ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা

চারশ’ বছরের ঐতিহ্য ৪০ কেজির মাছ, মৎস্য আকৃতির মিষ্টি

মাহমুদুল আলম নয়ন, বগুড়া অফিস

প্রকাশিত: ০০:১৮, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

চারশ’ বছরের ঐতিহ্য ৪০ কেজির মাছ, মৎস্য আকৃতির মিষ্টি

বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলায় আনা বিশাল আইড় মাছ

উৎসবে মাতোয়ারা চারদিক। পুরো এলাকাজুড়ে লাখো মানুষের ঢল। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম বর্ণের মানুষের ¯্রােত এক বিন্দুতে ছুটছিল। মেলবন্ধনের লোকজ ঐতিহ্যের চিরায়িত রূপ তুলে মানুষের এই স্রোত মিলছিল এক প্রাচীন মেলা প্রাঙ্গণে। চারদিকে শুধু উৎসব আমেজে। সম্প্রীতির বন্ধন আর সার্বজনীন উৎসবের ফল্গুধারায় বুধবার বগুড়ায় হয়ে গেল এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন মেলা পোড়াদহ বা সন্ন্যাসী মেলা। ৪শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে আয়োজন হওয়া এই প্রাচীন মেলার আকর্ষণ ছিল মাছের বাজার।

মাছের কারণে এটি মাছের মেলা হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছ। মেলায় আশপাশের জেলা থেকে সাধারণ লোকসহ ব্যবসায়ীরা আসেন। এবার মেলায় ৪০ কেজি ওজনের বৃহৎ আকারের মাছ ১২ কেজি ওজনের মাছের আকৃতিতে  তৈরি করা বড় বড় মিষ্টি ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ। ছিল মেলার অন্য সব অনুসঙ্গও। তবে সন্ন্যাসী বা পোড়াদহ মেলা হলেও এটি আবার জামাইদের মেলা হিসেবেও কম পরিচিতি নেই।

কারণ আশপাশের ২ শতাধিক গ্রামের জামাইরা এই মেলায় আসেন। মেলা থেকে তারা বড় মাছ কিনে ঝুলিয়ে নিয়ে যান শ^শুরবাড়ি। মাছ ছাড়াও কাঠের সামগ্রী থেকে আসবাবপত্র ও সাজসজ্জার পণ্য, তৈজসপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে মেলা প্রাঙ্গণ ভরপুর থাকে। মূল মেলার পরের দিন বসে নারীদের জন্য বউ মেলা। যেখানে আবার পুরুষদের প্রবেশেধিকার থাকে না।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে গাবতলির মহিষাবান ইউনিয়নের পোড়াদহ এলাকা। প্রতিবছর মাঘের শেষ তিনদিনের মধ্যকার বুধবার অথবা ফাগুনের প্রথম বুধবারে পোড়াদহ মেলা বসে। আয়োজনের রীতি অনুযায়ী এবার মেলা বসেছিল ফাগুনের প্রথম দিন বুধবার। তাই এবার মেলাজুড়ে ছিল ফাগুনের ভিন্ন আমেজ। মেলা যেন সেজেছিল ফাগুনের বর্ণালী উৎসবের আবিরে বন্ধন-আর ভালোবাসা ছড়িয়ে।

সকালে আকাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদ উঁকি দেওয়ায় জন¯্রােত নামে মেলা ঘিরে। প্রাচীন এই মেলার শুরুর সময় নিয়ে নানা ভিন্নতা থাকলেও এটির গোড়াপত্তন হয়েছিল পোড়াদহের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীর ধারে বটগাছকে ঘিরে। সেখানে এক সময় সন্ন্যাসীরা ধ্যান করতেন। সন্ন্যাসী মেলা পুজা কমিটি জানিয়েছে, সারা ভারতবর্ষ থেকে ওই সময় সন্ন্যাসীরা আসতেন।

সন্ন্যাসীদের আরাধনার যুগ শেষ হলেও তাদের ভক্তরা এক সময় সন্ন্যাস পুজা শুরু করেন। আর এই সন্ন্যাস পূজা থেকেই পাশের এলাকাজুড়ে শুরু হয় মেলা। পূজার পরের দিন মেলা বসে। 
সন্নাসীদের ধ্যানের স্থানে পুরনো সেই বটগাছ না থাকলেও এখন নতুন করে জোড়া বটগাছ হয়েছে। এটিও অনেক প্রাচীন। এই বটগাছের নিচেই চলে সন্ন্যাস পূজা। পাশে মেলা প্রাঙ্গণ। যেখানে সব ধর্মের মানুষের পদচারণা। পোড়াদহ সন্ন্যাস মেলা পূজা কমিটির সভাপতি নিকুঞ্জ কুমার পাল দাবি করেন, মেলা প্রায় সাড়ে ৪শ’ বছরের পুরনো।

তাদের হিসাব অনুযায়ী এবার এবার মেলা হচ্ছে ৪শ’৫২তম। পাশেরই এক সময়ের বিখ্যাত কাতলাহার বিলের কাতল মাছ নিয়ে লোকগাথাও রয়েছে মেলা নিয়ে। তবে মেলা কতো প্রাচীন তা নিয়ে কথা থাকলেও মেলার জৌলুস দিন দিন বাড়ছে। সন্ন্যাস পূজা কেন্দ্র করে মেলা শুরু হলেও এখন তা রূপ নিয়েছে সার্বজনীতায়। ধর্ম বর্ণ পরিশেষে সবশ্রেণির মানুষের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই মেলা।

নাগর দোলা থেকে শুরু করে খেলনা, কাঠের আসবার থেকে চুরি ফিতার দোকান, বাহারি পানের পসরা নিয়ে দোকানিদের হাঁকা ডাক। আর ঐতিহ্যবাহী মাছের বাজার, ময়ারাদের( মিষ্টি  তৈরির কারিগর) পসরা, বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান, মাংসের জন্য পৃথক স্থান চরকি থেকে নাগরদোলা কি নেই মেলায়।
তবে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলার আরেকটি নাম হয়েছে তা হলো জামাই মেলা। পাশের রানীরপাড়া গ্রামের ম-ল পাড়ার জামাই বাঁধন মিয়া মেলা উপলক্ষে শ^শুরবাড়িতে এসেছেন একদিন আগে। স্ত্রী মিমকে নিয়ে মেলায় কেনাকাটা করছেন। এলাকার রীতি হলো শ^শুরবাড়ি থেকে জামাইকে সদাপাতি (মাছ মিস্টান্নসহ অন্যান্য) কেনার জন্য টাকা দেওয়া হবে। সেই টাকায় জামাই বড় মাছের সঙ্গে অন্যান্য কিছু কিনে শ^শুরবাড়িতে ফিরবেন। বাঁধন মিয়া জামাই হিসেবে এবারই প্রথম মেলায় এসেছেন।

শ^শুর সওদাপাতি কেনার জন্য তাকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় ৯ কেজি ওজনের একটি মাছ কিনেছেন। মাছ কেনার পর আনন্দের সঙ্গেই শ^শুরবাড়ির সদস্যদের জন্য মিস্টিসহ অন্যান্য পণ্য কিনছেন। আশপাশের অন্তত ২শ’ গ্রামের জামাইরা মেলায় আসেন। কেউ ঈদে মেয়ে জামাইকে দাওয়াত না করলেও মেলা উপলক্ষে দাওয়াত করতেই হবে। এটাই এলাকার রীতি। জামাই ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে স্থানীয়দের আত্মীয় স্বজনরা এই মেলার আনন্দ উপভোগ করতে আসেন।

×