো এফবিসিসিআই-এর মূল আলোচনায় যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বাংলাদেশে প্রায়ই নীতি তৈরি হয় তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার প্রেক্ষিতে। কিন্তু টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন আগাম পূর্বাভাস। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আর্থিক খাত সংস্কার, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি। এগুলো এমন বিষয় যা একদিনে সমাধান হয় না; বরং এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক গবেষণা ও নীতি সমন্বয়। এই ধারাবাহিকতা তৈরি করতে পারলে এফবিসিসিআই কেবল ব্যবসায়ী সংগঠন নয়, নীতিগত "ইন্টেলিজেন্স সেন্টার" হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে বাস্তবতা বলছে, থিংক ট্যাংক হওয়া মানে সরকারকে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং এটি হবে একটি তথ্যভিত্তিক সহায়ক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সিদ্ধান্ত নেবে রাষ্ট্র, কিন্তু সিদ্ধান্তের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে বাজারের বাস্তব তথ্য দিয়ে। বর্তমানে এফবিসিসিআই বিভিন্ন সরকারি কমিটি ও ফোরামে অংশ নিয়ে নীতি আলোচনায় ভূমিকা রাখে, অর্থাৎ নীতির দরজায় তাদের প্রবেশাধিকার ইতোমধ্যেই রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই ভূমিকা আরও পেশাদার ও বিশ্লেষণমূলক করে তোলা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- এফবিসিসিআই-এর ভেতরে থাকা রিসার্চ ইউনিট, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ প্ল্যাটফর্মগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না রেখে আউটকাম-ভিত্তিক ম্যান্ডেট দেওয়া। অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিটের নির্দিষ্ট গবেষণা আউটপুট, পলিসি সুপারিশ এবং বাস্তব ফলাফল পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এই সময় প্রাইভেট সেক্টরের সবচেয়ে বড় সংগঠন যদি চিন্তার নেতৃত্বে না আসে, তাহলে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক আলোচনায় একটি বড় শূন্যতা থেকে যাবে। প্রশ্নটা তাই এখন আর তাত্ত্বিক নয়। প্রশ্ন হলো-এফবিসিসিআই কি শুধু প্রতিনিধিত্ব করবে, নাকি নীতিকে প্রভাবিত করার মতো জ্ঞানভিত্তিক শক্তিতে রূপ নেবে? সময় বলছে, দ্বিতীয় পথটিই এখন দেশের প্রয়োজন।








