ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ৩০ এপ্রিল ২০২৪, ১৭ বৈশাখ ১৪৩১

তানভীর ইমাম

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে ফিরে আসা

প্রকাশিত: ০৩:৩৭, ১২ জানুয়ারি ২০১৮

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে ফিরে আসা

১০ জানুয়ারি। বাঙালীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশে ফিরে আসার দিবস। পাকিস্তানের কারাগারে ২৯০ দিন থাকার পর ১৯৭২ সালের এদিন বেলা ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। তিনি পাকিস্তান থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দিবাগত রাতে। এদিন ভোর রাতে বঙ্গবন্ধুকে বিমানে তুলে দেয়া হয়। সকাল সাড়ে ৬টায় তিনি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান। ১০টার পর তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এ্যাডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। ৯ জানুয়ারি তিনি ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি বিমানে দেশের পথে যাত্রা করেন। পাক হানাদাররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৫ মার্চ রাতেই তাঁর ধানম-ির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁকে প্রথমে এ্যাসেম্বলি বিল্ডিং-এ, পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি স্কুলের অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। ছয় দিন ধরে তিনি বন্দী ছিলেন সেই ঘরে। ১ এপ্রিল তাঁকে রাওয়ালপিন্ডি, পরে মিয়ানওয়ালী জেলে বন্দী করে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে বাইরের পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্য ছিল, শেখ মুজিবকে ভয় দেখিয়ে আপোস করতে বাধ্য করা ও তাঁর মুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে মীমাংসায় আসতে চাপ দেয়া। আর এতে সমঝোতা না হলে প্রহসনের বিচারের নামে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেয়া। বঙ্গবন্ধু বিষয়টি জানতেন। তাই নিজের পক্ষ সমর্থনের জন্য কোন আইনজীবী নিয়োগ করেননি তিনি। পাকিস্তান সরকার নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাঁর আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেয় আইনজীবী এ কে ব্রোহিকে। বিচারের রায় আগেই ঠিক হয়ে আছে, রায় নির্ধারিত বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরে কর্তৃপক্ষকে বললেন, ‘আমার লাশটা বাংলার মানুষের কাছে পাঠিয়ে দিও।’ নির্দিষ্ট দিনে শেখ মুজিব ও ব্রোহি দু’জনই আদালতে যেতেন। তারা আদালতে চুপচাপ বসে থাকতেন, তামাশা দেখতেন। সাক্ষীদের জেরা করা দূরের কথা, আইনজীবী আদালতে কথাই বলতে চাইতেন না। যদিওবা সাক্ষীদের দু-একটা প্রশ্ন করতেন, কিন্তু সাক্ষীরা প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে পারত না। এমনও ঘটনা ঘটেছেÑ মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে এসে পরিচিত এক ব্যক্তি শেখ মুজিবের দিকে তাকাতে পারেননি। আদালতে চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে ছিলেন। এমনও ঘটনা ঘটেছেÑ বঙ্গবন্ধুকে মানসিক চাপে ফেলার জন্য জেলখানার সেলের পাশে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছিল। ১৫ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের ফাঁসি কার্যকরের আদেশ দেয়। কিন্তু, ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে তার অনুগত বাহিনীর আত্মসমর্পণের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে। আত্মসমর্পণের উত্তেজনা আর দৌড়ঝাঁপের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ কার্যকর করতে দেরি হয়ে যায়। এই সুযোগে ওই জেলখানার জেলার বঙ্গবন্ধুকে জেলখানা থেকে সরিয়ে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে তাঁকে চাশমা ব্যারেজ কলোনিতে সরিয়ে নিয়ে যান। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হন জুলফিকার আলি ভুট্টো। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি বিপরীতমুখী দেখে ভুট্টো শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন শেখ মুজিবের কিছু হলে বাংলাদেশে বন্দী পাকিস্তানী সৈন্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের অনুগতরা সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না। ভুট্টো ১৯ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাওয়ালপিন্ডিতে সাক্ষাত করেন। প্রথম সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেন, ‘আমি মুক্ত কিনা বলুন’। ভুট্টো বললেন, ‘আপনি মুক্ত কিন্তু আমি আপনাকে যেতে দেয়ার আগে কয়েকদিন সময় চাই।’ আরেক মুহূর্তে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলছিলেন, ‘দুই অংশ এখনও আইন আর ঐতিহ্য দিয়ে যুক্ত।’ তখন শেখ মুজিব তাকে মনে করিয়ে দিলেন যেÑ ‘গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে আর এই ফলাফলকে কখনই শ্রদ্ধা করা হয়নি।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘যদি পাকিস্তান এখনও একটি দেশ হয়ে থাকে, তাহলে আপনি প্রেসিডেন্ট নন, সেটা আমি।’ এদিকে আন্তর্জাতিক নেতারা শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বার বার পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই বিশ্ব মিডিয়ায় শেখ মুজিব ছিলেন পরিচিত মুখ। তাঁর দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও বাকপটুতা তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হতে সাহায্য করে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিকভাবে প্রত্যক্ষ সহযোগিতাকারী পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকাও শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে পাকিস্তানের প্রতি অনুরোধ জানায়। ২৬ ডিসেম্বর শেখ মুজিবকে কলোনি থেকে হেলিকপ্টারে করে সিহালা অতিথি ভবনে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন ভুট্টো সেখানে এসে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে মুক্তির সংবাদ দেন। ৫ জানুয়ারি, ১৯৭২ প্রেসিডেন্ট ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে তৃতীয় এবং শেষবারের মতো দেখা করতে যান। শেখ মুজিব ভুট্টোকে বললেন, ‘আপনি অবশ্যই আমাকে আজকে রাতে মুক্তি দেবেন। আর দেরি করার কোন জায়গা নেই। হয় আমাকে মুক্ত করুণ নয় হত্যা করুন।’ ভুট্টো ৮ জানুয়ারি রাত তিনটার সময় শেখ মুজিবকে লন্ডনের উদ্দেশে বিমানে তুলে দেন। পরদিন সকাল সাড়ে ছয়টায় তারা এসে পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে। হিথরো বিমানবন্দরে এই মহানায়ককে বীরোচিত মর্যাদা দেন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ব্রিটিশ রাজকীয় এয়ারফোর্সের একটি বিমানে ঢাকার পথে থামলেন দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে। শেখ মুজিবকে বিনয়ী শ্রদ্ধা-সম্মান জানালেন ভারত ও তার জনগণ এবং বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী। আদায় করলেন সৈন্য প্রত্যাহারের ওয়াদা। বঙ্গবন্ধু ভারতের নেতাদের এবং জনগণের প্রতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের সহায়তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে জনগণের প্রত্যাশার জবাব দিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু আসবেন বলে বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স মাঠ পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকে লোকারণ্য; যেন মানুষের এক মহাসমুদ্র। বিমান থেকে বঙ্গবন্ধু নামার সঙ্গে সঙ্গে এক আবেগঘন ও আনন্দমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্লোগান, ফুলের মালা আর পুষ্প বৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেয়া হয়। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে নাড়তে রাস্তার দু’পাশের লাখ লাখ মানুষের অভিবাদন গ্রহণ করেন। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে দশ লাখ মানুষের সামনে তিনি ভাষণ দেন। এই সেই রেসকোর্স ময়দান, ৭ মার্চ যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। উপস্থিত মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় আবেগাপ্লুত শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালী জাতির এই ভালবাসার ঋণ শোধ করে যাব।’ ভাষণে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে পূর্ণ উদ্যমে দেশ গড়ার কাজে নেমে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে না পারলে প্রাপ্ত স্বাধীনতা মূল্যহীন হয়ে যাবে, তাই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে কাজ করতে সবাইকে তিনি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ইনশাল্লাহ! স্বাধীন যখন হয়েছি তখন স্বাধীন থাকব। একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে কেউ আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবে না। ...এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’ বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের একটা সঙ্কটও দূর হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ‘ফাদার ফিগার’। যুদ্ধ-পরবর্তী দেশ গড়তে ও উন্নতির চাকা চালু করতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব গ্রহণ ছিল সময়ের দাবি। তাই এই মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ান এক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছিল- ‘তাঁর এই মুক্তি বাংলাদেশকে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। শত্রুর কারাগারে বন্দী, কিন্তু তার নামে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন এবং কোনরূপ পণ না দিয়ে শত্রু সেই মহানায়ককে সসম্মানে ফেরত পৌঁছানোর ঘটনা বিশ্বে শুধু একটিই।’ বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৬ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি সিডনি এইচ শেনবার্গের কাছে এক সাক্ষাতকারে বলেছেনÑ ‘সেই চরম মুহূর্তে তাঁর সামনে দুটো পথ খোলা ছিল। ভারত গমন অথবা বন্দিত্ব বরণ। তিনি বন্দিত্ব বরণ করেন।’ তিনি আরও বলেন যে, ‘তাঁকে আটক করতে না পারলে ঢাকাসহ দেশের বহু লোককে হত্যা করত। তাঁকে যেভাবে গোয়েন্দারা অনুসরণ করেছিল তাতে তাঁর পক্ষে পালানোর চেষ্টা হলে হত্যা করে বাঙালীদের ওপর দোষ চাপাত।’ এটি প্রমাণিত সত্য যে, মুজিবকে বন্দী করা ছিল পাকিস্তানের প্রথম পরাজয়। এর প্রমাণ মূল নেতাকে আটক এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাহার করা যায়নি। লেখক : সংসদ সদস্য, সিরাজগঞ্জ-৪
×