সাকিফ শামীম বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা স্বপ্নদ্রষ্টা, বর্তমানে ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দেশের বৃহত্তম বিস্তৃত অনকোলজি সুবিধাগুলোর মধ্যে একটি তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, যা উন্নত, বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা ও গবেষণা প্রদান করে। লাইফপ্লাস বাংলাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে রোগী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আপনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত অনকোলজি প্রকল্পগুলোর একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি কী অনুপ্রাণিত করেছিল এবং আপনি এটিকে দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা ও গবেষণাকে কীভাবে রূপান্তরিত করতে দেখেন?
এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যখন ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ধারণা তৈরি শুরু করি, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল—বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১,৮২,০০০ নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছিল, যার মৃত্যুহার ৫৬ শতাংশের বেশি। প্রতি বছর ৬০,০০০-এরও বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছিলেন। এটি দুটি ঘাটতি নির্দেশ করে: ক্লিনিক্যাল সক্ষমতা এবং সিস্টেম দক্ষতা। আমার লক্ষ্য ছিল এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখানে উন্নত ডায়াগনস্টিকস, প্রিসিশন অনকোলজি এবং গবেষণা একটি সমন্বিত শাসন কাঠামোর অধীনে থাকবে—যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসাকে ধীর করে দেওয়া বিভাজন দূর করা যায়।
আমি যে রূপান্তর প্রত্যাশা করি, তা কাঠামোগত। ডিজিটাল প্যাথলজি, মলিকিউলার টিউমার বোর্ড, এআই-সমর্থিত চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং ফলাফল-ট্র্যাকিং সিস্টেম সংযুক্ত করে আমরা এমন একটি মডেল তৈরি করছি, যেখানে সিদ্ধান্তগুলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনুমানের পরিবর্তে রিয়েল-টাইম ডেটার ওপর নির্ভর করবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ শেষ পর্যায়ের ক্যান্সার ব্যবস্থাপনা থেকে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও ঝুঁকি প্রোফাইলিংয়ে অগ্রসর হবে, যা আগামী দশকে বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
গত দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে, অবকাঠামো, সেবাদান এবং রোগীর ফলাফলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো কী?
অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতি দ্রুত হয়েছে। দশ বছর আগে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ছিল প্রায় ০.৭; বর্তমানে তা প্রায় ৩.১—যদিও এখনও পর্যাপ্ত নয়, তবে চার গুণ উন্নতি হয়েছে। বেসরকারি খাত তৃতীয় পর্যায়ের শয্যা সংখ্যা প্রায় ১২,৫০০ থেকে বাড়িয়ে ২৩,০০০-এর বেশি করেছে, যার বেশিরভাগই অনকোলজি, কার্ডিওলজি ও নেফ্রোলজি সেবার সঙ্গে যুক্ত।
ডিজিটালাইজেশন সেবাপদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। ২০১৩ সালে ৩ শতাংশের কম বেসরকারি হাসপাতাল ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবহার করত। বর্তমানে ৪০ শতাংশের বেশি উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সিস্টেম রয়েছে। রোগীর ফলাফলও উন্নত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নবজাতক মৃত্যুহার প্রতি ১,০০০ জন্মে ৩২ থেকে কমে ২১ হয়েছে। স্ক্রিনিং কর্মসূচির ফলে বেসরকারি কেন্দ্রে প্রাথমিক ক্যান্সার শনাক্তকরণ প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। এখন স্বাস্থ্যসেবা শুধু পরিমাণনির্ভর নয়; এটি ক্রমেই মাননির্ভর, প্রোটোকলভিত্তিক ও পরিমাপযোগ্য হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রবেশাধিকার ও ব্যয়সাপেক্ষতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। লাইফপ্লাসের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে রোগী ও সেবাদাতার মধ্যে ব্যবধান কমাতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে?
বাংলাদেশে প্রতি ১,০০০ জনে চিকিৎসকের সংখ্যা এখনো ০.৫৮, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১:১,০০০ মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। ৬৫ শতাংশের বেশি বিশেষজ্ঞ ঢাকাকেন্দ্রিক। লাইফপ্লাস বাংলাদেশের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভৌগোলিক বাধা কমিয়ে এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সহায়তা করছে।
লাইফপ্লাস এখন প্রতি মাসে হাজার হাজার টেলিকনসালটেশন পরিচালনা করে। এর ফলে গ্রামীণ রোগীদের বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছানোর গড় সময় ৭২ শতাংশ কমেছে। বাড়িতে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থায় লজিস্টিক ব্যয়ও কমেছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্ক রয়েছে—রোগী রেফারেল থেকে ওষুধ সহযোগিতা পর্যন্ত। এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কীভাবে এগোচ্ছে এবং যৌথ উদ্ভাবন ও আন্তঃসীমান্ত সেবায় কী সম্ভাবনা রয়েছে?
প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা সহযোগিতা হওয়া উচিত ব্যবহারিক ও রোগীকেন্দ্রিক। ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কাঠামোবদ্ধ, নির্বাচিত সহযোগিতা, যা সরাসরি ক্লিনিক্যাল ফলাফল উন্নত করে। সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচি চিকিৎসকদের হালনাগাদ ক্লিনিক্যাল অনুশীলনের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে পারে, বিশেষ করে অনকোলজি ও উন্নত সেবায়।
যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং রেডিওথেরাপি সিস্টেম ও উন্নত ডায়াগনস্টিক যন্ত্রের দক্ষ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত কেস রিভিউ বিশেষজ্ঞদের শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই মতামত দেওয়ার সুযোগ দেয়। টিউমার বোর্ড এর একটি কার্যকর উদাহরণ। ভার্চুয়াল বহুবিষয়ক আলোচনায় জটিল ক্যান্সার কেস বিশ্লেষণ করা যায়, যখন চিকিৎসা স্থানীয়ভাবেই পরিচালিত হয়। কাঠামোবদ্ধ দ্বিতীয় বা তৃতীয় মতামত চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে এবং ক্লিনিক্যাল ঝুঁকি কমায়। এতে রোগীরা নিজ দেশের ব্যবস্থার মধ্যেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন।
বাংলাদেশের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম খাত বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পাচ্ছে, আর ভারত ও পাকিস্তান পরিপূরক সক্ষমতা রাখে। আঞ্চলিক সহযোগিতা কীভাবে স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল ও যৌথ স্বাস্থ্যসেবা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারে?
দক্ষিণ এশিয়া এখনও তার উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জামের ৭০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। মহামারির সময় এ নির্ভরতার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও অন্যান্য সার্ক দেশের মধ্যে সমন্বিত উৎপাদন ও বিনিয়োগ এই নির্ভরতা কমাতে পারে। ভোগ্যপণ্য, রিএজেন্ট ও অনকোলজি ওষুধের যৌথ উৎপাদন মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের সমন্বয় পণ্য বাজারজাতের সময় প্রায় ৩০ শতাংশ কমাতে পারে। কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, এপিআই উৎপাদন এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রশিক্ষণে যৌথ বিনিয়োগ সীমান্তজুড়ে বিদ্যমান ঘাটতি পূরণ করবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি স্থিতিস্থাপক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা, যেখানে বৈশ্বিক ধাক্কায় সরবরাহ ব্যাহত হবে না এবং দক্ষিণ এশিয়া একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা উৎপাদনশীল অঞ্চলে পরিণত হবে।
এ.এইচ








