ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

উনিশ শতকের স্থাপত্য সৌন্দর্যে বিমোহিত পর্যটক

মাহবুবুর রহমান রানা

প্রকাশিত: ২৩:৩৩, ১৮ মে ২০২৪

উনিশ শতকের স্থাপত্য সৌন্দর্যে বিমোহিত পর্যটক

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। কালের সাক্ষী এমন নিদর্শন দেখতে শত শত পর্যটকের পদচারণায় প্রায় প্রতিদিন বাড়িটি মুখরিত থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে ভ্রমণপিয়াসী পর্যটকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বেড়াতে আসেন। বিদেশীরাও দর্শনার্থী হয়ে ঐতিহ্যম-িত এই জমিদার বাড়িতে আসেন। 
বালিয়াটি জমিদার বাড়িটি প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৪ বর্গমিটার জমির ওপর ছড়িয়ে থাকা সাতটি দক্ষিণমুখী দালানের সমাবেশ। এগুলো ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতকের প্রথমভাগের বিভিন্ন সময় জমিদার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। ঊনিশ শতকের স্থাপত্য কৌশলের একটি অন্যতম নিদর্শন। প্রায় দুশ’ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়িটি দেখলে তৎকালীন সময়ের মানুষের জীবন-জীবিকা, চাল-চলন, আনন্দ-বিনোদন আর শৌখিনতার পরিচয় পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বালিয়াটি জমিদার পরিবারের গোড়া পত্তন করেন গোবিন্দ রাম সাহা। তিনি একজন ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে বাড়িটি নির্মাণ করেন গোবিন্দ রায়ের পরবর্তী বংশধর দাধী রাম, প-িত রাম, আনন্দ রাম ও গোলাপ রাম। এ ছাড়া, পরিবারটির অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনÑ নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী, বৃন্দাবন চন্দ্র, জগন্নাথ রায়, কানাই লাল, কিশোরি লাল, হীরা লাল রায় চৌধুরী, ঈশ্বর চন্দ্র রায় চৌধুরী, হরেন্দ্র কুমার রায় প্রমুখ।

বালিয়াটির এই জমিদার পরিবারটি তৎকালীন শিক্ষা খাতে উন্নয়নে বিখ্যাত ছিল। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিশোরি লাল রায় চৌধুরীর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরী। তার নামানুসারেই  প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছিল।
জমিদার বাড়ির প্রাসাদগুলোর ভবন একসঙ্গে স্থাপিত হয়নি। এর অন্তর্গত বিভিন্ন ভবন, জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকার কর্তৃক বিভিন্ন সময় স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে সপরিবারে ভারত চলে যায় জমিদার বাড়ির লোকজন। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১৯৮৭ সালে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর জমিদার বাড়িটির দায়িত্ব অধিগ্রহণ করে। সেই থেকে তারা এর রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন। বর্তমানে প্রাসাদের কেন্দ্রীয় ব্লকটি প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 
অন্দরমহলে দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে জমিদারদের ব্যবহৃত কয়েকটি পালংক, নকশাখচিত কাঠের আলমারি, শ্বেত পাথরের নির্মিত টেবিল, টেবিলের ওপর সাজানো স্ফটিকের তৈরি কয়েকটি গাভি, হ্যাজাক হারিকেন, খানদানি চৌকি, নকশা সংবলিত কেদারা, ভগ্নপ্রায় সিংহাসন, ছোট-বড় শাল কাঠের তৈরি বাক্সসহ অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন।

অন্দরমহলে প্রবেশের আগে শতাধিক সিন্দুক পেরিয়ে ওপরের তলায় উঠে দক্ষিণা বাতাসে পর্যটকরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। এ ছাড়া, জমিদার বাড়ির ভেতরের ভবনে রয়েছে বন্দীশালা, গোলাঘর, রংমহল, দরবার হল ও অন্দরমহল। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফুল ও ফলের বাগান। রয়েছে শান বাঁধানো চার ঘাটলা বিশিষ্ট বিশাল আকারের একটি দীঘি।
জমিদার বাড়ির ভেতরে রয়েছে বিশাল একটি নাট্যমঞ্চ। যেখানে এক সময় গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিভিন্ন নাটকের আয়োজন হতো। প্রায়ই দেশের খ্যাতিমান পরিচালকদের চলচ্চিত্র, নাটক, টেলিফিল্মের শুটিং করতে দেখা যায় এ বাড়িতে। তবে, শূটিং বা অন্য কোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হলে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

জমিদার বাড়িতে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, প্রতিটি স্থাপনার সৌন্দর্য সহজেই সবার নজর কেড়ে নেয়। শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছু সময়ের জন্য প্রশান্তি পেতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ঘোরাফেরা করতে পারায় আনন্দটা অনেক বেড়ে যায়। প্রায় সারাবছরই দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এখানে দলবেঁধে ঘুরতে আসেন।এ ছাড়া, শিল্প-কারখানার মালিক-কর্মচারীরাও পিকনিক করতে আসেন শীত মৌসুমে।

বালিয়াটির এই জমিদার বাড়িটিকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে উঠেছে প্রায় শতাধিক খাবার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমিদার বাড়ির সামনে চটপটি, ফুচকা, হালিম, ঝাল মুড়িসহ নানা ধরনের মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মানুষের ভিড়ে জমিদার বাড়ির ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। এটি রবিবার পূর্ণদিবস এবং সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। অন্যদিন খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। জমিদার বাড়িতে দেশী দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশের টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। এ ছাড়া সার্কভুক্ত দেশের দর্শণার্থীদের ২০০ টাকা এবং বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ধামরাইয়ের ঢুলিভিটা এলাকা থেকে বেড়াতে আসা এলিজা শারমিন রুপা বলেন, জমিদার বাড়ির জাদুঘরটিতে জমিদারদের ব্যবহৃত অনেক প্রাচীন জিনিস রয়েছে। সেগুলো দেখার এবং সে সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই স্বামী-সন্তান নিয়ে এখানে বেড়াতে এসেছি।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ির সহকারী কাস্টোডিয়ান মুহম্মদ নিয়াজ মাখদুম জানান, জমিদার বাড়িতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা প্রদানে তারা সর্বদা সতর্ক থাকেন। এ ছাড়া, পর্যটকদের দ্বারা যাতে কোনো পুরাকীর্তি নষ্ট না হয় সেদিকেও কঠোর নজরদারি রয়েছে তাদের।

×