ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

টেক্সটাইল মিল বন্ধের হুঁশিয়ারিতে পোশাক রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২২:১৬, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

টেক্সটাইল মিল বন্ধের হুঁশিয়ারিতে পোশাক রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ

টেক্সটাইল মিল মালিক ও পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ

শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা আমদানিকে কেন্দ্র করে টেক্সটাইল মিল মালিক ও পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) অনির্দিষ্টকালের জন্য মিল বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে আরএমজি খাত থেকে। রপ্তানি ব্যাহত হওয়া ঠেকাতে সরকারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার এই সংকটময় পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করছে এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছে। তিনি বলেন, টেক্সটাইল শিল্প সমস্যার মুখে আছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিছু একটা করতেই হবে। আমরা কী কী বিকল্প সম্ভব, তা নিয়ে চিন্তা করছি। বিষয়টিকে জটিল আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, আমাদের একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করব। বাণিজ্য সচিব জানান, সরকার, টেক্সটাইল মিল মালিক এবং পোশাক প্রস্তুতকারকসহ একাধিক অংশীজন এতে জড়িত। সবার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে বর্তমানে কোন কোন উপায় বিবেচনায় রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
এদিকে, সরকার দীর্ঘদিন ধরে ২৩ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন টেক্সটাইল মিল মালিকরা। ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এ ঘোষণা আসায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এটা কোনো হুমকি নয়। খাতটি এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এটি একটি সংকট, একটি জাতীয় সংকট।

নীতিনির্ধারণের ধীরগতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভারত যে কোনো পরিস্থিতিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অথচ আমাদের সরকার মাসের পর মাসেও তা পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার পোশাক খাতে বিভিন্ন প্রণোদনা দিলেও টেক্সটাইল মিল মালিকরা সেগুলোর সুবিধা পান না। বরং এসব সুবিধার বড় অংশ চলে যায় বিদেশি ক্রেতাদের হাতে। রাসেলের মতে, ওপেন কস্টিং পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত তা ক্রেতাদের ওপরই পড়ে। কিন্তু দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে পোশাক প্রস্তুতকারকদের দীর্ঘমেয়াদে বেশি দামে ভারত থেকে সুতা আমদানি করতে হবে, যা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, টেক্সটাইল মিল বাস্তবে শাটডাউন করা হলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে। এ খাতে কর্মরত ১০ লাখের বেশি শ্রমিকের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, যা শ্রম অস্থিরতা উসকে দিতে পারে। সুতা উৎপাদন বন্ধ হলে পোশাক শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘœ ঘটবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণ পরিশোধে সমস্যার কারণে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) আরও বাড়তে পারে, যা নিয়ে ব্যাংক খাত ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টেক্সটাইল খাতে বড় আকারের কারখানা বন্ধ হলে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকা অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হবে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা সুতা উৎপাদনকারী মিল ও পোশাক রপ্তানিকারকদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
যেভাবে বিরোধ তীব্র হলো ॥ বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ১২ জানুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়ে বন্ডেড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালে এই বিরোধ আরও তীব্র হয়। পোশাক রপ্তানিকারকরা এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দেন। তারা বলেন, এ সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে তা রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের জন্য ‘আত্মঘাতী’ হবে।

এই প্রতিবাদের মুখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে বলে মনে করা হয়। পরে টেক্সটাইল মিল মালিকরা বুধবার অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবিলম্বে সুতা আমদানির বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ জারির দাবি জানান। তবে তারা কোনো স্পষ্ট আশ্বাস পাননি। এরপর হতাশা থেকে বিটিএমএ সম্প্রতি ‘জরুরি সংবাদ সম্মেলন’ ডেকে আবারও মিল বন্ধের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।

প্যানেল হু

×