ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২

সিপিডি জাতীয় সম্মেলন

সরবরাহ শৃঙ্খলার অভাবে ৩৪ শতাংশ খাদ্যপণ্য নষ্ট হচ্ছে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:৫৩, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

সরবরাহ শৃঙ্খলার অভাবে ৩৪ শতাংশ খাদ্যপণ্য নষ্ট হচ্ছে

দেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য ব্যাপকভাবে অপচয় হচ্ছে

উপযুক্ত সরবরাহ শৃঙ্খলা না থাকায় দেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য ব্যাপকভাবে অপচয় হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশ। বছরে এই অপচয়ের পরিমাণ মোট উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ শতাংশ। এর ফলে প্রায় ৩১ শতাংশ বাংলাদেশী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। 
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি শূন্যে নামিয়ে আনতে টেকসই খাদ্যমূল্য শৃঙ্খল নির্মাণ’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে উত্থপিত মূল প্রবন্ধে এমনটা জানানো হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার।

এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং অ্যামবেসি অব ডেনমার্ক যৌথভাবে সম্মেলনটি আয়োজন করে। 
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় একটি নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ  সমস্যা। দেশে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ নষ্ট বা অপচয় হয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। যে পরিমাণ খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হয় তা মোট কৃষি জমির ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ ২৭ শতাংশ জমিতে উৎপাদিত খাদ্য কখনোই ব্যবহৃত বা খাওয়া হয় না। এ ছাড়া অপচয় বা নষ্ট হয়ে যাওয়া এই খাদ্যের মূল্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ শতাংশ সমপরিমাণ। এসব অপচয়কৃত বা নষ্ট খাদ্য থেকে ১৩ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।
এতে আরও বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের ১৭ শতাংশ ভূমি পানির নিচে বিলীন হয়ে যাবে। এর ফলে মোট কৃষি জমির ৩০ শতাংশ পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে যে শুধুতে যে মানুষের চাপ বাড়তে তা নয়, উৎপাদনে মারাত্মক ব্যহত হয়ে তৈরি হবে খাদ্য সংকট।
প্রবন্ধে বলা হয়, যে ৩৪ শতাংশ খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হয় তা মূলত উৎপাদন, পরিবহন, হ্যান্ডেলিং, গুদামজাতকরণ, খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নষ্ট বা অপচয় হয় ফলমূল ও শাকসবজিতে। বছরে এই খাদ্যপণ্যের অপচয় হয় ২৫-৪০ শতাংশ, যা টাকার অংকে ২৪০ কোটি ডলার বা ২৮ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। এরপরেই রয়েছে মাছ ২০-৩০ শতাংশ, পোল্ট্রি ১৭ শতাংশ এবং চালে ৮-১৫ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য অপচয় কমানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘আকর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, বাংলাদেশ এখনো অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষ করে নারীরা এই অপুষ্টির শিকার। অন্যদিকে খাদ্য বণ্টন এখনো অসম। তাই, খাদ্যের অপচয় কমানো বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
তিনি বলেন, ‘কৃষকরা প্রায়শই সীমিত সহায়তার কারণে খাদ্য উৎপাদনে হিমশিম খান। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের পণ্য পচনশীল হওয়ায় সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ফলে দুধ, ডিম, মাছ ও মাংসসহ নানা খাদ্যপণ্য অপচয়ের শিকার হচ্ছে।

তাদের জন্য পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বা অবকাঠামোগত সহায়তা নেই। যখন তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ করেন, তখন তারা পর্যাপ্ত মূল্য সহায়তা পান না, যা অপচয়ের দিকে নিয়ে যায়।’ এসময় উপদেষ্টা খাদ্য অপচয় কমাতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত করতে বৃহত্তর সমর্থন ও উন্নত অবকাঠামোর আহ্বান জানান।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ‘বাংলাদেশ মাটির উর্বরতা, অর্থ, পানি এবং শ্রম হারাচ্ছে। এ কারণে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য কম খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে এই জনগোষ্ঠী খাদ্য ঝুঁকিতে পড়ছে’।
সম্মেলনে ডেনমার্ক দূতাবাসের চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স মি. অ্যান্ডার্স কার্লসেন বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয়ের মাত্রা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘উৎপাদিত মোট খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট বা অপচয় হয়। এই খাদ্য উৎপাদনের জন্য চীন দেশের চেয়েও বড় এলাকা ব্যবহার করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত কেউ খায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু খাদ্যই অপচয় হয় না; উৎপাদন ও পরিবহনের সময় কৃষিজমি এবং গ্রিনহাউস গ্যাসও নষ্ট হয়।’ মি. কার্লসেন জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘পদক্ষেপ নেওয়ার সেরা সময় আজ। যদি গতকাল না হয়, তাহলে আজই।’
খাদ্য অপচয় ও অপচয়ের সমস্যা নিয়ে কথা বলার সময় এফএও-এর ডেপুটি প্রতিনিধি মি. দিয়া সানো খাদ্য অপচয়ের বৈশ্বিক ও স্থানীয় প্রভাব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্য বৈশ্বিক জনসংখ্যার ১.৫ গুণেরও বেশি মানুষকে খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট, তবুও অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠামো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, খাদ্য অপচয়ের কারণে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি রয়ে গেছে। উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও, খাদ্য অপচয়ের কারণে সবচেয়ে অভাবি মানুষের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য পৌঁছায় না।’ 
ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর মি. জেসি উড বাংলাদেশে খাদ্য অপচয়ের মাত্রা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ফসল তোলার পর ৮-১৫ শতাংশ চাল এবং ২০-৪০ শতাংশ ফল ও সবজি নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সবজি, মাছ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উৎপাদনে একটি শক্তিশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কোল্ড চেইনের কারণে দেশটিকে সেই পণ্যগুলোই আমদানি করতে হয়। এটি কৃষক এবং অর্থনীতি উভয়ের জন্যই একটি সুযোগের অপচয়।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন পরিবেশগত প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি আমরা খাদ্য অপচয় বাড়াই, তাহলে আমরা দুর্লভ পরিবেশগত সম্পদ নিঃশেষ করছি। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, তাই আমাদের জন্য খাদ্য অপচয় কমানো অপরিহার্য।’
সম্মেলনে সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাতের উদ্ভাবক, বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় ও অপচয় কমাতে কার্যকর কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।

প্যানেল হু

×