ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

চীনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র রূপ নেবে

প্রকাশিত: ০৪:১৪, ১০ অক্টোবর ২০১৭

চীনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র রূপ নেবে

ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার প্রতিশ্রুতিমতো আমেরিকায় চীনের রফতানি করা সমস্ত পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক বসাতেন তা হলে দুদেশের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। সৌভাগ্যক্রমে তিনি এ ব্যাপরে ইতস্তত করছেন। অংশত এর কারণ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ ঠেকাতে তিনি চীনের সাহায্য চান। কিন্তু এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। চীনের শিল্পশক্তি এখন আমেরিকার জন্য হুমকিস্বরূপ। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি চীনকে এমন এক নজিরবিহীন হুমকি বলে আখ্যায়িত করেছেন যা প্রচলিত বাণিজ্য বিধির দ্বারা প্রশমিত করা সম্ভব নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও চীনের শক্তিতে উদ্বিগ্ন। তারা বিদেশী বিনিয়োগের ওপর আরও কঠোর বিধি আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে। তার ওপর অর্থনীতির আধুনিকায়নে চীনের কৌশল এসব দেশের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এসব বিষয় নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে চলছে উত্তেজনা। এসব উত্তেজনার মর্মমূলে রয়েছে একটি সহজ সত্য। সারা বিশ্বের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তরফ থেকে আগের চেয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়েছে। চীনই যে প্রথম শিল্পায়িত দেশ তা নয়। কিন্তু এত ব্যাপক পরিসরে এত দ্রুত উন্নতি আর কোন দেশ কখনই করেনি। এক দশকেরও কিছু আগে চীনের সেসব শহর শিল্প ও ব্যবসায় জন্য সরগরম ছিল সেগুলোতে তৈরি হতো জিপার, মোজা ও সিগারেট লাইটার। আজ দেশটি মোবাইল পেমেন্টে থেকে চালকহীন গাড়ি পর্যন্ত সবকিছুতে বিশ্বে আধুনিক প্রযুক্তির পুরোধায় চলে এসেছে। চীনের এসব অর্জন একদিকে বিস্ময় যেমন জাগাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীরা হুমকিগ্রস্ত হচ্ছে যে চীন শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বসবে তারা আর ওদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারবে না। বিশেষ করে ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের বিজয়ের পর বিভিন্ন দেশের সরকার বেকারত্বের প্রভাব এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব সংকুচিত হয়ে আসায় উদ্বিগ্ন। চীনের চ্যালেঞ্জের আসল প্রকৃতিটা কি তা নিয়ে সবাই বিশ্লেষণে ব্যস্ত। সন্দেহ নেই এই চ্যালেঞ্জের একটা রূপ আছে। বহু বছর ধরে চীন তার মুদ্রাকে সস্তা রেখেছে। এতে রফতানিকারকদের সুবিধা হয়েছে। তাদের রফতানিতে তেজীভাব চলছে। চীন তার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বৃহৎ কোম্পানিগুলোকে স্বল্পসুদে ঋণ দিয়ে অর্থ যোগায়। এর সাইবার গুপ্তচররা গোপন তথ্য চুরি করে। তারপরও চীনকে অগণতান্ত্রিক, রাষ্ট্র পরিচালিত একটি দানব যে চৌর্যবৃত্তি করেও প্রতারিত করে সামনে এগিয়ে চলেছে। এমনিভাবে চিত্রিত করাটা বড়ই স্থূল ও সেকেলে। চীনে দেশীয় বেসরকারী মালিকানাধীন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন বিপুল সংখ্যক উদ্যোক্তার আবির্ভাব হয়েছে। এরা অর্থনীতির চাকাকে প্রবল গতিতে সামনের দিকে নিয়ে চলেছে। এত কিছুর পরও অস্বীকার করার উপায় নেই যে চীনের প্রতিযোগিতার তিনটি দিক আছে। একটা হলো বেআইনী প্রতিযোগিতা, দ্বিতীয়ত তীব্র বৈধ প্রতিযোগিতা, তৃতীয়ত অন্যায় প্রতিযোগিতা। চীন অন্যদের মেধাস্বত্ব চুরি করছে এমন সংবাদ প্রায়ই পত্রিকার শিরোনাম হয়। ২০১৪ সালে অভিযোগ ওঠে যে চীনের পাঁচজন সামরিক অফিসার আমেরিকার পারমাণবিক, সৌর ও ধাতব প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে। ভাল খবর হচ্ছে এ জাতীয় অভিযোগ এখন অনেক কমে এসেছে। দ্বিতীয়ত তীব্র বৈধ প্রতিযোগিতাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ দিয়েছে যে তারা কম দামে অনেক ভাল মানের পণ্য তৈরি করতে পারে। চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিসি) যোগ দেয়ার পর ১৫ বছরে ক্রেতা পর্যায়ে টিভির দাম ৯০ শতাংশ কমেছে। বৈশ্বিক রফতানিতে চীনের ভাগ বেড়েছে ১৪ শতাংশ। ১৯৬৪ সালে আমেরিকার পর যে কোন দেশের জন্য এটা সর্বোচ্চ। টেক্সটাইলের মতো নিম্নমূল্যের শিল্পের ওপর চীন তার আধিপত্য হারানোর ফলে রফতানির এই ভাগ হ্রাস পেতে পারে। তবে হাইটেক শিল্পে চীন নতুন সুনাম অর্জন করছে। এই টেক শিল্পের হাতে তথ্যের বিশাল ভা-ার রয়েছে। সে তথ্য সৃষ্টি করে চলেছে চীনের কোটি কোটি লোক। আপনি জার্মানিতে গাড়ি তৈরি করেন, আমেরিকায় সেমিকন্ডাক্টর আর জাপানে রোবোট তৈরি করেন ভবিষ্যতে আপনার প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বী যে চীনারা হবে সেই সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি। সূত্র : দি ইকোনমিস্ট
×