ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২৪ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

এমভি আবদুল্লাহ দুবাই পৌঁছাবে ২২ এপ্রিল

জাহাজ ছিনতাই সোমালিয়ায় বাণিজ্য হিসেবে স্বীকৃত

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস

প্রকাশিত: ০০:১২, ১৭ এপ্রিল ২০২৪

জাহাজ ছিনতাই সোমালিয়ায় বাণিজ্য হিসেবে স্বীকৃত

সোমালীয় জলদস্যুদের জিম্মিদশার কবল থেকে মুক্ত হয়ে দুবাইয়ের পথে

সোমালীয় জলদস্যুদের জিম্মিদশার কবল থেকে মুক্ত হয়ে দুবাইয়ের পথে থাকা এমভি আবদুল্লাহ এখনো হাইরিস্ক জোনে আছে। তাই জাহাজটিতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্ত হওয়া জাহাজটির আগামী ২২ এপ্রিল সকালে দুবাইয়ের আল হামরিয়া বন্দরে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন জাহাজ মালিক সংস্থা কেএসআরএমের সিইও মেহেরুল করিম।

এদিকে জাহাজ ছিনতাইকে বাণিজ্যের পর্যায়ে নিয়ে গেছে সোমালীয় জলদস্যুরা। সোমালিয়ায় এ ধরনের কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও একাধিক জার্নালে প্রকাশ হয়েছে।
জাহাজ মালিকপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন করে যাতে আর কোনো দস্যুদের দ্বারা হামলার শিকার হতে না হয়, এ জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলের অংশ হিসেবে জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর রেলিংয়ের চারপাশে কাঁটাতার, ডেকে ফায়ার হোস, জাহাজে নিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত এলাকা সিটাডেল, ইমার্জেন্সি ফায়ার পাম্প এবং সাউন্ড সিগন্যালসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, জিম্মিদশা থেকে মুক্ত নাবিকরা তাদের পরিবারের স্বজনদের সঙ্গেও প্রতিদিন একাধিকবার যোগাযোগ করছেন। স্বজনরা বলছেন, জিম্মিদশা থেকে মুক্তির পর তারা বারবার একটি কথাই বলছেন, ‘মানসিক চাপ নেই। শুধু তাই নয়, তাদের ইউরোপীয় নেভির দুটি যুদ্ধ জাহাজ নিরাপত্তা প্রদান করে। এ দুই যুদ্ধ জাহাজ ইতালীয় ও স্প্যানিশ। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালে স্প্যানিশ জাহাজটি চলে গেছে। এখন ইতালীয় যুদ্ধ জাহাজের পাহারায় এমভি আবদুল্লাহ ভারত মহাসাগরের হাইরিস্ক জোন অতিক্রম করছে। মঙ্গলবার মধ্যরাত নাগাদ এ জোন পার হয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। 
গত ১২ মার্চ মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে দস্যুদের কবলে পড়া জাহাজ মুক্ত হয় প্রায় ৩১ দিন পর গত ১৩ এপ্রিল। জিম্মিদশায় কেমন ছিল সে সময়ের দিনগুলোÑ এ নিয়ে নাবিকরা তাদের স্বজনদের  বেশকিছু তথ্য জানাচ্ছেন। অপরদিকে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খান একটি টিভি চ্যানেলের অনলাইন বিভাগকে একটি রেকর্ড পাঠান। ইতোমধ্যে ওই বক্তব্যটি চ্যানেলটির অনলাইন বিভাগ প্রচার করেছে। সেই বক্তব্যটি আতিকুল্লাহ খান নিজেই তার ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেছেন। 
সোমালিয়া উপকূলে এবং জাহাজে কী অবস্থায় তারা ছিলেন, জলদস্যুরা তাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিল এবং নাবিকদের সে সময়ের দিনগুলো আতিকুল্লাহ তুলে ধরেন। 
জাহাজের ক্যাপ্টেন আব্দুর রশিদ তার পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বিষয়টি জানিয়ে তার ভাই আব্দুর কাইয়ুম বাবুল জনকণ্ঠকে জানান, সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে কল দিয়েছিল। ভাই জানিয়েছে, সে ভালো আছে।

এখন আতঙ্ক নেই। তারা দুবাইয়ের পথে আছে। যেহেতু একটি বড় ঘটনা ঘটেছে, আর ভবিষ্যতে যাতে কোনো ঝুঁকিতে না পড়তে হয়, সেজন্য জাহাজের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। আরও বড় বিষয় হলো, ইউরোপীয় নেভীর দুটি জাহাজ স্কট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের সকলে সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। নববর্ষের প্রথম দিন থেকে কাল পর্যন্ত তাদের মধ্যে কোনো ধরনের মানসিক চাপ নেই। এখন প্রতিদিনই কথা হচ্ছে। কোনো সময় কোথায় পার হচ্ছে সব জানাচ্ছে। 
এদিকে সোমালিয়া জলদস্যুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রত্যেক সিম্যান জানেন উল্লেখ করে আতিকুল্লাহ একটি চ্যানেলের অনলাইন বিভাগকে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা যে নিজেরাই একটি ঘটনা হয়ে যাব, এটি কল্পনা করিনি। বিশেষ করে যেহেতু আমরা হাইরিস্ক এরিয়ার বাইরের দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই কেউ এ রকম একটি ঘটনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। ৮টার সময় ডিউটি শেষ করে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। দ্বিতীয় রোজা ছিল সেদিন। হঠাৎ একটি ওয়ার্নিং শুনি।

তারপরই কিছুক্ষণের মধ্যেই পাইরেটসরা চলে আসল। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগই পাইনি। সবই হঠাৎ হয়ে গেল। পাইরেটসরা শুরুর দিকে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি শুরু করে। এ জন্য আমরা ভয় পাই। আমরা জানতাম যে, তারা সিম্যানদের তেমন ক্ষতি করে না, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া। কীভাবে বিপদ মোকাবিলা করব, এটা নিয়ে ভয়ে ছিলাম। আমরা শুনছি যে, শুরুতে দস্যুরা উঠে গোলাগুলি ও মারধর করে। আমাদের জাহাজে সেসব করেনি। তারা উঠে শুধু চিৎকার করছিল, কিন্তু ইংরেজি বলতে পারছিল না। প্রথমে পাইরেটস ১২ জন ছিল। তারাই জাহাজকে হাইজ্যাক করে।

পরবর্তীতে ৬৫ জন ছিল। মূল সাগরে ১২ জনই ছিল। সোমালি কোস্টে আসার পর ধাপে ধাপে পাইরেটস বেড়ে ৬৫ জন হয়। সবার মধ্যে প্রধান ভয় ছিল পরিবারকে আমরা কী বলব। কীভাবে ফেস করব। কারণ কারও পরিবারই এ ধরনের পরিস্থিতি তো মেনে নিতে পারবে না। আমরা কি তাদের সান্ত¡না দেব, না নিজেদের দেবÑ তা বুঝতে পারছিলাম না। আমি পরিবারকে প্রথমে জানাইনি। শুধু ম্যাসেজ দিয়েছিলাম; ওয়াইফাই নষ্ট হয়ে গেছে, দুই তিনমাস কথা বলতে পারব না। বেশিরভাগই আমরা জানাব না সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

সবাই আমরা ব্রিজে চলে আসলাম। মোবাইল জমা দিতে বলল দস্যুরা। আমাদের প্রত্যেকের আলাদা রুম আছে, ওয়াশরুমও আছে। কিন্তু হঠাৎ করে ২৩ জনকে একটি রুমে গাদাগাদি করে ব্রিজের মধ্যে রাখে। ওরা ১২ জন এবং আমরা ২৩ জন একটি ওয়াশরুমই ব্যবহার করেছি। শুরুতে ওদের কথা বুঝতে পারছিলাম না। ইংরেজিতে কাঁচা। আমরা জাহাজ চালাই আমাদের মতো করে। কিন্তু ওদের কথামতো জাহাজ চালাতে হচ্ছিল বলে সমস্যা হচ্ছিল। তা ছাড়া ওদের কথা বুঝতে পারছিলাম না।’
ভয়ানক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খান ওই ভয়েস রেকর্ডে বলেন, ‘যেদিন নৌবাহিনীর জাহাজ আসছে, একটি এয়ারক্র্যাট এসেছিল, তখন পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে গেল। পাইরেটসরা ছটফট শুরু করে। এমনকি ওয়াশরুমে যেতে দিচ্ছিল না। তারা দাঁড়ানো যাবে না, নড়া যাবে না বলে অস্ত্র তাক করে রাখল। আবার নৌবাহিনীর জাহাজ যখন থামতে বলল, তখন দস্যুরা এসব মানছে না। এর মধ্যে আরেকটি ভীতিকর অবস্থাÑ মাঝখানে পড়ে আমরা বলির পাঁঠা এ রকম এক পরিস্থিতি।

এটি সবচেয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি। তখন গোলাগুলির মতো অবস্থা। তখন নৌবাহিনীর জাহাজ কাউন্টিং শুরু করল, না থামলে ফায়ার শুরু হবে। হঠাৎ করে ফায়ার শুরু। এসব আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তখন দস্যুরা আমাদের দিকে অস্ত্র ধরে রাখছে। এরপর ক্যাপ্টেনকে দিয়ে বলালো নৌবাহিনীকে চলে যেতে। এমন ভীতিকর পরিস্থিতি আর ব্রিজে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আসলে ঘুম হচ্ছিল না। একদিকে ফিরলেও অস্ত্র, অন্যদিকে ফিরলেও অস্ত্র।’
চিফ অফিসার বলেন, ‘আমাদের কারও ঘুম হয়নি। হঠাৎ করে বদলে গেল জীবনের পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। ভয়ংকর পরিবেশে ঘুমানো। শুরু থেকেই আমরা একটি বিষয়ে আশ^স্ত ছিলাম যে, আমাদের কোম্পানির আরও একটি জাহাজ তিন মাসের মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছিল। আমরা দুই থেকে তিন মাসে মুক্ত হব, এ বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এর অংশ হিসেবে পানি ও খাবার কম ব্যবহার করে দুই-তিন মাস যাতে চলা যায়Ñ এমন পরামর্শ করলাম সবাই।

যেহেতু সোমালিয়া আসার পর সেখানে আরও পাইরেটস যোগ দিল। পরিকল্পনা করে রেশনিং শুরু করলাম। কাজের মধ্যে যেহেতু থাকি, সেটিই স্বাভাবিক রুটিন। এর মধ্যে পরিবারের সঙ্গে আলাপ, আবার কাজÑ এটাই রুটিন ছিল। কিন্তু জলদস্যুদের জিম্মিদশায় তো কোনো রুটিন নেই। ব্রিজে বসে থাকা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কাজ করতে পারছি না। প্রতিদিনের কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই। সময় কাটছিল না, মানসিকভাবে আমরা বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। কতদিন এভাবে কাটবে? অনিশ্চিত পরিস্থিতি।

শুরু থেকে আমরা দস্যুদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতাম জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ভালো ব্যবহার করলে কিছু সুযোগ-সুবিধা দেবে আশা করা যায়। কিন্তু ঘাড় ত্যাড়ামি করলে তারা চাপিয়ে দেবে। এ বিষয়ে সবাইকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এক সময় দস্যুরা দিনের বেলা নামাজ, সেহরি ও ইফতারের জন্য নিচে যেতে দিত। এর মধ্যে একজন নিচে গেল ওষুধের কথা বলে। তার কাছে একটি মোবাইল ছিল লুকানো অবস্থায়। সেটি ওয়াইফাই দিয়ে কানেক্ট করা মাত্র দেখল, সারা দুনিয়ায় এ ঘটনা জানে।

তখন সে এসে এসব জানালে আমরা আশ^স্ত হলাম যে, আমাদের পরিবার জানে। পরিবারের সঙ্গে সারা বাংলাদেশ আছে। নেগোসিয়েশনের বিষয়টা আমরা জানতাম না। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর পেলাম আমাদের মুক্তি ঈদের আগে হবে। এমনকি পাইরেটসরাও বলত ঈদের আগে। যখন দেখলাম ঈদের আগে হলো না, তখন মন খারাপ হলো। বুঝলাম এটি গুজব ছিল। দস্যুরা জানত আমাদের কালচার। তারা আমাদের ঈদের নামাজ পড়ার অনুমতি দিল। তাদের অনুমতি নিয়েই ছবি তুললাম। যেটি পেপার মিডিয়ায় আসছিল। পরে যখন পাইরেটসরা জানল এ ছবিটা মিডিয়ায় আসছে, তখন তারা আমাদের চার্জ করল। এরপর কড়াকড়ি। দুদিন পর পাইরেটসদের মুভমেন্ট পরিবর্তন।

পুরো জাহাজের পরিবেশ পরিবর্তন হয়। দস্যুরা উৎফুল্ল। তখন আমরা বুঝতে পারলাম, নেগোসিয়েশন হয়েছে। শেষে দুই-তিনদিন খুব কড়াকড়ি ছিল। খুবই গোপনীয়ভাবে রাখা হয়েছিল আমাদের। পরে শুনলাম তারা চলে যাবে। শনিবার যখন শুনলাম, তারা চলে যাবে, তখন আমাদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হলো। সকাল থেকেই তারা চলে যাবে যাবে- এমন অবস্থা, কিন্তু রাত ১২টার দিকে তারা জাহাজ ছেড়ে চলে গেল। ’

তিনি বলেন, ‘পাইরেটস যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ পরিমাণ বোঝা কমে গেল। এখন ঘুম থেকে উঠলে মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি। তখন তাড়াতাড়ি ব্রিজে গিয়ে দেখি ওরা আছে কি না। যেসব কড়াকড়ি ছিল মুভমেন্ট করা যাবে না- এসব বিষয়ে ভয় এখনো কাজ করে। পুরোপুরি ভয় কাটেনি। হয়তো কয়েকদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। এখন জাহাজকে পরিষ্কার এবং মেনটেন্যান্স করার, বিল্ডআপ করার চেষ্টা করছি। এখন স্বস্তিতে আছি।

এত কম সময়ে মুক্তি পাব কল্পনা করিনি। দেশবাসী দোয়া করেছে। এ রকম একটি ব্যাপার যখন দেখলাম, তখন আমাদের মধ্যে আবেগ কাজ করেছে। এ দেশের মানুষ যেভাবে দোয়া করেছে, তাদের প্রতি সারাজীবন কৃতজ্ঞ- এটি আমাদের প্রাপ্তি।’
সোমালিয়ায় জাহাজ ছিনতাই বাণিজ্য হিসেবে স্বীকৃত ॥ সোমলীয় জলদস্যুরা বিভিন্ন জাহাজ ছিনতাই করছে বছরে পর বছর। এটিকে তারা ব্যবসার পর্যায়ে নিয়ে গেলে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও একাধিক জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। সোমলিয়ায় রয়েছে জলদস্যু শেয়ার বাজার। যেখানে অধিক লাভের জন্য ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করে। আবার মুক্তিপণের একটি অংশ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও দান করে। এ পেছনের রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট।

যেখানে দেশে দেশে বিভিন্ন কোম্পানি শেয়ারের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে টাকা তোলে। সোমালিয়ায় রয়েছে জলদস্যু শেয়ার বাজার। প্রায় শতাধিক গ্রুপ রয়েছে এ বাজারে। সামুদ্রিক কোম্পানি বলা হয় এসব গ্রুপকে। আক্রমণ করতে জাহাজ এবং অভিযানের খরচের পাশাপাশি অস্ত্রের অর্থ জোগান দিতেও শেয়ার কেনাবেচা হয়। শেয়ারের টাকায় কেনা হয় অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গ্রেনেড। শক্তিশালী অস্ত্র নিয়েই নেমে পড়েন দস্যুতার কাজে।

বিনিয়োগ পাওয়া মাত্রই দস্যুদের মধ্যে একটি গ্রুপ জাহাজ টার্গেট করতে নামে, আরেকটি গ্রুপ জাহাজ নিয়ে। কোনো জাহাজের দেখা পেলেই অন্ধকারেই উঠে যায় জাহাজে। এরপর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয় উপকূলে। এরপর আরেকটি দল মুক্তিপণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জাহাজটিকে পাহারায় রাখে। মুক্তিপণ পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন খরচ-বিনিয়োগও করে শেয়ার বাজারের ব্যবসায়ীরা। সোমলিয়ায় স্বীকৃত এমন ভয়ংকর ব্যবসা লাভবান, তাই ঝুঁকছে অনেকেই।

মুক্তিপণের অর্থ পাওয়া গেলে উচ্চমূল্যের সুদ দিয়েই ফেরত পায় সেসব ব্যবসায়ীরা। দস্যুরা জাহাজের নথি অনুযায়ী মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। এ ছাড়া একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করে। বিশেষ করে এমন লোককে তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাখে যারা বিশ^স্ত। সব জাহাজের বিমা থাকে বলে বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি যোগাযোগ করে ওই মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে। জানা গেছে, রীতিমতো লিখিত চুক্তির মাধ্যমেই দফারফা হয় জলদস্যুদের সঙ্গে আর্থিক অঙ্কের।

আর সেই অর্থ পৌঁছে দিতে নিরাপত্তা কোম্পানির সঙ্গেও হয় আলাদা চুক্তি। শুধু তাই নয়, ৫০ কিংবা ১শ’ ডলারের নোটে পরিশোধ করতে হয় মুক্তিপণের অর্থ। নোট আসল কি নাÑ সেটি যাচাইয়ের পরই মুক্তি দেওয়া হয় জাহাজ ও নাবিকদের। এরপর শুরু হয় মুক্তিপণের টাকা ভাগাভাগি। 
বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা তথ্য বলছে, যারা সাগরে নৌকা নিয়ে ছিল তারা একেকজন পায় ৩০ থেকে ৭৫ হাজার ডলার। আর যারা জাহাজে ওঠে মই দিয়ে তারা পায় আরও ১০ হাজার ডলার বেশি। আর যেসব দস্যু জাহাজ উপকূলে পাহারা দেয় তারা পায় ১৫ হাজার ডলার। পাশাপাশি বিনিয়োগ যেসব ব্যবসায়ী করে তারা পায় মুক্তিপণের মোট অর্থের ৩০ শতাংশ। মধ্যস্থতাকারী পায় একটি নির্দিষ্ট কমিশন। আর দস্যুরা তাদের প্রাপ্ত অর্থ থেকে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেও ভাগ দেওয়া হয়।

সোমালিয়ার বেশিরভাগ মানুষই জলদস্যুদের ব্যাপক খাতির করে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রচার হয়। কারণ সোমালিয়ার জনগণকে এ জলদস্যুরাই বাঁচিয়ে রেখেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। ডাকাতির টাকা থেকে ভাগ দেন জনগণকে। বেশিরভাগ জেলেও জড়িত দস্যুতায়। ফলে সোমালিয়ায় এখন দস্যুতা এক ধরনের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে সর্বমহলে ওয়াকিফহাল।

×