রবিবার ৯ কার্তিক ১৪২৮, ২৪ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

এক তরুণ সৈনিকের আত্মত্যাগের কাহিনী

  • ফয়সাল শাহরিয়ার

‘এখন যৌবন যার,/যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ : হেলাল হাফিজ

৩০ মার্চ, ১৯৭১। সকাল ১১টা। ৩য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তরুণ বাঙালী সেকেন্ড লেফটেন্যান্টে সিরাজুল ইসলাম উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর ক্যান্টনম্যান্টে তার অফিস কক্ষে বসে টেবিলের টেলিফোন সেটটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। সেদিন সকাল থেকে ইতোমধ্যে কয়েক বার নিকটবর্তী রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৩তম ব্রিগেড হেড কোয়ার্টার থেকে কয়েক বার তার কাছে টেলিফোন এসেছে। লেফটেন্যান্টে সিরাজের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তার টেবিলের টেলিফোনটি আবার বেজে উঠলো। অপরপ্রান্ত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক কর্মকর্তা তাকে অসহিষ্ণু কণ্ঠে অবিলম্বে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত ২৩তম ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের রিপোর্ট করার নির্দেশ প্রদান করলেন। টেলিফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখে লেফটেন্যান্টে সিরাজ কিছুক্ষণের জন্য গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। বিগত দুদিনে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন আনোয়ারের (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) কাছে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে একই ধরনের নির্দেশ এসেছে। কিন্তু ২৫ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে নিরস্ত্র বাঙালী জনগণের উপরে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণ-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেন আনোয়ার রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

একজন কনিষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা (কমিশন প্রাপ্তি ২১/০৬/১৯৭০ইং তারিখে) হিসেবে উক্ত পরিস্থিতিতে তার করণীয় প্রসঙ্গে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সিরাজুল ইসলাম যথেষ্ট দ্বিধান্বিত ছিলেন। অবশেষে তিনি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১০ সৈনিকসহ ৩০ মার্চ দুপুরে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে যেতে মন স্থির করেন। কিন্তু ঐ সতর্কতা তার প্রাণ রক্ষায় সহায়তা করেনি। ৩০ মার্চ, ১৯৭১ ছিল তার জীবনের শেষ দিন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর।

লেফটেন্যান্ট সিরাজের পারিবারিক ইতিহাসের পটভূমিতে ঐ পরিণতি অন্তত আংশিকভাবে অপ্রত্যাশিতরূপে প্রতীয়মান হয়। দশ ভাই বোনের মধ্যে অষ্টম সিরাজুল ইসলাম ১৯৪৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার গেন্ডারিয়ায় অবস্থিত পিতৃগৃহে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আমিনুল ইসলাম বিভাগ-পূর্বকালে ব্রিটিশ ভারতে জুডিশিয়াল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। আমিনুল ইসলাম তার কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তদানিন্তন অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন মফস্সল শহরে কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সিরাজুল ইসলামের জন্মকালে তার পিতা আমিনুল ইসলাম তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সচিবালয়ের আইন মন্ত্রণালয়ে একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সিরাজুল ইসলামের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার সেন্টগ্রেগরী স্কুলে। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে আমিনুল ইসলাম তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত করাচিতে বদলি হলে পুত্র সিরাজুল ইসলাম এক বছর করাচির স্কুলে পড়াশোনা করেন। পিতা আমিনুল ইসলাম ১৯৬২ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে বদলি হলে সিরাজুল ইসলাম রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত সেন্টম্যারিস একাডেমিতে তার স্কুল জীবনের শেষ পর্যায় শুরু করেন।

রাওয়ালপিন্ডির সেন্টম্যারিস একাডেমিতে ছাত্র থাকাকালীন সময়েই সিরাজুলই সলামের ব্যক্তিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল প্রধানত বিদ্যায়তন কেন্দ্রিক এবং বেসামরিক পেশানির্ভর। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডির সেন্টম্যারিস একাডেমিতে অধ্যয়নকালীন সময়ে সিরাজের চরিত্রের বহির্মুখী বৈশিষ্টসমূহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি খেলাধুলায় অত্যন্ত ভাল ছিলেন এবং কোন চ্যালেঞ্জের সামনেই পিছপা হতেন না। সিরাজুল ইসলাম সেন্টম্যারিস একাডেমির ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সিরাজের পিতা আমিনুল ইসলাম ১৯৬৪ সালে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরে ১৯৬৫ সালে ইসলামাবাদে তদানিন্তন পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসেবে যোগদান করেন।

সিরাজুল ইসলাম ১৯৬৫ সালে রাওয়ালপিন্ডির সেন্টম্যারিস একাডেমী থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে রাওয়ালপিন্ডির ঐতিহাসিক গর্ডন কলেজে ভর্তি হন। গর্ডন কলেজের ছিল সমৃদ্ধ সামরিক ঐতিহ্য; ব্রিটিশ আমল থেকেই গর্ডন কলেজের অনেক ছাত্র সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছেন এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তরুণ সিরাজুল ইসলাম গর্ডন কলেজের ঐ সমৃদ্ধ সামরিক ঐতিহ্য দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। সিরাজ গর্ডন কলেজেও কলেজ ফুটবল দলের একজন নিয়মিত সদস্য ছিলেন।

রাওয়ালপিন্ডির গর্ডন কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে সিরাজুল ইসলাম ঢাকার নটর ডেম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ¯œাতক কোর্সে ভর্তি হন। তাঁর পিতা আমিনুল ইসলাম ইতিমধ্যে ১৯৬৮ সালে সরকারী চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন।

সিরাজুল ইসলাম ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা করার পরে ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসেকাকুলে অবস্থিত পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে ২৩তম বিশেষ কোর্সে একজন ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ২৩তম বিশেষ কোর্সের ১৩৭ জন ক্যাডেটের মধ্যে ৩৫ জন ছিলেন বাঙালী। পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে তখন বাঙালী ক্যাডেটদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণ প্রচলিত ছিলো। তরুণ সিরাজুল ইসলাম ঐ সকল প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার জন্য অন্য বাঙালী ক্যাডেটদের সর্বদাই উৎসাহিত করতেন।

নয় মাস প্রশিক্ষণ লাভের পরে সিরাজুল ইসলাম ১৯৭০ সালের ২১ জুন তারিখে ২৩তম বিশেষ কোর্সে দ্বিতীয় স্থান অধিকর করে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।

কমিশন লাভের পরে সিরাজুল ইসলামকে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে পদায়ন করা হয়। ৩০ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত সিরাজুল ইসলাম উক্ত ব্যাটালিয়নেই পদস্থ ছিলেন।

৩০ মার্চ, ১৯৭১ এর ঘটনাবলী

৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শক্তি হ্রাসের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সেনা কর্তৃপক্ষ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেই উক্ত ব্যাটালিয়নের ব্র্যাভো ও ডেলটা কোম্পানিকে দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাটে প্রেরণ করে। অপর একটি কোম্পানিকে একই সময়ে পার্বতীপুরে প্রেরণ করা হয়। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত হেড কোয়ার্টার কোম্পানিতে বাঙালী সেনাকর্মকর্তা ছিলেন শুধু ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন আনোয়ার (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) এবং অ্যাডজুট্যান্ট সেকেন্ড লেফটেনেন্ট সিরাজুল ইসলাম। স্পষ্টতই ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যেই প্রথমে ক্যাপ্টেন আনোয়ার এবং পরবর্তীতে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট সিরাজকে বারংবার রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারে রিপোর্ট করার নিদের্শ প্রদান করা হয়।

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ দুপুরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সিরাজুল ইসলাম ১০জন সৈনিকসহ রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৩তম ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের উদ্দেশে যাত্রারম্ভ করেন। রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছানো মাত্রই তাদেরকে বন্দী করা হয়। পরবর্তীতে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করার পরে মাটিচাপা দেয়া হয়। এদের মধ্যে শুধু একজন সৈনিক পরবর্তীতে মাটিফুড়ে বের হয়ে বদরগঞ্জে মূল ব্যাটালিয়নের সঙ্গে যোগদান করে বীরত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।

সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সিরাজুল ইসলামের মরদেহের সঠিক অবস্থান আজও তাঁর পরিবারের কাছে অজ্ঞাত রয়ে গেছে। তবে নিঃসন্দেহে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম শহীদদের একজন। জন্মভূমির জন্য আত্মদানকারী ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঐ সকল যোদ্ধাদের সম্মানে একটি স্মৃতি সৌধ স্থাপন করার বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারেন।

শীর্ষ সংবাদ:
‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’         বিপর্যস্ত তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শনে বাপাউবোর প্রতিনিধি দল         অপরাধী যেই দলেরই হোক তার বিচার হবে ॥ আইনমন্ত্রী         যুক্তরাষ্ট্রসহ ১০ দেশের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করল তুরস্ক         আমিরাত গেলেন অর্ধলক্ষাধিক যাত্রী         বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়াবে ॥ শিক্ষামন্ত্রী         জাতির পিতার স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করব ॥ প্রধানমন্ত্রী         নোয়াখালীতে মন্দিরে হামলা ॥ ৩ আসামির ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি         পায়রা সেতু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী         সম্প্রতি সিনেমার সেটে ঘটে গেল বাস্তবে মর্মান্তিক এক মৃত্যু         কলম্বিয়ার মাদক সম্রাট অ্যাতোনিয়েল অবশেষে আটক         যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাগুলিতে নিহত ১         শ্যামলীতে মোটরসাইকেল শোরুমে ডাকাতি, গ্রেফতার ৬         রাজধানীতে মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার ৭৪         জাতিসংঘ দিবস আজ         সিরাজগঞ্জে ট্রাকচাপায় বিমান বাহিনীর সদস্যসহ নিহত ২         আসুন আমরা জাতিসংঘকে আমাদের আশার বাতিঘর বানাই ॥ প্রধানমন্ত্রী         সংহতির মাধ্যমেই এগিয়ে যেতে হবে ॥ জাতিসংঘ মহাসচিব         গত ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় মারা গেছেন ৫ হাজার ৮৮৯ জন         দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই