ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

ফুটন্ত লাভায় বসবাস

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

 ফুটন্ত লাভায় বসবাস

রাজন ভট্টাচার্য ॥ নিমতলী ট্র্যাজেডির নয় বছর পরও নিরাপদ হয়নি পুরান ঢাকা। নিরাপত্তা ঝুঁকি আর আতঙ্কের মধ্যে এই এলাকার মানুষের বসবাস। সর্বশেষ চকবাজারের ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্কের মাত্রা বেড়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে; এমন আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে বিশেষজ্ঞ মহল থেকেই। এর বড় বাস্তবতা হলো ২০১০ সালে নিমতলী অগ্নিকান্ডে ১২৪ জনের মৃত্যুর পর থেকে জোরেশোরে শোনা যায় পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম সরিয়ে নেয়ার কথা। পুরো এলাকাটি নিরাপদ করতে নানা পদক্ষেপ ও পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, শিল্প সচিবসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বেশ কয়েকবার গুদাম সরানোর ঘোষণা দেন। কিন্তু সঙ্কট সমাধান হয়নি আজও। যার ফলশ্রুতিতে ফের প্রাণহানি। অকালে ঝরে গেল ৭০টির বেশি তাজা প্রাণ। প্রশ্ন হলো ২০১০-২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ সময়ে সঙ্কটের কোন সমাধান মেলেনি। বরং গোটা পুরান ঢাকায় বারোয়ারি সমস্যার মাত্রা বেড়েছে। বেড়েছে কেমিক্যালের গোদামের সংখ্যাও। পাল্লা দিয়েছে প্লাস্টিক, কাগজ, পারফিউম, গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল, স্প্রিড থেকে শুরু করে দাহ্য পদার্থের মজুদ। ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। ঘনবসতি বোঝা তো রয়েছেই। যানজট, অনুমোদনহীন গ্যাস ও অবৈধ বিদ্যুত সংযোগ তো দুর্যোগের মাত্রা বাড়ানোর জন্য পা বাড়িয়ে আছে। নয় বছরে একটি গলির পরিধিও বাড়েনি। এত সঙ্কট যখন সামনে দাঁড়িয়ে তখন আবারও কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন হবে এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সেইসঙ্গে একাধিক তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তাও দেখার বিষয়। ইতোমধ্যে মেয়র ও বাণিজ্যমন্ত্রী আগুন লাগা ভবনে কেমিক্যালের গোডাউন থাকা না থাকা প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। যদিও শুক্রবার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানিয়েছেন, কেমিক্যালের গোডাউনের কারণেই অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা এত বেশি। পুরান ঢাকার নিমতলীর ঘটনার পর আরও সতর্কভাবে নজরদারি চালানো হলে চকবাজারের অগ্নিকান্ডে বিপুল প্রাণহানি হয়ত এড়ানো যেত, সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও তা মানছেন। তিনি বলেছেন, কোন কিছু দেশে ঘটলে যেহেতু সরকার ক্ষমতায় আছে, দায় তো সরকার এড়াতে পারে না। এটা তো সত্য কথা। কিন্তু জনসাধারণ যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদেরও সচেতন হওয়া দরকার। কারণ তাদের এখানে জীবিকার চেয়ে জীবনের ঝুঁকি বেশি। সেখানে সচেতনতা ও সতর্কতার বিষয় ছিল। পাশাপাশি যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়ায় এর বিকল্প কী হতে পারে, তা ভেবে দেখার কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। কাল বিলম্ব না করে পুরান ঢাকার সব রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, যেটা হয়ে গেছে এবং যারা চলে গেছে, ক্ষয়ক্ষতি যা হয়ে গেছে সেটা তো আর ফেরত দেয়া যাবে না। এখন ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বুধবার রাতে চকবাজারে একটি ভবনে থাকা কেমিক্যালের গুদামে আগুন লাগার পাশাপাশি আরও চারটি ভবনে তা ছড়িয়ে যায়। গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাতের কথা বলা হলেও এর ভয়াবহতা বাড়ার জন্য বেশি পরিমাণ দাহ্য পদার্থ মজুদ থাকাকেই দায়ী করা হচ্ছে। এখন আগুন লাগা ভবনসহ আশপাশের এলাকাজুড়ে পুড়ে যাওয়া দাহ্য পদার্থের হাজারও স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পুরান ঢাকায় কোন ধরনের দাহ্য পদার্থ ও কেমিক্যালের গুদাম থাকতে দেয়া হবে না বলে ফের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেন, ‘এসব গুদাম উচ্ছেদের জন্য কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এ ধরনের ঘোষণা আজকে দেয়ার দরকার হতো না, যদি নিমতলীর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া হতো। কেবল দাহ্যবস্তু সরিয়ে নেয়ার মনোযোগী না হয়ে আগুনের সূত্রপাতের কারণের দিকেও মনোযোগ দেয়া জরুরী। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার পরিবেশ যেকোন মূল্যে নিরাপদ করতে হবে। তারা বলছেন, ভবন থেকে বের হতে না পারায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ পুড়ে মারা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ে স্থানীয়রা যদি নিজেরা কাজ করে তাহলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। ২০১৪ সালের ৩ জুন শিল্প সচিব বলেছিলেন, কেমিক্যাল পল্লীতে সাততলা ১৭টি ভবন তৈরি করে গুদাম সরানো হবে।’ পরের বছর ২ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জে ২০ একর জায়গায় পল্লী স্থাপন করার কথা বলেন তিনি। ২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারিতে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘১ মার্চ থেকে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম স্থানান্তরের কাজ শুরু হবে। এর কয়েকদিন পরই তিনি সব কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন। ঘোষণা দিয়েও বছরের পর বছর তা কার্যকর না করতে পারার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাঈদ খোকন বলেন, ওই এলাকায় শত শত বাড়িতে কেমিক্যাল রাখা হয়। আমাদের পক্ষে তো এত নজরদারি করা কঠিন। তারপরও আমরা এবার উদ্যোগ নিয়েছিলাম ওই এলাকার প্রতি বাড়ি ধরে ধরে ইন্সপেকশন করব। অলরেডি কাজও শুরু করে দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ করেই এই দুর্ঘটনা ঘটে গেল। ২২ হাজার অবৈধ গুদাম ॥ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসাবে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম আছে। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার শিক্ষক ও দুর্যোগ পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, ‘মূল সমস্যা হচ্ছে অগ্নি ব্যবস্থাপনা। কেমিক্যাল থাকলে বা না থাকলেও আগুন ধরতে পারে। কাজেই গুদাম সরিয়ে নিয়ে যেখানে যাবে সেখানেও তো আগুন লাগতে পারে। আমাদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে। চকবাজারে অগ্নিকান্ডের ধ্বংসস্তূপ নিমতলীর মতোই এখানেও মানুষ বের হতে না পেরে মারা গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিস্টেমগুলো কাজ করছে না। চোরের ভয়ে প্রত্যেক বাড়িতে এমনভাবে গ্রীল দিয়েছে যে আগুন লাগলে তা ভেঙে বের হওয়ার অবস্থা নেই। এগুলো নিয়ে কেউ কথা বলে না। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কোন জায়গায় দমকল বাহিনী আগুন নেভানোর আগেই অনেক কিছু ঘটে যায়। ফলে কমিউনিটিভিত্তিক একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার শক্তিশালী, তারা চাইলেই এটি করতে পারে।’ বাপা’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন বলেন, কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নিতে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এই দুর্ঘটনা। ২০১০ সালের নিমতলীর ঘটনার পর দাহ্য পদার্থের গুদাম আলাদা জায়গায় সরিয়ে নেয়া হবে সিদ্ধান্ত ছিল। কেমিক্যাল পল্লীর কথাও শুনেছিলাম। তারপর ভেতরে ভেতরে কী হলো আমরা জানি না। ব্যবসায়ী মহলকে সহাযোগিতা করতে হবে। জীবনের বিনিময়ে ব্যবসা করা ভাল না। এত মানুষ নিহতের ঘটনায় দায় তাদেরও আছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন গবেষক আফসান চৌধুরী। তার মতে, ‘এই দুর্ঘটনার দায় গোটা ব্যবস্থার। আমাদের চোখে কী পড়ছে না তা? নিমতলীর ঘটনার পর ৩৮টি সুপারিশ দেয়া হয়েছিল। সেগুলোর কয়টা বাস্তবায়ন হয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এসব দাহ্য পদার্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। প্রশ্ন হলো, ফিরে যেন না আসতে পারে সেটা দেখবে কে?’ কেমিক্যাল পল্লীতে সরিয়ে নেয়ার কাজ কতদূর প্রশ্নে শিল্প সচিব আব্দুল হালিম বলেন, কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্পটি ২০২১ সাল পর্যন্ত। ৫০ একরের প্রজেক্ট। প্রায় ৯৫০ গুদাম সরানো যাবে। ২০২১ সালের মধ্যেই গুদাম সরবে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, প্রকল্পটি ২০২১ সাল পর্যন্ত। সরিয়ে নেয়ার কাজ সহজ হবে না। তারা এই ব্যবসা নিয়ে দূরে যেতে চান না। আগুন নেভানোর অভিযানে থাকা ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগীয় উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধণ মনে করছেন, ঘনবসতিপূর্ণ ওই এলাকায় যে পরিমাণ দাহ্যসামগ্রী মজুদ ছিল, তাতে ভয়ঙ্কর এ ঘটনার ক্ষেত্র হয়ত আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবীব মনে করছেন, ২০১০ সালে রাসায়নিকের গুদামে ঠাসা নিমতলীর অগ্নিকান্ডে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পর তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেয়ায় এবারের ঘটনা আগের মতোই ভয়াবহ রূপ পেয়েছে। নিষ্ক্রিয়তার শাস্তি ॥ নিমতলী ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পর তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি ৯ বছরেও। সে কারণেই চুড়িহাট্টার আগুন এত ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করেন স্থপতি ইকবাল হাবীব। তিনি বলেন, ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে, এটাই হলো বড় ঘাটতি। ঘাটতিটা এখন এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে নয় বছর ধরে আমরা পুনরাবৃত্তি করার পরও এই কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে পারলাম না। জনসাধারণও একইভাবে নির্লিপ্ত। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে যখন আপনি অদৃষ্টবাদিতায় নিজেকে সমর্পণ করবেন, প্রতিরোধ গড়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি গা ছেড়ে দেবেন, তখন ওটাকে আত্মাহুতি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। অদৃষ্টবাদিতার জন্যই হত্যাকান্ডগুলো ঘটে চলেছে। আমাদের নিষ্ক্রিয়তার হত্যাকান্ড, অবহেলার হত্যাকান্ড। নিমতলীর অগ্নিকান্ডের সঙ্গে চকবাজারের ঘটনাকে মিলিয়ে দেখার কথা বলেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক শাকিল নেওয়াজও। ঘটনাস্থলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা আমাদের ভাল একটা লেসন দিয়েছে, ওয়েকআপ কল দিয়েছে, তোমরা সতর্ক হও। বৃহস্পতিবার বিকেলে অগ্নিদগ্ধদের দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে গিয়ে আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানাগুলো সরাতে শীঘ্রই উদ্যোগ নেয়া হবে। পুরান ঢাকার মানুষদের এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়া উচিত। আমি যতটুকু শুনেছি এবং জানি, খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। কীভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে যারা এখানে রয়ে গিয়েছে বৈধ-অবৈধ যেভাবে হোক না কেন, তাদের এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও নেয়ার বিষয় প্রক্রিয়াধীন আছে বলে আমি শুনেছি। অগ্নিকান্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচটি তদন্ত কমিটি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত সচিব মফিজুল হকের নেতৃত্বে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১২ সদস্যের কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। উপ-পরিচালক (অপারেশন্স) দিলিপ কুমার ঘোষকে প্রধান করে গঠিত ফায়ার সার্ভিসের তিন সদস্যের কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে হবে সাত দিনের মধ্যে। আর সুরক্ষা-সেবা বিভাগের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে আছেন অতিরিক্ত সচিব (অগ্নি অনুবিভাগ) প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী। তাদের সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১১ সদস্যের কমিটিকে অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে আবারও একটি প্রশ্নবোধকের জন্ম হয়েছে। তা হলো সুপারিশ বাস্তবায়ন আর নিরাপদ পরিবেশ শেষ পর্যন্ত হবে কিনা। একই সঙ্গে এক সময়ের আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকা নানা কারণে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এই এলাকাটি আবাসিক না বাণিজ্যিক হিসেবে থাকবে এই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় স্থানীয় মানুষ। কেমিক্যালই কাল হলো ॥ চকবাজারের ওয়াহিদ ম্যানশনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) তদন্ত কমিটির সদস্য। শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনে এসে তিনি এ মন্তব্য করেন। জুলফিকার রহমান বলেন, ভবনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের পদার্থ ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এছাড়া অন্য কেমিক্যালও ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে। এগুলো আগুনকে টিগার করেছে, যে কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কেমিক্যালের কারণে এভাবে ছড়িয়েছে। না হলে কখনই আগুনে এভাবে ছড়ায় না। তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি এখানে যে জিনিসগুলো আছে সেগুলো অবশ্যই কেমিক্যাল। কমিটির আরেক সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেছেন, ‘আমরা বিভিন্ন ভবন পরিদর্শনকালে দেখেছি ৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াহিদ ম্যানশনের প্রথম ও দ্বিতীয়তলার কলাম এবং বিনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভবনটা ব্যবহার করা যাবে কিনা তা আগামী সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত বলা যাবে। এছাড়া অন্য ভবনগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে শক্তি দরকার তা আছে বলে আমরা মনে করি। আমরা ঘুরে দেখলাম ওয়াহিদ ম্যানশন একটি অনেক বড় বিল্ডিং এটি কমপক্ষে ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত। এ ধরনের ভবনের মধ্যে মাত্র একটি সিঁড়ি, যা পর্যাপ্ত না। ভবনের দ্বিতীয় তলাটা পুরোটাই গুদাম ছিল। ওই ভবনে আগুন নির্বাপণের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না।’ রাজউকের অথরাইজড অফিসার নুরুজ্জামান জাহিদ বলেন, ‘এই ভবনটি রাজউক অনুমোদিত কিনা আমরা ওভাবে এখনও তথ্য নিতে পারি নাই। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে আসলে তারা অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছেন কিনা। ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এলাকাবাসীকে অনুরোধ করেছেন তারা যাতে এই কমিটিগুলো সরিয়ে নেন। এখানে কিন্তু কোন কেমিক্যালের লাইসেন্স দেয়া হয়নি। কোন লাইসেন্স রিনিউ করা হয়নি। এগুলোর জন্য আলাদা কমিটি হয়েছে। কেন আগুন লেগেছে এবং কারা এই ঘটনার জন্য দায়ী কমিটি সে বিষয়ে তদন্ত করবেন।